‘রোম যখন পোড়ে নিরো তখন বাঁশি বাজায়’, বহুল প্রচলিত প্রবাদ এখন। কী সুর বাজাচ্ছিলেন! বিষাদের! নাকি হরষের! কথা সেটা নয়। তাহলে দোষের কী বাঁশি বাজালে? দোষটা আসে স্থান-কাল-পাত্রের বিচারে। কেননা, বাজানোটা হচ্ছিল রোমেই এবং বাদক নিরো রাখাল নয়, ছিলেন সেই জ্বলন্ত রোমেরই সম্রাট। দমকলের পাইপ হাতে পানি না ছিটান, অন্তত আগুন নেভাবার অস্থিরতায় প্রাসাদে ছুটোছুটি তো করবেন! বাঁশি বাজানো কি সাজে! দমকল ছিল না বটে। ঘটনাটা ৬৪ খ্রিস্টাব্দের। জুলাইয়ের মধ্যভাগে সত্যিকারের আগুনই লেগেছিল রোমে। সপ্তাহেরও বেশি সময় জুড়ে জ্বলেছিল রোম সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে। তখনকার রোমের ১৪ জেলার তিনটি একবারেই ছাই, আর ৭টির হয়েছিল ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি। এটা ইতিহাসের সত্য। বাঁশির কথাটা নাকি সত্য নয় মোটে। বেহালার মতো তারের বাদ্যযন্ত্র ‘ফিডল’-এর কথা বলা হয় বটে, তবে সেটাও নাকি তৈরিই হয়নি নিরোর মৃত্যুর চৌদ্দশ বছর পর অব্দিও।
অনেকে আবার, ‘স্যাক অব লিউয়াম’ গাওয়ার কথাও বলেন। নিরো নাকি ভালোই পারতেন গাইতে এবং তারের বাদ্যযন্ত্র ‘সিতারা’ বাজাতে। ৬৭ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকে নাকি অংশ নিয়ে গেয়েছিলেন, বাজিয়েছিলেন, আবার অভিনয়ও করেছিলেন ট্র্যাজেডি নাটকে। খেলাধুলার এ প্রতিযোগিতায় সেবার গান-বাজনাদি তিনিই ঢুকিয়েছিলেন। নিজের অংশ নেওয়ার সুবিধা করতে আয়োজকদের ঘুষ দিয়ে সে অলিম্পিক থামিয়েও রেখেছিলেন একটা বছর। যে কটাতেই অংশ নেন সবটাতেই জিতেছিলেন। দশ-ঘোড়ার রথ চালনায় রথ থেকে ছিটকে পড়ে প্রতিযোগিতা ছেড়ে উঠে গেলেও নাকি তাকেই বিজয়ী করা হয়েছিল, খেলা চালিয়ে গেলে তিনিই জিততেন বলে। অবশ্য, পরের বছরেই তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ীর তালিকা থেকে সে নাম তুলে ফেলা হয়। সংগীত, জিমন্যাস্টিক, কোয়েস্ট্রিয়ান মিলিয়ে ‘নিরোনিয়ান গেমস’ চালু করেছিলেন ৬০ খ্রিস্টাব্দে।
সন্দেহ নেই, গান-বাজনা দুটোই পারতেন নিরো এবং দুটোর প্রতি টানও ছিল তার। তাই বলে কি সত্যিই তখন ‘স্যাক অব লিউয়াম’ গাইছিলেন কিংবা মগ্ন ছিলেন ‘সিতারা’ বাজানোয়! সেকালের প্রখ্যাত রোমান ঐতিহাসিক ট্যাসিটাসের মতে ঠিক সেই মুহূর্তে নিরো ছিলেন রোম থেকে ৫১ কিলোমিটার দক্ষিণে তার জন্মস্থান পুরাতন বন্দর শহর অ্যান্টিনামে। অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে সেখান থেকে ছুটে আসেন রোমে। নিজ তহবিলের অর্থ দিয়ে মৃতদেহ ও ভস্মস্তূপ সরানোর ত্রাণকার্য পরিচালনা করান। নিজের প্রাসাদ খুলে ঘরপোড়াদের আশ্রয়ের ও খাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করেন। আসলে সেসব নাকি ছিল তার ট্র্যাজেডি নাটকে আরেক অভিনয়!
ইতিহাসের সত্য এই যে, আগুনে ছাই হয়ে যাওয়ার পরপরই নিরোর রোমে নতুন করে বানানো বাড়িঘরগুলো হয়েছিল ইট দিয়ে, মাঝে বেশখানিকটা করে জায়গা ছেড়ে ছেড়ে, প্রশস্ত রাস্তার দিকে সুদৃশ্য বারান্দা রেখে। নগরীকে সাজানো হয়েছিল একেবারে নতুন রূপে। নগরীর প্রাণকেন্দ্রে তিনটি পাহাড়ের ঢালের কয়েকশ (একশ থেকে তিনশ) একর জুড়ে লেক, আঙুর বাগান, কুঞ্জবন আর তৃণভূমির নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তৈরি করে তার ভেতর নিরো নির্মাণ করেন সে যুগের অত্যাধুনিক সুরম্য এক প্রাসাদ ‘ডোমাস অরিয়া’ (স্বর্ণপ্রাসাদ)। কেবল স্বর্ণই নয়, কী ছিল না সেখানে! স্বর্ণের পাত, মণিমুক্তা, মোজাইক আর হাতির দাঁতের পাতলা আবরণের কারুকাজে খচিত সিলিং। দেয়ালগুলোতে পুষ্প অলংকরণ আর গ্রিক দেব-দেবীদের চমৎকার সব দেয়ালচিত্র। মেঝেতে ঝাঁ-চকচকে সাদা মার্বেল, তার ওপর সূর্যের আলো ঠিকরে ঝলকানোর জন্য দেয়ালগুলোয় উঁচুতে ছোট ছোট গম্বুজাকৃতির ফোকর। ভোজনকক্ষে ওপর থেকে অতিথিদের গায়ে সুগন্ধি আর গোলাপপাপড়ি ছড়ানোর জন্য ছাদের গম্বুজের নিচের সিলিংটা দাস দিয়ে ঘোরানোর ব্যবস্থা। লবিগুলোতে পুল আর ঝরনা। প্রাসাদের বাইরে বিশাল চত্বরের প্রবেশমুখে আপাদমস্তক আপন মূর্তির ব্রোঞ্জনির্মিত ৩০ মিটার উচ্চতার সুবিশাল এক ভাস্কর্য ‘কোলোসাস অব নিরো’। ‘ডোমাস অরিয়া’ নাকি বসবাসের জন্য নয়, নিরো বানিয়েছিলেন রংমহল হিসেবে। তিনশ কক্ষের বিশাল প্রাসাদে কোথাও নাকি শয়নকক্ষ, রন্ধনশালা খুঁজে পাননি প্রত্নতাত্ত্বিকরা।
নিরো এসবের নির্মাণ শুরু করে দেন অগ্নিকাণ্ডের ভস্মস্তূপের শেষ ধোঁয়া নিঃশেষের সঙ্গে সঙ্গেই। ৪ বছরেরও কম সময়ে মহাযজ্ঞে কাজ শেষ হয়ে আসে ৬৮ খ্রিস্টাব্দে। নগরীর পুরাতন নির্মাণাদি নাকি নিরোর নাপছন্দ ছিল। আপন খেয়ালে সাজাতে দরকার ছিল ফাঁকা রোম। আগুনে যখন রোম পুড়ছে তখনো নাকি নগর উন্নয়নের এসব পরিকল্পনার কাজ চলছিল নিরোর। এসব থেকেই অনেকের অনুমান, অগ্নিকাণ্ডটি আসলে নিরোর উন্নয়ন পরিকল্পনারই অংশ এবং প্রথম ধাপ। ‘স্যাক অব লিউয়াম’ গাওয়া কিংবা বাঁশি বাজানোটা কল্প-কাহিনী হলেও নিরোর মনে তো তখন তুরীয়ানন্দে গানা-বাদ্যি বাজছিলই! এতসব কাণ্ড ঘটাতে আইনের কোনো অজুহাত দরকার ছিল না নিরোর। কেননা, তিনি ছিলেন সম্রাট (প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের ৫ম এবং জুলিও-ক্লডিয়ান বংশের শেষ সম্রাট; খেতাবি নাম ‘নিরো ক্লডিয়াস সিজার অগাস্টাস জার্মানিকাস’, পিতৃদত্ত নাম ‘লুসিয়াস ডমিটিয়াস আহিনোবারবাস’)। জবাবদিহি না থাকলে ক্ষমতাসীনের খায়েশই আইন। আসনটি ছোট না বড় তাতে কিছু যায় আসে না। সিনেট, কেবিনেট সব চলে খায়েশের আনুগত্যে। নিরোর সঙ্গে ছিলেন কারা! কারা জুগিয়েছিলেন ইন্ধন সত্যিকারের এই অগ্নিকাণ্ডে! না, তার শিক্ষক ও উপদেষ্টা সেনেকা কিংবা বুরুস নন।
সেনেকা ছিলেন প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের সিনেটরদের একজন, জেনোর অনুসারী নিরাসক্তবাদী দার্শনিক, নাট্যকার, স্যাটায়ারিস্ট। ছিলেন ৪৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে নাবালক নিরোর শিক্ষক এবং ৫৪ খ্রিস্টাব্দে নিরো সম্রাট হওয়ার পর থেকে তার রাজনৈতিক উপদেষ্টা। বুরুস ছিলেন রোমান বাহিনীর প্রিটারিয়ান গার্ডের অধিনায়ক, ৫১ খ্রিস্টাব্দ থেকে সেনেকার সঙ্গে তিনিও নিরোর শিক্ষক। বুরুস মারা যান আগেই, ৬২ খ্রিস্টাব্দে (লোকে বলে বিষক্রিয়ায়)। ১৭ বছরের কিশোর বয়সে (তখনো পর্যন্ত সবচেয়ে কমবয়সী সম্রাট, আমাদের শিশু আইনের শিশু!) সম্রাট হিসেবে অভিষিক্ত হওয়ার পরের বছর থেকেই রাজনীতির বুদ্ধি খুলতে থাকে নিরোর। একটু একটু করে মা আর এই দুই উপদেষ্টার লাগাম থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিজ খেয়ালে চলা শুরু করেন। ৫৫ খ্রিস্টাব্দেই মা অ্যাগ্রেপিনাকে (প্রথম সম্রাট অগাস্টাসের দৌহিত্রী) বের করে দেন প্রাসাদ থেকে, ৫৭ খ্রিস্টাব্দে নির্বাসন দেন মিসোনামে। সেখানে ৫৯ খ্রিস্টাব্দে মায়ের মৃত্যু হয়। সেই জাহাজডুবির ট্র্যাজেডিও নাকি নিরোর সাজানো! তারপর থেকে নিরো একেবারে বেপরোয়া, মূর্খ-চাটুকারের দলপরিবেষ্টিত। সেনেকাদের হিতোপদেশ পাত্তা পাওয়ার নয়। সাম্রাজ্যে সেনেকার গুরুত্ব কমতে থাকে। ৬২ থেকে ৬৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে দু’দুবার অবসর নিতে চাইলেও নামঞ্জুর করেন নিরো। অগত্যা সেনেকা সাম্রাজ্যের কাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে দূরে নিজ জন্মভূমি হিস্পানিয়ার কর্ডুবায় ডুবে থাকতেন অধ্যয়ন আর লেখালেখিতে। ৬৫ খ্রিস্টাব্দে গায়াস ক্যালপার্নিয়াস পিসো (সাম্রাজ্যের কনসাল, পরে প্রভাবশালী সিনেটর) সম্রাট নিরোকে গুপ্তহত্যার যে ষড়যন্ত্র আঁটেন তা ফাঁস হয়ে যায়। তাতে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয় সেনেকাকেও। পরিণতিতে স্বেচ্ছামৃত্যুর ((Forced Suicide) দণ্ড দেন নিরো।
আগেও একবার ফেঁসে গিয়েছিলেন মিথ্যা অপবাদে। ৪১ খ্রিস্টাব্দে সিনেটে মৃত্যুদণ্ডই হয়েছিল সেনেকার। সম্রাট ক্লডিয়াস নিজে দয়াপরবশে ভূমধ্যসাগরীয় কর্সিকা দ্বীপে নির্বাসিত করেন। নির্বাসনের সেই আট বছরে সেনেকা রচনা করেন দুঃখনিবারণী তিনখানা দার্শনিক গ্রন্থ (স্বর্গে গেলেও ঢেঁকি ধান ভানে, আর নরকে নিক্ষিপ্ত হলেও প্রকৃত যোগী থাকে ধ্যান নিয়েই)। ৪৯ খ্রিস্টাব্দে নিরোর মা নিজের চাচা সম্রাট ক্লডিয়াসের চতুর্থ স্ত্রী হন এবং ক্লডিয়াসকে পটিয়ে নিরোকে ক্লডিয়াসের দত্তক পুত্র বানিয়ে