আরব্য উপন্যাসের গল্পের মতো একের পর এক দরজা খুলে যাচ্ছে। ঘটছে বিস্ময়ের পর বিস্ময়! মানুষ দেখছে কিছু অতিমানুষকে, যাদের দামি বাড়ি, দামি গাড়ি, দামি অলংকার আর পোশাক-পরিচ্ছদ আর দেশের উঁচু মহলের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ। অনেকে ভাবছেন এভাবে কিছুদিন চললে মানুষ হয়তো বিস্মিত হতে ভুলে যাবে। কিন্তু না, মানুষকে ভুলিয়ে দেওয়া বা ভুলিয়ে রাখার ইতিহাস যতটুকু জানা আছে তাতে মনে হচ্ছে এভাবে মানুষকে ব্যস্ত রাখা খুব কার্যকর ওষুধ। প্রচারমাধ্যমগুলো হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। কে কার চেয়ে আগে তাজা খবর পরিবেশন করতে পারে তার প্রতিযোগিতা চলছে। সম্ভবত নারী হওয়ার কারণে আগ্রহটাও বেশি তাই মানুষ যেন টেলিভিশনের পর্দা থেকে চোখ ফেরাতে না পারে সে কারণে দেখানো হচ্ছে, একবার রাস্তার দৃশ্য, একবার ঘরের। একবার ক্লোজ শট একবার দূর লং শট। একবার কান্নার ভঙ্গি আর একবার হুংকারের। একবার অন্দর মহলের তো একবার অন্তর জ্বালার খবর। মানুষকে একেবারে আঠার মতো আটকে রাখা যাকে বলে! এখন একটা কথা খুব চালু হয়েছে। এ সমস্ত খবর নাকি পাবলিক খায়। যে খবর খেতে পছন্দ করে সেটাই খাওয়াও। অথবা খাওয়াতে খাওয়াতে পছন্দ করিয়ে ফেলো। সংবাদ প্রচার এবং বাণিজ্যিক ও কুশলী উপস্থাপনা যে কতভাবে পাঠক, দর্শককে প্রভাবিত করে তা দেখছে সবাই।
দেখছে সবাই আলোচিত নায়িকা, মডেলদের বিলাসী জীবন। প্রশ্ন উঠছে তাদের আয় কত এবং ব্যয় কত। তাদের সঙ্গে কাদের সম্পর্ক ছিল এবং আছে। কত আকর্ষণীয় এবং বিচিত্র ছিল তাদের জীবনযাপন। কত যে প্রকাশ্য এবং গোপন কার্যকলাপ ছিল তাদের এ নিয়ে নানা ধরনের খবর পরিবেশিত হচ্ছে ঘণ্টায় ঘণ্টায়। তারা সবাই আলাদা হলেও কিছু বিষয়ে কিন্তু ভীষণ মিল। তাদের সবার বাসায় মদ এবং মাদক পাওয়া যাচ্ছে আর তারা সমাজের উঁচু মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তাদের বাসায় ছোটখাটো বার পাওয়া যাচ্ছে অর্থাৎ তারা শুধু নিজেরাই এসব পান করেন তা নয়, অনেক নামিদামি ব্যক্তিও পদধূলি দিতেন তাদের বাসায়। সম্পর্ক খুব শক্তিশালী পুঁজি, ফলে এর জোরে খুব দ্রুততম সময়ে ঘটেছে তাদের বিস্ময়কর উত্থান।
অপরাধ বিজ্ঞানে যে কোনো ঘটনার সঙ্গে যেমন মোটিভ বা উদ্দেশ্য খোঁজা হয় তেমনি দেখা হয় যে কোনো ঘটনার বেনিফিশিয়ারি বা সুবিধাটা কারা পাবেন? সৎভাবে জীবনযাপন করে শত কোটি টাকার মালিক পৃথিবীতে কেউ হয়েছেন কি না জানা নেই। বালযাক লিখেছিলেন, প্রতিটি বড় সৌভাগ্যের পেছনেই লুকিয়ে আছে বড় অপরাধ। এ কথা নিয়ে অনেকে গাঁইগুঁই করলেও আইনি-বেআইনি সুযোগ ছাড়া যে বিশাল সম্পত্তির মালিক হওয়া যায় না এটা তো বাংলাদেশে দৃশ্যমান সত্য। বাংলাদেশে ধনী ব্যক্তিদের ক্লাবে এবং বাড়িতে মদপানের ব্যবস্থা থাকা অস্বাভাবিক নয়। এটা তাদের সামাজিক আভিজাত্যের প্রকাশও বটে। কোন গুণ বা দক্ষতায় এই অল্প বয়সেই অভিনেত্রীদের কেউ কেউ বা মডেলকন্যাদের কেউ এসব অভিজাত পাড়ায় পরিচিত এবং জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন তা বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। যদিও বলতে গেলে সমস্যা হতে পারে। এগুলো অনেকটা আধা গোপন ও নিয়মিতভাবেই চলছে। অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলোতে ৩০-৪০টি পার্টি হাউজের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। যেখানে গরিব ধনীরা ১০ হাজার টাকা এবং অতি ধনীরা ২ লাখ টাকা প্রতি রাতে খরচ করেন। মাঝে মাঝেই কিছু নাম উঠে আসে, কিছু তৎপরতা চলে, চমক লাগিয়ে দেয় সমাজে এবং পরবর্তী চমকের অপেক্ষায় রাখে মানুষকে। মুখরোচক আলোচনা, নোংরা রসালো গল্প মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে, খবর দেখতে গেলে পরিবারগুলোতে অস্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়, কিছু মানুষের জীবনের কদর্য দিকগুলো মানব চরিত্র বিশ্লেষণের প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু কেন ঘটে এসব? ভাবতে গেলে দেখা যাবে এগুলো সমাজের রোগের লক্ষণ, রোগ নয়। রোগ আরও গভীরে। এসব হলো মানুষকে লুণ্ঠন করে অঢেল অর্থের মালিকদের বিকৃত বিনোদন।
কিন্তু সাধারণ মানুষের সমস্যা তো অনেক। করোনার আতঙ্ক মধ্যবিত্তকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে, তারা ভাবছে জীবন নিয়ে কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের ভাবনা তা নয়, তারা আতঙ্কিত তাদের জীবিকা নিয়ে। কাজ না জুটলে তো খাবার জুটবে না। অন্যদিকে করোনায় মৃত্যু কমছে না, সংক্রমণ বাড়ছে। হাসপাতালে বেড খালি নেই, আইসিইউ তো পাওয়া দুঃসাধ্য, অক্সিজেন পাওয়াই কঠিন। জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, শিক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীরা যতটা চিন্তিত তার চেয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত তাদের বাবা-মা। দেশের মানুষের জীবনে এ রকম কত সমস্যা! আর অন্যদিকে এই সব উচ্চবিত্তদের নিম্নস্তরের ঘটনার উন্মোচন ঘটে চলেছে প্রতিদিন। এর মধ্যে কিছু ঘটনা অবশ্য নিয়মিতভাবে দীর্ঘদিন ধরেই ঘটে চলছে, আর কিছু ঘটনা হঠাৎ করে ঘটছে। কোনো কোনো ঘটনায় শুধু চমকে ওঠা নয় আঁতকে উঠছে মানুষ। ভয়ংকর মাদক আর শক্তিশালী আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে। যারা এসব ঘটনার সঙ্গে যুক্ত তাদের অনেকেই গ্রেপ্তার হচ্ছেন। গ্রেপ্তারদের আত্মবিশ্বাস ভরা হাসিমুখ দেখে এই প্রশ্ন ওঠা একেবারেই অস্বাভাবিক নয় যে তাদের হাত লম্বা এবং শেকড় অনেক গভীর। মাঝে মাঝে বেচারারা যে কী কারণে ধরা পড়েন তা একটা গবেষণার বিষয়। অন্যদিকে যারা ধরা পড়েননি তাদের সংখ্যা কিন্তু কম নয় এবং ক্ষমতাও অনেক বেশি এ কথা তো নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
কয়েক দিন আগে একটি নামকরা স্কুলের অধ্যক্ষের একটি টেলিফোন কথোপকথন প্রচার মাধ্যমে এসেছে। তার নাকি বালিশের নিচে পিস্তল নিয়ে ঘুমানোর অভ্যাস। তার মুখের ভাষা শুনে কোনোভাবেই কি বিশ্বাস করা যায় যা তিনি একটি অভিজাত স্কুলের প্রধান! কীভাবে এসব কথোপকথন প্রচার মাধ্যমে আসে সেটা একটা প্রশ্ন। কারা কল রেকর্ড করে এবং তা প্রচার মাধ্যমে পাঠায় এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। তবে এই কথোপকথনে যে অশ্লীল, অসৌজন্যমূলক এবং পদের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ কথাবার্তা হয়েছে তা ভাবনার উদ্রেক না করে পারে না। তিনি যা বলেছেন তাতে তার এই ক্ষমতার ভিত্তি কোথায় এর কিছুটা আভাস পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘আমি কোনো চিন্তা করি না। কারণ, আমি নিজেই শক্তিশালী। আমি যে দলের প্রেসিডেন্ট ছিলাম সেই দলটা এখন সরকারে। যত দিন এই দলটা আছে তত দিন আমার পাওয়ার আছে। আমি কিন্তু বাচ্চাদের লেংটা করে রাস্তার মধ্যে পিটাইতে পারব’। এটাই হলো মোদ্দাকথা। পাওয়ার এবং পেটানো।
একটা বিষয় লক্ষ করার মতো যে, কোনো অপকর্ম করে কেউ ধরা পড়লেই দেখা যায় তিনি ক্ষমতাসীন দলের কোনো না কোনো পদে আছেন বা ক্ষমতাসীন দলের বড় বড় নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। ছবি তাদের একটা প্রমাণপত্রের মতো। বাসার ড্রইং রুমে বড় করে বাঁধাই করে রাখা, নিজের সঙ্গে রাখা, পোস্টার ছাপিয়ে লাগানো, রাস্তায় বড় করে বিলবোর্ড লাগানো এসব হলো ক্ষমতা দেখানোর আরেক কৌশল।
ক্ষমতা দেখানোর প্রবণতা সর্বত্র। কোনো কাজ পেতে, টেন্ডার পেতে, সুবিধা পেতে গিয়ে কত বড় বড় মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক এটা এখন অন্যতম যোগ্যতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেশ তৎপরতা চালিয়ে এদের ধরেছে, প্রেস কনফারেন্স করে তাদের অপরাধের বর্ণনা দিয়েছে, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক প্রচার মাধ্যমে তার রসালো প্রচার হচ্ছে। নারীদের ব্যাপারে সমাজে যে ধারণা তৈরি করা হয়েছে যুগ যুগ ধরে সেই ধারণা দ্বারাই মন্তব্য করে যাচ্ছেন অনেকেই। এরা নারী হওয়ার কারণে মানুষ সম্ভবত তার একঘেয়ে জীবনে কিছুটা বিনোদন পাচ্ছেন। তারা কি পোশাক পরেছেন, জিজ্ঞাসাবাদে কী বলেছেন, কী খেয়েছেন সবই জানানো হচ্ছে ফলাও করে। কিন্তু যে প্রশ্ন তার উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না তা হলো মাঝে মাঝে এসব ঘটছে কেন? এসব নারীর যে পুরুষদের সঙ্গে সম্পর্ক তারা কারা? এরা কীভাবে প্রশাসন, পুলিশ, বড় ব্যবসায়ী, বড় বড় নামকরা ক্লাব এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পারে? এদের প্রায় সবার বাড়ি থেকেই প্রচলিত ও অপ্রচলিত পত্রিকার ভাষায় ভয়ংকর মাদক উদ্ধার হচ্ছে কেন? বর্তমানের আলোড়ন সৃষ্টিকারীরা বা অধুনা বিস্মৃত হয়েছে যারা তারাই কি সব? কারখানা চালু থাকলে যেমন উৎপাদন হতেই থাকে তেমনি তো একের পর এক বেরিয়ে আসছে এরা। এসব কি দুর্নীতির দুষ্টচক্রের বিশাল আইসবার্গের ওপরের সামান্য অংশ? এদের পেছনে, পাশে এবং সামনে যারা ছিলেন তারা কি বহাল তবিয়তে থাকবেন? এরা ক্ষমতাসীনদের ব্যবহার করেন, নিজেরা ব্যবহৃত হন, ক্ষমতাধর মানুষদের সঙ্গে সম্পর্কের জোরে মানুষকে কষ্ট দেন, কক্ষচ্যুত বা আশ্রয়হীন হলে দুর্দশাগ্রস্ত চেহারা দেখিয়ে মানুষের সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করেন। এসব দেখতে দেখতে আর এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে করতে মানুষের রুচির মানটা যে নেমে যাচ্ছে কিংবা মানুষকে এই সব মুখরোচক খবর নিয়েই ব্যস্ত রাখা হচ্ছে কি না এই বিষয়টি সমাজবিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয়। তবে অতীতের উদাহরণ দেখে মনে হচ্ছে যে এসব ব্যাপারে ক্ষমতাসীনরা সাময়িক বিব্রত হলেও তারা শেষ পর্যন্ত সুবিধাই পেয়ে যান।
টিকটিকি তার লেজকে বহুভাবে ব্যবহার করে। নিজের ভারসাম্য রক্ষার জন্য তো বটেই আক্রান্ত হলে শত্রুকে বিভ্রান্ত করার জন্যও লেজ তার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। খসে যাওয়া ছটফট করতে থাকা লেজের দিকে যখন শত্রুর নজর তখন সে দ্রুত পালিয়ে আত্মরক্ষা করে। লেজ খসে গেলে সাময়িক অসুবিধা হয় তবে সময়মতো তার লেজ আবার গজিয়ে যায়। চলমান অভিযানে তেমন ঘটনা ঘটছে না তো? লেজ ধরা হলেও টিকটিকি পালিয়ে গেল এমন ঘটনা ঘটছে না তো! চুন খেয়ে মুখপোড়া জনগণ এখন দই আর চুনের মধ্যে পার্থক্য করতে পারছে না।
লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট