ইদানীং করোনার সঙ্গে

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:২০ এএম

ইদানীং করোনাকে নিয়ে ভয়-ভাবনায় পজিটিভ (করোনার ভাষায় নেগেটিভ) বা স্বস্তি ফিরে  আসার আভাস মিলছে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী করোনার ভোল পাল্টানো চালবাজির নমুনা দেখে করোনার দেওয়া এই ফুরসত আস্থায় আনা যাচ্ছে না বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। আমাদের বিশেষজ্ঞরাই দ্বিধাবিভক্ত, একদল বলছেন লকডাউন দেওয়ার সুফল মিলছে, রক্ষণশীল শিবির বলছে এতে আত্মতুষ্টির অবকাশ নেই। ভয় কাটেনি। ইত্যাদি। দেশে ডেঙ্গু খালি মাঠে গোল দেওয়ার পাঁয়তারায় আছে। ডেঙ্গুর ধারণা যথার্থ যে করোনা না এলে আজ সে নিজে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরবে থাকত। যা হোক পরিস্থিতির সালতামামি করলে দাঁড়ায়  করোনার মতিগতি বুঝতে বুঝতে মেঘে মেঘে বেলা তো কম হলো না। ‘শেষ হয়েও হলো না, বা  হচ্ছে না’র পর্যায়ে যাওয়ার আগেই বাঁহাতি স্পিনারের মতো বিভ্রান্তিকর বল ছুড়ছেই করোনা, হাতেও উইকেট বেশি নেই , এখনো কত ওভারের খেলা বাকি বোঝা যাচ্ছে না ‘নো বল’ আর ওয়াইডের ছড়াছড়িতে। গত শীতে যিনি বলেছিলেন এপ্রিলে গরম শুরু হলে করোনা কৈলাশে ফিরে যাবেন, সেপ্টেম্বর- অক্টোবরে এসে করোনা তাকেও ছুঁতে ছাড়ল না, নভেম্বরের নির্বাচনে তানার আম ছালা দুটোই গেল। গতবারের অক্টোবরে নোবেল প্রাইজ পাওয়ার সুযোগ পাননি ভ্যাকসিন আবিষ্কারকম-লি। এবার দেখা যাক। তবে ভ্যাকসিন আবিষ্কার হলেই করোনা পালাবার পথ পাবে না এমন ধন্য আশা কুহকিনীর কূলকিনারা এখনো মেলেনি। এখন বাংলাদেশে তো বটেই অধিকাংশ দেশে ভ্যাকসিন ওরফে টিকা নিয়ে রাজনীতি, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির খবর মিলছে। মাঝে মাঝে অক্সিজেন কাড়াকাড়ি, আইসিইউতে সিট মিলছে না এসব খবরও আসছে। তবে এখন কীভাবে বিদ্যায়তন খোলা হবে সে নিয়ে শিক্ষা বিভাগ মহা কর্মযজ্ঞে। কাশিমবাজার কুঠি থেকে তাগিদ যেহেতু এসেছে এখন শিক্ষা শুরু করতেই হবে। গ্রামাঞ্চলে করোনা ছিল না বহুদিন তখন কোথায় ছিলেন তারা এ প্রশ্ন এখন অবান্তর। ঘরে থাকতে থাকতে সবাই কেমন যেন হাঁপিয়ে উঠছেন। দল বেঁধে পশ্চিমে পাড়ি দেওয়ার সুযোগ হাতছানি দিচ্ছে জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার সীমিত আয়োজনের মধ্যেও। তবুও ভয় থেকে যাচ্ছে। সামনে শীতকাল, ইতিমধ্যে ইথারে চাউর হচ্ছে করোনার কোয়ার্টার ফাইনালের পর্দা উঠবে। এমত অবস্থায় করোনাকে মোকাবিলার নতুন ছক আঁকা নিয়ে বিভ্রান্তির রেশ রয়েই যাচ্ছে। ভেতরে-ভেতরে সবাই ধরে নিচ্ছেন, করোনা যখন থাকবেই আরও বেশ কিছুটা কাল, তাহলে তার সঙ্গে সহাবস্থানের একটা সমঝোতায় যাওয়া যুক্তিযুক্ত হবে বলে মনে করছেন অনেকে।

করোনার মতিগতি, ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ-সংস্কৃতি এমনকি রাজনৈতিক অর্থনীতিতে তার প্রভাব প্রতিক্রিয়া এবং ঝুঁকি পর্যালোচনা করেই সহাবস্থানের ধারণা ও প্রক্রিয়া তৈরি হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী এটা এখন উপলব্ধির উপলব্ধিতে পরিণত হয়েছে যে, বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চাল চালার জন্য করোনার উদ্ভব ও বিকাশ। এর সঙ্গে ভূরাজনীতি, বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থাপনায় মোড়লের হাতবদল, পরিবেশ দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য ধ্বংসের সূক্ষ্ম সুতা টানাটানি জড়িত। সুতরাং করোনা সহজে নির্মূল হওয়ার নয়। অতীতের অন্যান্য মহামারীর চেয়ে করোনার প্রকাশ্য পার্থক্য হলো এটি যতটা না প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্ট তার চেয়ে বেশি এটি ভেদবুদ্ধি প্রসূত বৈজ্ঞানিক গবেষণা সৃষ্ট, এর উদ্দেশ্য রাজনৈতিক অর্থনীতির রেজিলিয়েন্ট পাওয়ারসহ মানুষের শারীরিক, মানসিক ও  সামাজিক শক্তি-সামর্থ্য ধ্বংসকারী এবং অতীতের তুলনায় বর্তমানে মানুষের মোবিলিটি মাইগ্রেশন সুযোগ বেশি হওয়ায় মানুষেরই ভেতরে ভাইরাসবাহী করোনা দ্রুত ছড়িয়েছে বিশ্বব্যাপী। সুতরাং করোনাকে সহসা সহজ ভাবার সুযোগ নেই। এতদিন  নিকট প্রতিবেশী দেশ ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে করোনাকে বাঘ থেকে বিড়ালে পরিণত করার সাফল্য এবং সামাজিক দূরত্বকে গুরুত্বহীন বিবেচনাকারী আমজনতার পরিবর্তে গৃহ ও পরিবার বন্দিদের মধ্যে অধিক আতঙ্ক সৃষ্টিতে করোনার বৈষম্যমূলক আক্রমণের ধারা স্পষ্ট হতেই চলেছে।       

এহেন পরিবেশ পরিস্থিতিতে করোনার সঙ্গে সহাবস্থানকল্পে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অবশ্য পালনীয় ও অনুসরণীয় অংশ এবং এর সঙ্গে মানসিক শক্তি, সামাজিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার  পদক্ষেপগুলোর দিকে তাকানো আবশ্যক মনে করছেন অনেকে। এমন কিছু অভ্যাস যা আমাদের আটপৌরে জীবন ও অভ্যাস-সংস্কৃতির সঙ্গে স্থিতিশীল হওয়ার আবশ্যকতা রয়েছে। করোনা প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় সব ক্ষেত্রেই তিনটি বিষয় বা অভ্যাস মৌলিক দায়িত্ব ও কর্তব্য হিসেবে বিবেচনাযোগ্য সামাজিক নয় দৈহিক দূরত্ব বজায় রাখা, মাস্ক ব্যবহার করা এবং ঘন ঘন হাত ধোয়া। দৈহিক দূরত্ব ২ মিটার বা সাড়ে ৬ ফুট বা প্রায় ৫ হাত। সব নিয়মকানুন মেনেই ঘরের বাইরে যেতে হবে। বাইরে থেকে ঘরে ফিরেই হাতমুখ ধোয়া ও পরনের কাপড় পাল্টাতে হবে। কারও সঙ্গে সরাসরি বা সামনা-সামনি হয়ে কথা না বলা, খাওয়া-দাওয়া না করা। অনলাইনে কেনাকাটা এবং পেমেন্ট করার পথে উঠতে হবে। বাজারে দোকানে এমনকি সুপার মার্কেটে একজন করে করে বাজার সওদা করা ভালো। দোকানের কোনো নমুনা সামগ্রী না ছোঁয়া। পাবলিক ট্রান্সপোর্টে চড়ার সময় কোনো কথা না বলা। সভা-সেমিনার-সম্মেলন অনলাইনে অংশগ্রহণ করা, সভায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা সীমিতকরণ, সবার মাস্ক পরা নিশ্চিত হওয়া এবং সভাকক্ষ আলো-বাতাসের জন্য জানালা খোলা রাখা। যে সব দেশে বা স্থানে এখনো মহামারী বিরাজ করছে সেখানে ভ্রমণ না করা। খাবার সময় কথা কম, শাক-সবজি বেশি খাওয়া। বদ্ধ ঘর কিংবা সংকীর্ণ জায়গায় বেশিক্ষণ না থাকা বা দাঁড়ানো, নিজের সুস্থতা যাচাইয়ের জন্য প্রতিদিন সকালে নিজের তাপমাত্রা মাপা, নাক দিয়ে দম নিয়ে, ১০/১৫ সেকেন্ড ধরে রেখে মুখ দিয়ে ছেড়ে দেওয়ার ব্যায়ামটি কয়েকবার করলে ফুসফুসের সুস্থতা তথা করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পরিস্থিতি যাচাই করা যায়। করোনায় আক্রান্ত হওয়া ব্যক্তিকে বাহ্যিক অবয়বে বা লক্ষণ বা উপসর্গ দিয়ে আগে শনাক্ত করা যেত এখন বোঝাই যায় না। সেহেতু সব সময় সতর্ক সচেতন থাকার বিকল্প নেই। বাইরে থেকে এসে পরিধেয় পোশাক ধোয়া ছাড়াও অন্তত একবার গরম পানির ভাপ নেওয়া গেলে করোনার ভাইরাস মুখমণ্ডল হয়ে গলা দিয়ে যাওয়ার আগে পথেই মারা যেতে পারে। করোনা বিদায় হতে মনে হচ্ছে আরও সময় লাগবে। প্রত্যেকের উচিত নিজের ও সবার স্বার্থে স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা। 

করোনার সঙ্গে সহাবস্থান অবলম্বনের জন্য বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট পরিবেশে মানসিক শান্তি ও শক্তি, সামাজিক সংহতি, সহানুভূতি সুরক্ষায় করণীয় দেশে বিদেশে করোনা  নিয়ন্ত্রণ ও নিরাময় ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা ও ক্ষয়ক্ষতির বেহাল চিত্র দেখে আস্থাহীনতায়  বাংলাদেশে আতঙ্ক, আশঙ্কা বেড়েই চলেছে যা মানসিক অশান্তির কারণ। অথচ মানসিক শান্তি বা মনের বল করোনার মতো ভয়াবহ মহামারী মোকাবিলার প্রাণশক্তি। আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলে, কঠিন বাস্তবতায় করোনা মোকাবিলায় গৃহীত ব্যবস্থার স্বচ্ছতায় ও আন্তরিকতায় সবাইকে  শামিল করতে পারলে গৃহীত সব পদক্ষেপে বিচ্যুতির পরিবর্তে সবাইকে অন্তর্ভুক্তিকরণের মাধ্যমে আস্থা ও জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠবে। দেখতে হবে ঐকমত্যের ঐশ্বর্য মতানৈক্যের মাশুল দিতে দিতে যেন শেষ না হয়। 

প্রাচীনকাল থেকেই দেশ কাল পাত্রভেদে মানুষ সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করে আসছে। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিকে বিচ্ছিন্ন করতে সবার ভালো’র জন্য জোরেশোরেই শুরু হলেও ‘সামাজিক দূরত্ব’ তৈরির কর্মসূচি কার্যকর হয়নি। মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টিকারী মহামারী নিয়ন্ত্রণে, মানুষকে উদ্ধারে সামাজিক সংহতির ভূমিকাই অগ্রগণ্য। এখানে সবাইকে সচেতন করে তুলতে হবে। বাংলাদেশ তথা ভারতবর্ষীয় সংস্কৃতিতে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি ও সামাজিক বন্ধন রীতি যেখানে সুদৃঢ় সেখানে করোনা মোকাবিলায় আক্রান্তের সেবা-শুশ্রুষা চিকিৎসাকর্মীর সমানুভূতি, পারিবারিক নৈকট্য, সামাজিক সহানুভূতি বিশেষ টনিক হিসেবে কাজ করবে।

করোনাকালে আমাদের বোধোদয় হচ্ছে সামনের দিনগুলোর নিয়ন্তা হবে ভার্চুয়াল যোগাযোগ সংস্কৃতির। ডিজিটাল প্রযুক্তি কর্মসূচিতে বাংলাদেশ সময়ের চেয়েও এগিয়ে আছে, এটি একটা বড় প্লাস পয়েন্ট। এই অবকাঠামোতেই বাংলাদেশের তরুণ উদ্যোক্তা উদ্ভাবকদের দেশে এবং বিদেশে ভার্চুয়াল অর্থনীতিতে সফলতার সঙ্গে সংযুক্ত করতে মনোযোগ দিতে হবে।

লেখক সরকারের সাবেক সচিব এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত