স্বর্গের দেবতারা যদি হিসাব-নিকাশে কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন হন, তবে আর্জেন্টিনার দুই কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী কার্লোস গার্দেল এবং ফুটবলার ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে অবশ্যই সেখানে কাছাকাছি বসতে দেবেন। গার্দেল হয়তো তার বিখ্যাত গান গেয়ে বলবেন, ‘বিশ বছর তো কিছুই নয়’; আর ডিয়েগো তাকে পাল্টা জবাব দিয়ে বলবেন, ‘কেন, ৪০ বছরও তো দেখতে দেখতে কেটে গেল!’
আসলে আবেগের স্মৃতিশক্তি বড্ড প্রখর। আজ যখন আমি এই লেখাটি লিখছি, তখন আমার সামনে সেই চাক্ষুষ প্রমাণ হাজির। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ‘সেই ম্যাচটি’র ৪০ বছর হয়ে গেল। হ্যাঁ, বিশ্ব ফুটবলে এটিকে আলাদা করে শুধু ‘সেই ম্যাচ’ নামেই ডাকা হয়। অথচ তারপর থেকে পৃথিবীতে কোটি কোটি ফুটবল ম্যাচ খেলা হয়েছে, আর সেদিন মাঠে ম্যারাডোনা ছাড়াও আমরা আরও বিশ জনের মতো খেলোয়াড় উপস্থিত ছিলাম। ডিয়েগো আজ আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু সেদিন আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচে তিনি যে রূপকথা তৈরি করেছিলেন, তা প্রতি বছর মানুষের মনে আরও বড় আর মহিমান্বিত হয়ে উঠছে।
আমরা সবাই জানি, মেক্সিকো বিশ্বকাপের সেই অতিমানবীয় কীর্তি গড়তে চাতুর্য আর অবিশ্বাস্য ফুটবলশৈলীর এক নিখুঁত মিশ্রণ লেগেছিল। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে মনে হয়, এমন ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটার জন্য মাঠে ‘ভিএআর’ কিংবা ক্যামেরার এমন আধুনিক নজরদারি না থাকাই ভালো ছিল, যা থেকে আজকাল কোনো কিছুই আর এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। সেই ম্যাচটি যদি আজ কিংবদন্তি হয়ে থাকে, তবে তার কারণ হলো তখন মাঠে এক ধরনের রহস্যের অবকাশ ছিল, আর রহস্যই মানুষের কল্পনাশক্তিকে জাগিয়ে তোলে। নিখুঁত প্রযুক্তি ফুটবলে অনেক ভালো কিছু আনলেও, সেই রোমান্টিক জাদুটা কেড়ে নিয়েছে যা রূপকথা তৈরি করত।
আমার স্মৃতিতে সেদিনের প্রতিটি দৃশ্য এখনো কাচের মতো পরিষ্কার। ম্যাচের আগের দিনগুলোতে আমাদের কোচ কার্লোস বিলার্দো এই খেলাটিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক আবহ নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন। কারণ আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে ল্যাটিন আমেরিকার ফুটবল ইতিহাসে অনেক বড় বড় খেলোয়াড়কে আগে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল। তাই বিলার্দো সারাক্ষণ জপের মতো একটা কথাই আউড়ে যেতেন, ‘এটি কেবলই ফুটবল, এটি কেবলই ফুটবল, এটি কেবলই ফুটবল।’ তিনি বারবার একই কথা বলে সবাইকে বোঝাতে ভালোবাসতেন। কিন্তু সেবার তিনি ম্যাচটিকে যতই শুধু ফুটবলের গণ্ডিতে আটকে রাখার জেদ ধরছিলেন, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল যে তিনি আসলে মনের ভেতরের কোনো বিশাল আবেগকে আড়াল করার চেষ্টা করছেন।
ম্যাচের আগের দিন ডিয়েগো নিজেও সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে বলছিলেন যে আমরা ফুটবলার, কোনো রাজনীতিবিদ নই। কিন্তু ম্যাচের দিন যখন এলো, ড্রেসিংরুমের সেই শ্মশান নীরবতাই বলে দিচ্ছিল যে এটি আর সাধারণ কোনো ম্যাচ নেই। সেখানকার পরিবেশ দেখে মনে হচ্ছিল স্বয়ং মাতৃভূমি এসে আমাদের কানে কানে বিলার্দোর ঠিক উল্টো কথাটি বলে যাচ্ছে ‘এটি কেবল ফুটবল নয়।’ অন্যদিকে, গ্যালারিতে খেলা শুরু হওয়ার আগেই দুই দেশের সমর্থকরা হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েছিল। সেখানে ফকল্যান্ডস যুদ্ধের মতো কোনো বোমারু বিমান ছিল না সত্যি, তবে মেক্সিকোর মাঠের ওই বলটিও দুই দলের ক্ষোভ শান্ত করার কোনো মধ্যস্থতাকারী হতে পারেনি। সমর্থকরা সরাসরি একে অপরকে ঘুষি মারছিল। আর আমরা খেলোয়াড়রা গলা ছেড়ে জাতীয় সংগীত গাইলাম এবং মাঠের যুদ্ধ শুরু হলো।
পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ জন্ম নেন যারা পুরো জীবনে অনেক রোমাঞ্চকর কাজ করলেও, মনে হয় যেন তারা একটি নির্দিষ্ট দিনের জন্যই পৃথিবীতে এসেছিলেন। ডিয়েগো ম্যারাডোনার জন্য সেই নির্দিষ্ট দিনটি ছিল ১৯৮৬ সালের ২২ জুন। সুযোগ লুফে নেওয়ার সেই প্রকাণ্ড বোধের জন্য সেদিন তিনি তার ফুটবলীয় প্রতিভাকে এক ধরনের জেদ আর প্রতিযোগিতামূলক ক্ষোভ দিয়ে পূর্ণ করেছিলেন, যা তার প্রতিটি মুভকে আলোড়িত করছিল। এই দুটি জিনিসই তার মধ্যে উপচে পড়ছিল। তিনি যেন ভেতরে এক অদৃশ্য কাব্যদেবী নিয়ে খেলতেন। সেদিন তার ফুটবলীয় জাদুর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল এমন এক তাগিদ, যা ছিল মূলত সমগ্র ক্ষুব্ধ আর্জেন্টিনার সম্মিলিত শক্তির বহিঃপ্রকাশ। সেই প্রতিনিধিত্বের ক্ষমতা এতটাই বিশাল ছিল যে একজন সাধারণ ফুটবলার মুহূর্তের মধ্যে দেশের জাতীয় নায়কে পরিণত হন। আর আমার মনে হয়, আমরা সবাই জানি ঠিক কোন সুনির্দিষ্ট মুহূর্তে এই অলৌকিক রূপান্তরটি ঘটেছিল।
আমি নিজেই সেই ঘটনার সাক্ষী ছিলাম। ম্যাচের প্রথম গোলটিতে যে ডিয়েগো তার হাত ব্যবহার করেছিলেন, তা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না। তবে এই গোলটির পেছনে কোনো নীতি বা সততা ছিল কি না, সেই প্রশ্ন আমাকে করবেন না। কারণ সাধারণ মানুষ বা কোনো জাতি তাদের রূপকথা বা কিংবদন্তি আইনি মানদণ্ড দিয়ে বিচার করে তৈরি করে না; তারা তা তৈরি করে মনের গভীর আবেগ দিয়ে। তা যদি না হতো, তবে গ্রীক বীর অ্যাকিলিস হতেন একজন সাধারণ খুনি, ইউলিসিস হতেন একজন প্রতারক আর স্প্যানিশ বীর এল সিড হতেন কেবলই একজন ভাড়াটে সৈনিক। সত্য এটাই যে, গোলটি হওয়ার পর আমাদের মধ্যে খেলাটি দ্রুত শুরু করার এক তীব্র তাগিদ কাজ করছিল, যাতে রেফারি তার সিদ্ধান্ত বদলাতে না পারেন। আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি যে সেই ঘটনাকে এক ঐতিহাসিক মাত্রা দেবে, তা নিয়ে ভাবার মতো সময়ও তখন ছিল না।
কিন্তু এর ঠিক পরেই এলো সেই দ্বিতীয় গোলটি। মাত্র ১০ সেকেন্ডে ১০টি টাচের এক অবিস্মরণীয় ফুটবলীয় সিম্ফনি যা আজ ৪০ বছর পরও একইরকম জীবন্ত। আমি তৎক্ষণাৎ বুঝতে পেরেছিলাম যে আমরা এক নতুন ইতিহাসের জন্ম হতে দেখছি। মাঠে আমি ক্যামেরার লেন্সের মতো ম্যারাডোনার সেই জাদুকরী ড্রিবলিংয়ের সমান্তরালে দৌড়াচ্ছিলাম এবং বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছিলাম। পথ চলতে চলতে সেই প্রতিভাবানের মস্তিষ্ক প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ফাঁকি দেওয়ার জন্য চোখের পলকে বিভিন্ন আইডিয়া তৈরি করছিল আর বর্জন করছিল। তার পা দুটি যেন আনন্দে নাচতে নাচতে বলটি একবার দেখাচ্ছিল আর পরক্ষণেই লুকিয়ে ফেলছিল। আমি ও গ্যালারির সবাই মোহাচ্ছন্ন হয়ে দেখছিলাম কীভাবে জন্ম নিচ্ছে সর্বকালের সেরা গোল যার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে জড়িয়ে আছে ধারাভাষ্যকার ভিক্তর উগো মোরালেসের সেই ঐতিহাসিক ও আবেগঘন কণ্ঠ।
গোলটি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো স্টেডিয়ামে যেন এক বোমার বিস্ফোরণ ঘটল। সেই মুহূর্ত থেকে আমাদের দলের প্রত্যেকেরই একটা নিজস্ব গল্প বলার আছে, কারণ যারা এটি মাঠে দাঁড়িয়ে লাইভ দেখেছে তাদের কেউই সেই উল্লাসের চিৎকার কোনোদিন ভুলতে পারবে না। আমিও ভুলিনি। তবে গোলটি হওয়ার পর ম্যারাডোনাকে জড়িয়ে ধরার জন্য দৌড়ানোর বদলে আমি সোজা গোলপোস্টের ভেতরে ঢুকে বলটি কুড়িয়ে আনলাম। এর পেছনে একটি মাত্র কারণ ছিল। সেই গোলটি এতটাই একক, নিখুঁত এবং পুরোপুরি ম্যারাডোনার নিজস্ব সৃষ্টি ছিল যে, আমার মনে কিছুটা অভিমান বা ঈর্ষা জেগেছিল। আমি মনে মনে ভাবলাম, ‘এমন গোল যখন করেছ, তখন একাই উদযাপন করো!’ আমার জন্য সেটাই ছিল সুনির্দিষ্ট মুহূর্ত যখন ডিয়েগো আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের স্তর ছেড়ে অন্য এক উচ্চতায় চলে গেলেন। কয়েক সেকেন্ড পর যখন আমি তাকে জড়িয়ে ধরতে গেলাম, ততক্ষণে তিনি ফুটবলের মতোই পুরো বিশ্বের সম্পদ হয়ে উঠেছেন। তিনি হয়ে গেছেন গার্দেলের মতোই এক অমর মিথ, এবং আর্জেন্টিনার স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক সান মার্তিনের মতোই এক জাতীয় বীর। ফুটবল যখন সমাজতাত্ত্বিক রূপ নেয়, তখন তা আর কোনো তামাশা থাকে না।
ডিয়েগো যে আমাদের মতোই রক্ত-মাংসের একজন মানুষ ছিলেন তা মনে করিয়ে দিতেই দুর্ভাগ্যবশত আজ তিনি এই আনন্দের দিনে মোমবাতি নেভানোর জন্য আমাদের মধ্যে বেঁচে নেই। কিন্তু আমরা যারা ফুটবলকে ভালোবাসি, তাদের সবার মনের মণিকোঠায় সেই অবিস্মরণীয় দিনটি আজও এক আবেগঘন স্মৃতি হয়ে জড়িয়ে আছে। যা সত্যিই অবিশ্বাস্য তা হলো, তখন থেকে সেই ম্যাচটির মহিমা লতার মতো বেড়ে চলেছে। আর্জেন্টিনায় এটি এমন এক প্রতীকী শক্তি অর্জন করেছে যে আজ পর্যন্ত একে এক ঐতিহাসিক যুদ্ধের প্রতিশোধ বা সান্ত্বনা হিসেবে দেখা হয়।
তবে আমরা যদি এর থেকে দেশপ্রেম বা রাজনীতির মাত্রাটি কেড়ে নিই এবং একে কেবল সাধারণ একটি ফুটবল ম্যাচ হিসেবেও বিবেচনা করি, তাহলেও গোটা বিশ্ব যারা সেই দিনের আগে জন্মেছিল এবং যারা পরে জন্মেছে সবাই একে এই সুন্দর খেলার ইতিহাসের এক গৌরবময় চূড়া হিসেবেই আজীবন মুগ্ধ হয়ে দেখে যাবে।
সবকিছুই সম্ভব হয়েছে এক অসামান্য প্রতিভাবানের কল্যাণে, যিনি ফুটবল খেলাকে শিল্পের সর্বোচ্চ স্তরে রূপ দেওয়ার জন্য একটি বিশেষ দিন বেছে নিয়েছিলেন এবং দিনটিকে আর্জেন্টাইন ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন বানিয়েছিলেন। ডিয়েগো সেদিন প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে, বড় বড় কিংবদন্তির জন্ম তখনই হয় যখন একটি বল কোনো ভাগ্যনির্ধারিত মানুষের নির্দেশ মেনে চলে এবং একটি গোটা দেশের আবেগ ব্যাখ্যা করে তাদের দীর্ঘদিনের পুরনো এক ক্ষত উপশম করতে পারে।