নদী-সাগর হয়ে মানবদেহে বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৫ এএম

পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থাকেই কেবল অচল করে দিচ্ছে না, ড্রেন, জলাশয়, নদী, সমুদ্র পেরিয়ে অদৃশ্য মাইক্রোপ্লাস্টিক হয়ে তা এখন মাছের মাধ্যমে মানবদেহেও পৌঁছে যাচ্ছে। পরিবেশবিদ ও চিকিৎসকদের মতে, প্লাস্টিক থেকে নির্গত বিষাক্ত রাসায়নিক এবং মাইক্রোপ্লাস্টিক দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার, হৃদরোগ, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, বন্ধ্যত্বসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এর ফলে জীবন ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে।

শপিং ব্যাগ, খাদ্য সামগ্রিক মোড়ক কিংবা পানীয়ের বোতল হিসেবে ব্যবহৃত পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সামগ্রী রিসাইক্লিংয়ের ব্যবস্থা না করে যত্রতত্র ফেলে দেওয়ার কারণে তা শেষ পর্যন্ত মাটি ও পানির নিচে জমা হচ্ছে। জীবন ও পরিবেশের জন্য নীরব ঘাতক এ সব পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য অপচনশীল হওয়ায় বছরের পর বছর পরিবেশে টিকে থাকে। যা জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ভয়ংকর হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ প্রসঙ্গে স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ও বায়ুম-লীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, ‘পলিথিন জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে, মাটির উর্বরতা নষ্ট করে। আবার এই পলিথিন পুড়িয়ে দিলে বায়ুদূষণ করে। পোড়া অংশ পানি বা মাটিতে মিশলেও মারাত্মক দূষণ ঘটে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা দৈনন্দিন যে প্লাস্টিক ব্যবহার করি, তা ব্যবস্থাপনার আওতায় নেই। ব্যবহার্য প্লাস্টিক ফেলে দেওয়ার পর কোনো না কোনো উপায়ে শেষ পর্যন্ত নদীতে গিয়ে পড়ে। একজন মা যখন সন্তানকে বুকের দুধ পান করান, নদীর মাছ খাওয়ান, তখন এসবের সঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিকও খাওয়াচ্ছেন।’

চিকিৎসকদের মতে, পলিথিন ও প্লাস্টিক তৈরিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক, যেমন বিসফেনল, ফ্যাথালেট, সিসা ও ক্যাডমিয়ামের মতো উপাদান খাদ্য বা পানির সংস্পর্শে এলে ধীরে ধীরে মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে। এসব রাসায়নিক হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং ক্যানসার, হৃদরোগ, প্রজনন সমস্যা ও স্নায়ুবিক জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ফার্টিলিটি হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. এসএম খালিদুজ্জামান বলেন, ‘পলিথিন হচ্ছে সেøা পয়জন যা আমাদের জীবন ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। পলিথিন মানব শরীরে শ্বাস-প্রশ্বাসের অসুবিধা ও ক্যানসার সৃষ্টি করতে সক্ষম। চিকিৎসাবিজ্ঞানে পলিথিনকে চর্মরোগের এজেন্ট বলা হয়। পলিথিনের ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ প্রজনন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে। বর্তমানে ইনফার্টিলিটি বা বন্ধ্যত্বের যে প্রকট সমস্যা তার পেছনেও রয়েছে পলিথিনের ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রভাব।’

পরিবেশ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পলিথিনের আয়ুষ্কাল কয়েকশ থেকে হাজার বছর পর্যন্ত হতে পারে। এটি মাটিতে পচে না, বরং মাটির অভ্যন্তরে পানি, বায়ু ও প্রাকৃতিক পুষ্টি উপাদানের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে।

ফলে জমির উর্বরতা কমে যায়, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং মাটির উপকারী অণুজীব ধ্বংস হতে থাকে।

বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ২৫ শতাংশ প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার হয় না এবং শেষ পর্যন্ত পুকুর খাল, নালা বা ডোবা হয়ে নদী বা সমুদ্রে গিয়ে পড়ে। প্রতিবছর প্রায় দুই লাখ টনেরও বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে পৌঁছায়, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য এবং খাদ্য নিরাপত্তার জন্য নতুন সংকট তৈরি করছে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. হাফিজা খাতুন বলেন, ‘প্লাস্টিক এমন একটি পদার্থ, যা সহজে ক্ষয় হয় না। মাটিতে পড়ে থেকে এটি মাটির স্বাভাবিক গঠন নষ্ট করে এবং ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়ে পানি ও খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে। সেই মাইক্রোপ্লাস্টিক মাছ, শাকসবজি এবং পানির মাধ্যমে মানুষের শরীরে পৌঁছে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি।’

মাইক্রোপ্লাস্টিক হচ্ছে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা। বিজ্ঞানীদের মতে, বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক বর্জ্য পানিতে ফেলে দিলে সেসব ফটোকেমিক্যালি ও বায়োলজিক্যালি ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। এগুলো পানিতে চলে গেলে মাছ খাবারের সঙ্গে ভুল করে খেয়ে ফেলে। এভাবে মাছের শরীরে প্লাস্টিক চলে যায়। সেই মাছ খেলে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা মানুষের দেহেও চলে আসে, যার প্রমাণ গবেষক দল পেয়েছে। তাদের মতে, প্লাস্টিকের কণা যদি মানুষের শরীরে নাও যায়, ওই প্লাস্টিক থেকে যেসব বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত হচ্ছে, সেগুলো মাছের দেহে জমা হয়। এসব বিষাক্ত রাসায়নিক মানুষের শরীরে যাচ্ছে এবং এর ফলে স্তন ক্যানসারসহ নানা ধরনের অসুখ হতে পারে।

গত বছরের মার্চ মাসে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অর্থায়নে হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেম পরিচালিত গবেষণায় সেখানকার সুতাং নদের পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেছে।

২০২৪ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি হওয়া ১৫ প্রজাতির দেশীয় মাছের মধ্যে ৭৩ দশমিক ৩ শতাংশ মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

২০২৩ সালের জুনে প্রকাশিত এক গবেষণা তথ্য অনুসারে, দেশে উৎপাদিত সামুদ্রিক লবণে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) গবেষকরা কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের ১২টি লবণ উৎপাদনকারী স্থান থেকে সংগ্রহ করা কাঁচা লবণের প্রতি কেজিতে ৫৬০ থেকে ১ হাজার ২৫৩টি প্লাস্টিক কণা শনাক্ত করেছেন।

গত বছরের এপ্রিলে যুক্তরাজ্যভিত্তিক খ্যাতনামা বিজ্ঞান সাময়িকী ওয়াটার, এয়ার সয়েল পলিউশন-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অ্যাকুয়াটিক জুওলজি রিসার্চ গ্রুপ এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের একদল বিজ্ঞানীর একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। তার তথ্য অনুসারে বাংলাদেশের নদীমুখে ধরা ইলিশে পাওয়া গেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা। এ ছাড়া পাওয়া গেছে ক্যাডমিয়াম, সিসা, পারদ, আর্সেনিকের মতো ভারী ধাতু। গবেষণা অনুসারে এই কণা প্লাস্টিক ব্যাগ, বোতল, সিনথেটিক কাপড়, টায়ার কিংবা কসমেটিকস থেকে এসে পড়ে নদী ও সাগরে। সেখান থেকেই তা গিলে ফেলে মাছ।

গবেষকদের মতে, পানির নিচের স্তরে বসবাসকারী মাছের শরীরে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণার পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। অর্থাৎ নদী ও জলাশয়ে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক শেষ পর্যন্ত মাছের দেহে জমা হচ্ছে এবং সেই মাছ মানুষের খাদ্যতালিকায় যুক্ত হওয়ার ফলে তা মানবদেহেও পৌঁছে যাচ্ছে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, আজ যে পলিথিন আমরা অবহেলায় রাস্তায় ফেলছি, সেটিই আগামীকাল মাটি, পানি, মাছ হয়ে আমাদের শরীরে ফিরে আসছে। তাই প্লাস্টিক দূষণ রোধে এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও ভয়াবহ স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।

খাদ্যচক্রের মাধ্যমে প্লাস্টিক যেভাবে মানবদেহে ঢুকে যাচ্ছে তা থেকে বাঁচার উপায় সম্পর্কে স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ও বায়ুম-লীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, প্লাস্টিক দূষণ রোধে কোম্পানিগুলোরও প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নিতে হবে। তাদের শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বই নয়, তা যেন একটা মূল্যবোধের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, সেটাও খেয়াল রাখতে হবে।

মাছের পেটে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিক থেকে বাঁচতে মাছ খাওয়ার আগে তার নাড়িভুঁড়ি ফেলে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ছাড়া বড় মাছের চেয়ে তুলনামূলক ছোট মাছ এবং তুলনামূলক গভীর জলের মাছ খাওয়া অপেক্ষাকৃত নিরাপদ বলে জানিয়েছেন।

পলিথিন ও প্লাস্টিকের আগ্রাসন থেকে বাঁচাতে সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে যোগাযোগ করা হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক একেএম রফিক আহমেদ বলেন, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে নানা জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে সরকার। নিয়ম না মেনে পলিথিনের শপিং ব্যাগ উৎপাদন, বাজারজাত, পরিবহন ও ব্যবহার সরকার নিষিদ্ধ করলেও গ্রাহকদের চাহিদা থাকায় তা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তবে এ নিষিদ্ধ পলিথিন বন্ধে আমরা সোচ্চার আছি।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব আবদুল্লাহ আল মোহসীন চৌধুরী বলেন, পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটজাত ব্যাগের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তবে কেবল আইন করলেই হবে না, জনগণের সচেতনতা এবং বিকল্প পণ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। সমাজের সব পক্ষকে একযোগে কাজ করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত