ছোটগল্প বাঙালির কুটিরশিল্প অথবা ছোটগল্পকে বাঙালি লেখকরা প্রায় কুটিরশিল্প বানিয়ে ফেলেছেন সম্ভবত এমন একটি বাক্য লিখেছেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। এখানে সম্ভবত শব্দটা ব্যবহার করতে হচ্ছে, কারণ ওই কথাটা যে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন তার কোনো একটি লেখায়, সে বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চয়তা হাতের কাছে নেই। তবে যিনিই বলুন ও কথা, উপলব্ধিটা আগাগোড়া নির্জলা সত্য। প্রায় হারিয়ে যাওয়া এবং বাংলা কথাসাহিত্যে বলতে গেলে কোনোমাত্র দাগ কাটতে না-পারা লেখকও এ ভাষায় অন্তত একটি সার্থক ছোটগল্পের রচয়িতা।
বাংলা ছোটগল্প বিষয়ে যে কোনো কথায় রবীন্দ্রনাথের নাম আসবেই। আদিগুরু বলে কথা। এখানে না-আনাটাই যুক্তির হতো। কিন্তু কুটির হোক কি কলকারখানাই হোক, বাংলা ছোটগল্প শিল্পের ক্ষেত্রে না-চাইলেও তার নাম আসত। আর, কুটিরশিল্পে পরিণত হওয়ার আগে এর আল ওস্তাদ ওই শিল্পকে এমন স্তরে নিয়ে গেছেন যে বুড়িছোঁয়ার মতো করে হলেও তাকে একবার ছুঁয়ে নিতে হয়। এদিকে কুটিরশিল্প যে বৃহৎ শিল্পকেও একেবারে মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে, এর জলজ্যান্ত উদাহরণ তার ‘গল্পগুচ্ছ’। বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ গদ্যগ্রন্থ! এ বিষয়ে সারা দিন তর্কে রাজি। একক গদ্যগ্রন্থ হিসেবে ‘গল্পগুচ্ছে’র কোনো জুড়ি বাংলা ভাষায় নেই, কোনো উপন্যাস আজও বাংলা গদ্যসাহিত্যের সেই সক্ষমতা দাবি করতে পারবে না যা নিয়ে ‘গল্পগুচ্ছে’র পাশে দাঁড়াতে পারে। এ বিষয়েও তর্ক করা যেতে পারে কোমর বেঁধে। গদ্যের সক্ষমতা, গদ্যের শিল্প হয়ে ওঠা, গদ্য যে মানের শিল্প হলেই একমাত্র কবিতার পাশাপাশি চলতে পারে, সে সক্ষমতায় ‘গল্পগুচ্ছে’র পাশে জায়গা দেওয়ার মতন কোনো গদ্যের বই আছে বলে মনে হয় না। আমার কথার পক্ষে সাক্ষীসাবুদ নেই। হয়তো যুক্তিও নেই। ছোটমুখে বড়কথা হয়ে গেলে মর্জনাও চাওয়ার নেই। শুধু এ-কথা বলতে বলতে যদি বুঝে নিতে পারি যে সৈয়দ মুজতবা আলী শুনে ফেলেছেন, তাহলেই হয়েছে। আমাকে সরিয়ে দিয়ে হাত উঁচিয়ে উচ্চৈঃস্বরে বলবেন, বলেছিস যখন আবার জেরা করার জন্যে সাক্ষীসাবুদ খুঁজছিস কেন হে।
‘মোপাসাঁ-চেখফ্-রবীন্দ্রনাথ’ নামের ছোট একটি লেখায় ‘গল্পগুচ্ছ’ সম্পর্কে যে মোক্ষম কয়েকটি কথা লিখেছেন সৈয়দ মুজতবা, ওইটুকু সাক্ষী হিসেবে যথেষ্ট। মোপাসাঁ-চেখফের পাশে যে রবীন্দ্রনাথের নাম, সে রবীন্দ্রনাথ ছোটগল্পকার। কবি আর গীতিকারও নন, বাকি পরিচয় অপ্রয়োজনীয়। সৈয়দ মুজতবার কাপড়ের গিঁট আলগা করা একেবারে মজলিসি ঢঙে ‘গল্পগুচ্ছ’ নিয়ে লেখা ওই একটি অনুচ্ছেদ এখনো বাকি দুজনের সঙ্গে তুলনামূলক সেরা কথা। ছোটগল্প নিয়ে ওইটুকু ছোট কথাই যথেষ্ট! মুজতবার প-িত্য, মূলভাষায় তিনজনকেই পড়ার সক্ষমতা আর এও শোনা যায় যে ‘গল্পগুচ্ছ’ তার মুখস্থ ছিল। এই দুনিয়ায় কত অসম্ভবই তো কেউ কেউ সম্ভব করতে পারেন।
সৈয়দ মুজতবা লিখেছেন : ‘‘... রবীন্দ্রনাথের গল্প মোপাসাঁ চেখফ্ দুজনের গল্পকেই হার মানায় তাঁর গীতিরস দিয়ে। রবীন্দ্রনাথের সমস্ত গল্পটি কেমন যেন সঙ্গীতের কোনো এক রাগে বাঁধা। এখানে সংস্কৃত নাটকের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মিল রয়েছে। মৃৎশকটিক, শকুন্তলা, রতœবলী নাটক গ্রীক কাঠামোতে ফেলা যায় সত্য; কিন্তু এগুলিতে যে গীতরস রয়েছে, গ্রীক নাটকে তো নেই তাই আমরা সংস্কৃত নাটকে যে আনন্দ পাই, গ্রীক নাটকে সেটি পাই নে। [...] মানব-চরিত্রের আলো-অন্ধকারের আবছায়া আঁকুবাঁকু, মানব-চরিত্রের যে দিক দৈনন্দিন জীবনে আমাদের চোখে পড়ে না, মানুষকে যে সব সময় তার বাক্যে আর আচরণ দিয়েই চেনা যায় না মানুষের সেই দুর্জ্ঞেয় অন্তস্তল রবীন্দ্রনাথ চেষ্টা করেছিলেন আধা-আলোরই ভাষা এবং ভঙ্গি দিয়ে প্রকাশ করতে। সেখানে রবীন্দ্রনাথ একা, মোপাসাঁ চেখফের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্র সম্পূর্ণ ছিন্ন হয়ে গিয়েছে।’’
এ পর্যন্ত ছোটগল্প প্রসঙ্গের কথা একটু পাশ কেটে যেন অপ্রাসঙ্গিকভাবে ‘গল্পগুচ্ছে’র দিকে গড়িয়ে গেছে। ফেরা দরকার। কিন্তু অপ্রাসঙ্গিক শব্দটা লিখে মনে হলো, না, ছোটগল্প নিয়ে ‘গল্পগুচ্ছে’র কথা আসতেই পারে। কিন্তু শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথাটায় উপন্যাস সম্পর্কে কোনো কথা নেই, কিন্তু বাংলা ছোটগল্পকে কুটিরশিল্প বলা আর বাংলা উপন্যাস যে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায় শারদীয় (একই সঙ্গে পড়–ন, ঈদীয়ও) কলকাকলিতে পরিণত হয়েছে, একইসঙ্গে ভাবলে সন্দীপনের কথাটা পাশ থেকে ডালপালা মেলে তাকিয়ে থাকে। শারদীয় সংখ্যায় অথবা ঈদ সংখ্যায় তো ছোটগল্পও প্রকাশিত হয়ে থাকে, সংখ্যায় তো উপন্যাসের চেয়ে বেশিই, কিন্তু কেন বাংলা উপন্যাস কোনোভাবেই ছোটগল্পের মতো অমন শিল্প কুশলতার পরিচয় দিল না। সে আলোচনা আরও বড় পরিসর দাবি করে। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শুরু করে আজকের তরুণতম লেখক পর্যন্ত, সবাই নিশ্চয়ই চেষ্টায় কোনো ত্রুটি রাখেননি। না-কি রেখেছেন? ছোটগল্প পাঠকের কাছে চলচ্চিত্রের বিকল্প বিনোদন হয়নি কখনো, কিন্তু উপন্যাস ওই শারদ ও ঈদ সংখ্যায় সব ধরনের চলমান চিত্রের বিকল্প বিনোদন হয়ে উঠেছে বলে এই দশা?
সৈয়দ মুজতবা আলীর ওই ছোট্ট মজলিসি নিবন্ধটির শিরোনামটা আবার একটু খেয়াল করি। ‘মোপাসাঁ-চেখফ্-রবীন্দ্রনাথ’। মন্তব্য নিস্প্রয়োজন। এর পাশে নাম বসতে পারত, হয়তো আটলান্টিকের ওপারের ‘এলান পো’ আর ‘ও হেনরি’। এপারের ইংরেজি ভাষায় একজনও নেই। ‘মহান’ ব্রিটিশরাজশাসিত ‘সূর্য না ডোবা’-ভাষা দুনিয়ায় শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প লেখক রবীন্দ্রনাথ। ইংরেজরা ছোটগল্প লিখতে জানে না। চরবাসীর সংকট? কে জানে, আমরা তো বদ্বীপনিবাসী! দেবেশ রায় হলে মোপাসাঁ-চেখভ-পো-হেনরি কাউকেই মানতেন না, মুজতবা তবু দুজনকে মেনেছেন। ছোটগল্প লেখক হিসেবে দেবেশ রায় রবীন্দ্রনাথের পাশে আর কোনো নাম বসাতে নারাজ। লিখেছেন, আধুনিক দুনিয়া ছোটগল্প বলতে যা বোঝে তা রবীন্দ্রনাথের হাতে তৈরি। [‘অতীত : সেতুবন্ধন’, শারদীয় ‘কৃত্তিবাস’, ২০১৯] অন্যান্য ভাষায় রবীন্দ্রনাথের সমকালীন ও আগের লেখকরা যা লিখেছেন, তা গল্প, ছোটগল্প নয়। কিন্তু সেই দেবেশ রায়ই যখন প্রশ্ন তোলেন যে, প্যারীচাঁদ, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, সতীনাথ, মানিক প্রমুখের পরেও বাংলা ভাষায় উপন্যাসের দৈন্য ঘোচে না! গলার স্বর নুইয়ে দিয়ে তিনি উপন্যাসের চিহ্নিত আদর্শ জানান, ‘ডন কুইকসোট’ ‘টম জোনস’, ‘লাল ও কালো’, ‘যুদ্ধ ও শান্তি, ‘আনা কারেনিনা’, ‘অপরাধ ও শাস্তি’, ‘কারমাজভ ভাইয়েরা’ ইত্যাদি উপন্যাসকে। সেই চিহ্নিত আদর্শের তুল্য একখানা বাংলা উপন্যাসও তিনি মনে করেন না, ‘এ উপন্যাসগুলোতে সমসাময়িক রাজনীতি আর ব্যক্তিমানুষের নিয়তি যেমন ওতপ্রোত, আমাদের ভাষায় তেমন উপন্যাসের অভাব।’ লেখেন, বাংলা উপন্যাসের দীন ভাব কাটে না। এরপরে প্রসঙ্গটি ঘুরে যায়, শুরুতে বাংলা উপন্যাস ইংরেজি উপন্যাসের আদলে ও ধরনে উপন্যাস রচনার কৌশল হাতড়ে ছিল বলে সেখানেই সংকট?
ছোটগল্প সেখান থেকে মুক্ত বলেই তা কুটিরশিল্প? ওদিকে, ছোটগল্প সে দীনতা ঘুচিয়েছে, এই শিল্পের দুনিয়ার প্রধানতম এক কিংবা দেবেশ রায়ের ভাষায়, প্রথম সার্থক স্রষ্টা বাঙালি বলে? দিনযাপনের আর দশটা গার্হস্থ্য কাজের ফাঁকে এটাকে বাঙালি তার ভাষায় হাতে তুলে নিয়েছে? নাকি, বাংলা ভাষার যে স্বাভাবিক গীতিময়তা তা ছোটগল্প রচনায় বেশি সহায়ক? নাকি, উপন্যাস বলতে যা বুঝি, কিংবা পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ উনিশ শতকীয় যে উপন্যাসগুলো আজও ওই মাধ্যমের শ্রেষ্ঠ কীর্তি বলে স্বীকৃত, সেগুলোকে আদর্শ মানলে, ওই মানের লেখা বাংলা ভাষায় সম্ভব নয় ভাষার অক্ষমতায়? নাকি, কথাসাহিত্যিকেরা ভাষাকে সে পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারেননি? যেমন এক আলেকজান্দর পুশকিনের হাতেই রুশ ভাষা এতটাই স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে যে, তার কাজের কুড়ি থেকে পঞ্চাশ বছরের ভেতরেই সে ভাষায় অন্তত এক গ-া বিশ্বের বিস্ময় উপন্যাস রচনা সম্ভব হয়েছে! বাংলা গদ্যের শ্রেষ্ঠ গদ্যগ্রন্থ হিসেবেও মান্যতা দিচ্ছি একটি গল্পসমগ্রকে। সেই সক্ষমতা অর্জনের পরও তা বাংলা উপন্যাসের জন্য প্রয়োজনীয় ভাষা হয়ে উঠতে পারল না? আগে পরে আগে মিলিয়ে এমন আরও কিছু প্রশ্ন তো টপাটপ দাঁড় করানো যায়। নাকি বাংলা ক্রিয়াপদের দীর্ঘসূত্রতাই প্রকৃত বাংলা উপন্যাস রচনার সংকট? বাক্যের শেষে একটি ক্রিয়াপদ কখনো ওই বাক্যকে যথাযথ স্বাবলম্বী করে তোলে না, কিংবা এর পাশে সহায়ক ক্রিয়াপদটি ব্যবহার করামাত্রই বাক্যটি একটু এলিয়ে যায়। এলানো বাক্যে ছোটগল্প রচিত হতে পারে, উপন্যাসের ক্ষেত্রে তা একটু সংকটের।
প্রশ্ন তো আরও তোলা যায় যে, বাঙালি জাতি হিসেবে কাহিনীর ওই দীর্ঘতাকে মান্যতা দিতে
কৃপণ! কিন্তু মঙ্গলকাব্যগুলো তো উপকাহিনীর ডালপালায় ভরা। ওই সময়ের প্রণয়-আখ্যানগুলোও তাই। তবে উপন্যাসে খামতিটা কোথায়? নাকি, অর্থের জোগানে কুটিরশিল্প, বৃহৎশিল্পে রূপান্তরিত হতে পারে, ভাষার শিল্পের প্রশ্নে বিষয়টা পুরোপুরি চিন্তা-কল্পনার অন্তর্গত সম্পন্নতার?
লেখক কথাসাহিত্যিক