সেনেকাকে রোমে ফিরিয়ে এনে সাম্রাজ্যের প্রিটরের পদ পাইয়ে দিয়ে বালক নিরোর শিক্ষক নিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু, এবারে আর নিরোর দেওয়া মৃত্যুদণ্ড থেকে সেনেকাকে রক্ষা করতে পারেনি কেউ। স্বেচ্ছামৃত্যুর দণ্ড কার্যকর হয় ‘এক্সযাংগুইনেশন’ পদ্ধতিতে। ৭০ বছরের এ-প্রবীণ জ্ঞানীকে স্বেচ্ছায় শুধু নিজের শিরাগুলো কেটে ধীরে ধীরে রক্তক্ষরণে যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুবরণ করতে হয়। ইতিহাসের এও এক শিক্ষা; শাসক-প্রশাসকরা জ্ঞানী-গুণী বুদ্ধিজীবী কারও হিতোপদেশ কানে তোলে না, উল্টো তাদের কানে ধরে গর্দান নেয়। মূর্খদের স্তাবকতাই তাদের আকৃষ্ট করে, একেবারে বিমোহিত করে। হিতোপদেশদাতার পেছনে লাগে চাটুকার কুচক্রীর দল, হিতে বিপরীত হয়ে বিপদ নেমে আসে তার ঘাড়ে। আজকের বুদ্ধিমান বুদ্ধিজীবীরা কি স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নেবে!
সেই ‘ডোমাস অরিয়া’ ভোগ-উপভোগ করা আর ভাগ্যে জোটেনি নিরোর। সেই স্বপ্নসৌধ গড়তে গিয়ে নিরো রাজকোষ খালি করে ফেলেন। রাজকোষ ভরতে তাই নতুন সব নজরানা আর খাজনা ধার্য করেন, মুদ্রার অবমূল্যায়ন করেন। ৬৮ খ্রিস্টাব্দের মার্চ থেকেই সেনারা, অঞ্চলগুলোর প্রশাসকরা বিদ্রোহ শুরু করে। তখন আর সিনেট তো দূরের কথা ব্যক্তিগত রক্ষীদেরও কাউকে সঙ্গে পাননি। নিঃসহায় দিশাহারা নিরো একবার পালান রোম ছেড়ে, আবার ফেরেন প্রাসাদে। নিজের প্রাণটা নেওয়ার জন্যও ডেকে কাউকে না পেয়ে নাকি চিৎকার করেছিলেন ‘আমার কি মিত্র এমনকি শত্রুও নেই কোনো?’ ছদ্মবেশে নগরী থেকে ৪ মাইল দূরের গ্রামে এক অনুগতের বাড়িতে গিয়ে লুকান। নিরোকে গণশত্রু (তখনকার রোমে গণশত্রুকে মারা হতো গণপিটুনিতে) ঘোষণা করে সিনেট। ধরতে সেনারা আসছে খবর পেয়ে ৯ জুন আত্মহত্যার স্বেচ্ছামৃত্যুই বেছে নিতে হয় নিরোকে।
নিরোর সেই স্বপ্নসৌধ ‘ডোমাস অরিয়া’র কিছুই অবশিষ্ট থাকেনি আর। পরবর্তী সম্রাটরা সংরক্ষণ করেননি, বিব্রতকর বোধে। গণস্নানাগার, সাংস্কৃতিক-অনুষ্ঠান ও খেলাধুলার গণবিনোদনকেন্দ্রতে পরিণত করে। মূল্যবান মণিমুক্তা ও স্বর্ণের কারুকাজ, মার্বেল সব খুলে খুলে নিয়ে যায় লোকে। পরবর্তী সম্রাটরা নিরোর সেই আপন মূর্তির ভাস্কর্য ‘কোলোসাস অব নিরো’র একেকবার একেক চেহারা করে শেষটায় স্থপতি লাগিয়ে ১২৮ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট হ্যাড্রিয়ান ২৪টা হাতি দিয়ে সরিয়েই ফেলেন। ইতিহাসের শিক্ষার করুণ পরিহাস, বর্জনীয় নজিরগুলোই অধিক সংক্রামক, অধিক দীক্ষণীয়। হিতাহিত তুচ্ছ করে আপন খায়েশের উন্নয়ন পরিকল্পনার ধ্বংসবাদন থামে না তাই।
লেখক আইন গ্রন্থকার, সাবেক সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক