যে গাঁয়ে আমার জন্ম সে গাঁয়ের তিনদিকে নদী, একদিকে বিল। আমাদের বাড়ির উত্তরদিকে নতুন পাকা ঘাটলা। ঘাটলা নির্মাণের সময়ই শখ জেগেছিল বর্ষায় ঘাটলায় বসে ছিপ ফেলে মাছ ধরার। একসময় নিজেই প্রচুর মাছ ধরেছি। শৈশবে মাছ ধরা শুরু করেছি বড়শি দিয়ে। আমাদের বাড়ির উত্তর এবং দক্ষিণ দুদিকে দুটি ঘাট। বর্ষায় দুই ঘাট তলিয়ে উঠানের কাছে চলে আসত পানি। মাকে দেখতাম দুই ঘাটে ছিপ ফেলে রাখতেন। কিছুক্ষণ পরপর ছিপ তুলতে গেলেই উঠে আসত বাইলা, ফলি, ট্যাংরা ইত্যাদি মাছ। এক দিন ছিপ তুলতে গিয়ে দেখতে পায়, বড়শি আটকে রয়েছে পাশের নলখাগড়ায়। মা আমাকে নামিয়ে দেন পানিতে। আমি ডুব দিয়ে নলখাগড়াসহ ওপরে উঠে দেখি বড় এক বাইন মাছ। মাছ দেখার জন্য মানুষের ভিড় জমে যায়।
বিজ্ঞানে একটা কথা আছে, ‘সবকিছুই মূলের দিকে ধাবিত হতে চায়’। আমার বেলায়ও কথাটি খাটে। জীবন সায়াহ্নে মন বারবার ছুটে যায় গাঁয়ের দিকে। গাঁয়ে শৈশবের স্মৃতি খুঁজে বেড়ায়। শৈশব স্মৃতিতে প্রথমেই মনে পড়ে মাছ ধরার কথা। তাই কয়েক দিন আগে কয়েকটি বড়শি নিয়ে যাই। সুতাও নিয়ে যাই সঙ্গে করে। ছিপ জোগাড় করে হাত-বড়শি বানিয়ে ঘাটলায় বসে টোপ দিয়ে বর্ষার পানিতে বড়শি ফেলি। ঘণ্টা দু-এক সময় পাড় হওয়ার পরও বড়শিতে মাছ শিকার দূরের কথা, একটা ঠোকরও দিল না। মনে পড়ে গেল শৈশবে মাছ ধরার কথা।
ভাদ্রের শুরুতে যখন নদীর কূল জাগতে শুরু করে, তখন দলবেঁধে গোসল করতে গিয়ে খুঁজতাম বাইলার গর্ত। গলাপানিতে শরীর ডুবিয়ে গর্ত খুঁজতাম। পায়ের আঙুলের মাথায় গর্তের মুখ লাগলেই টুপ করে ডুব দিতাম। মাছ শিকারের জন্য টেঁটা, ওঁছা, জালি, পাতা জাল, কনুই জাল ইত্যাদি সবকিছুতেই পারদর্শী ছিলাম। জ্যৈষ্ঠ মাসের মিষ্ট ফলের সঙ্গে কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে গেলেই ‘উজাইন্না’ মাছ ধরার প্রস্তুতি। জোরালো বৃষ্টির পানি কলকল শব্দে মাঠ থেকে গড়িয়ে নামে বিলে। গড়িয়ে নামা পানির সোঁতা ধরে বিল থেকে ডাঙায় উঠে কৈ মাছ। জলাশয় ছেড়ে ভাটি থেকে উল্টোদিকে ধাবমান মাছকে বলে ‘উজাইন্না’। কোনো কোনো উজাইন্না খাল-বিল ছেড়ে একেবারে ডাঙায় উঠে আসে। ডাঙা থেকে তখন কৈ মাছ ধরার অভিজ্ঞতা কার না আছে! খালের পাড় তলিয়ে চারা ধানের ক্ষেতে পানি ঢুকতে শুরু করত। ধানক্ষেতের আলে ও পায়ে চলার পথে পানির সঙ্গে প্রবেশ করত নুন্দি বাইলা। পাকা জামের মতো হৃষ্টপুষ্ট এটা সবার পছন্দের মাছ। কখনো কখনো মা জালি ও ‘ডেস্কি’ হাতে দিতে দিতে বলতেন ‘বাজান, আজ রান্নার কিচ্ছু নাই, বেশি দূরে যাসনে। সামনের ধানক্ষেতের মাথায় জালি দিয়ে কয়েকটা ঠেলা দিয়ে আয়, যা হয় তাতেই আমাদের চলবে।’ জালি কাঁধে, ‘ডেস্কি’ হাতে দিতাম দৌড়। বাড়ির ঘাটা দিয়ে নামতে গিয়ে বাম দিকেই ডোবা। ডোবায় হেলেঞ্চাসহ নানা প্রকার আগাছা। আগাছার গলায় গলায় পানি। লুঙ্গি মালকোঁচা দিয়ে, জালির এক মাথা ডুবিয়ে কিছুদূর ঠেলে তুলতেই লাফালাফি করত ঝলঝলে চিংড়ি।
একবার আমাদের বাড়ির পাশের এক শিকারি ৩৫ সের ওজনের কাতলা শিকার করে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। মসজিদের ইমাম মোল্লা দাদা। তাকে দেখতাম, বর্ষায় তিনি জমির আলে পারং (বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি বিশালাকারের মৎস্যফাঁদ) বসিয়ে রাখতেন। ছোট মাছ বড় মাছের তাড়া খেয়ে ফাঁদে ঢুকে পড়ে। ঢুকে পড়ত বড় মাছও। ফাঁদ থেকে ছোট মাছ বের হয়ে গেলেও আটকে যায় বড় মাছ। বর্ষায় অনেকেই ‘চাঁই’ পাততেন।
সে সময় মুসলমান মৎস্যজীবী ছিল না বললেই চলে। আমাদের গাঁয়ের নাম ‘রামপ্রসাদ’ হলেও এক ঘরও হিন্দু ছিল না। নিজের প্রয়োজনীয় মাছ নিজে ধরে খাওয়ার জন্য প্রত্যেকের ঘরে ছিল মাছ ধরার সরঞ্জাম। আমাদের ঘরে সব সময় একজোড়া ঝাঁকি জাল দেখতাম। যার মধ্যে একটা ঘন, আরেকটা পাতলা। মাছ ধরতাম বড়শি, জালি, ওঁছা ও টেঁটা দিয়ে। বর্ষার পানি মেঠোপথ ডুবিয়ে বাড়ির আনাচে-কানাচে প্রবেশ করতে শুরু করে। রাতে ডান হাতে টেঁটা ও বাম হাতে হারিকেন নিয়ে বের হয়ে পড়তাম। খাবারের লোভে নতুন তলিয়ে যাওয়া মাটিতে আসে বাইলা, ট্যাংরা, শিংসহ নানা প্রকার মাছ। স্বচ্ছ পানির তলে শুয়ে থাকা বাইলা দিনের বেলাতেই দেখা যেত। বড়শির টোপ মুখের কাছে নিতে না নিতেই খপ করে মুখে তুলে নিত। বাড়ির আনাচে-কানাচে, গোয়ালঘরের পাশে যেখানে গোবরের টাল, সেখানেই তারাবাইন, শিং ও বুলাটাকির আড্ডা। যখনই টেঁটা হাতে যাই, তখনই দেখতাম তারাবাইন। আমার শখ টেঁটা দিয়ে কাইক্কা মাছ শিকার। ভাদ্র-আশ্বিন মাসে একদিকে পানি কমতে থাকে, আরেকদিকে ধানের গাছ হামাগুড়ি দিতে শুরু করে। জট পাকানো ক্ষেতে নৌকা প্রবেশ করত না। ক্ষেতের আলের দিকে ধানের যেসব ডগা হাঁটু গেড়ে থাকে সেগুলোর সঙ্গে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে কাইক্কা। দেড়-দুই ঘণ্টা কাইক্কা ধরলে নায়ের তলা এ মাছে ঢেকে যেত। গাঁয়ের উত্তরে মেঘনা নদী। ভাদ্র-আশ্বিনের দিকে স্রোতের ভাটিতে টোনা জাল গড়ায় জেলেরা। সাত-আটটি জাল পালা করে একের পর এক গড়িয়ে তিন মোহনার কাছে গিয়ে তুলতেই লোছ (যেখানে মাছ জমা হয়) ভরে উঠে রুই, কাতলা ও মৃগেল। ছোট রুই-মৃগেলকে বলা হয় নলা আর মাঝারিকে বলা হয় গর্মা। জেলেদের জাল তোলার সময় গাঁয়ের লোকজন ডিঙ্গি ও কোষা নৌকায় করে জেলেদের কাছ থেকে মাছ নিতে আসে। জেলেরা একজনকেও বিমুখ করে না। বর্ষার শেষে মেঘনার বুক থেকে তাজা নলা মাছের ঘ্রাণ ও স্বাদ যে জিহ্বায় একবার লেগেছে, সে জিহ্বায় অন্য কোনো মাছই রুচবে না। বর্ষার শেষদিকে নৌকায় করে ঘুরে ঘুরে ফসলের জমি দেখা ছাড়া কৃষকের হাতে তেমন কোনো কাজ থাকে না। তাই বাড়ি বাড়ি চলত জাল বোনা। বেশি ছিল ঝাঁকি ও পাতা জাল। ঝাঁকি জাল বানানো কঠিন। বাবা প্রতি বর্ষায় একটি করে নতুন জাল বুনতেন।
আমি পানিতে গোটা চারেক ছিপ ফেলে যখন শৈশবের স্মৃতিচারণ করছিলাম, তখন পাড়ার পরিচিত কয়েকজন মুরব্বি আমার পাশে এসে বসেন। আমার মাছ ধরার ব্যর্থ চেষ্টা দেখে দুঃখ করে বলেন, ‘দুই ঘণ্টা কেন, দুদিন চেষ্টা করলেও বড়শিতে মাছ পাবেন না। সামনের দিকে তাকান (আমাদের সামনেই কয়েকটি কোষা নৌকা জাল তুলছিল)। এর নাম চায়না জাল। কোনো কসমেটিক দোকানে ঢুকে চোখ বন্ধ করেই যেমন বলে দেওয়া যায় দোকানের অর্ধেক মাল ‘মেড ইন চায়না’। তেমনই মাছের বাজারে প্রবেশ করে অনায়াসে বলে দেওয়া যায়, এ বাজারের অর্ধেক মাছ চায়না জালের। চায়না জাল সব মাছের মূলোৎপাটন করে দিচ্ছে। নদী-নালার মাছ ডিম ছাড়ে বর্ষার শুরুতে এবং শেষে। বর্ষার শুরুতে ধানের জমিতে পানি প্রবেশের আগেই জমির আলে আলে চায়না জাল পেতে রাখে। ডিমওয়ালা মাছ ডিম ছাড়ার আগেই আটকে যায় জালে। শোল-বোয়াল থেকে শুরু করে বাইনের ক্যাঁচরা পর্যন্ত এমন কোনো মাছ নেই যা চায়না জালে আটকায় না। অজগর সাপের মতো ৪০-৫০ ফুল লম্বা একেকটি জাল। প্রতিটি জালের দুদিকে রয়েছে শতাধিক ছিদ্র। যে ছিদ্রপথে মাছ ভেতরে প্রবেশ করলেই আটকে যায়।
কয়েক যুগ আগে নদীতে নামে কারেন্ট জাল (যে জালের সূক্ষ্ম সুতা পানিতে রাখলে দেখা যায় না)। কারেন্ট জালের পাশ দিয়ে চলাচলকালেই মাছ আটকে যায়। সরকার কারেন্ট জাল নিষিদ্ধ করার পরও ওঠাতে পারছে না। একদিক দিয়ে পুলিশ টহল দিয়ে চলে যায়, আরেকদিক দিয়ে জাল ফেলে রেখে দূরে বসে থাকে জেলে। টম অ্যান্ড জেরি খেলার মতো কারেন্ট জাল নিয়েও পুলিশ-জেলে চলছে এ রকম খেলা। কারেন্ট জালের চেয়েও ভয়ংকর চায়না জাল। চায়না জাল গভীর, অগভীর জল এমনকি বদ্ধ কচুরিপানার নিচেও পেতে রাখা যায়। কচুরিপানার তলায় পেতে রাখা জাল প্রতিদিন ওঠাতে হয় না। মাঝেমধ্যে গিয়ে লেজের দিকের মুখ খুলে মাছ নিয়ে আসেন।
এ জালের দ্বারা নদী-নালা ও খাল-বিলের মাছ কোথাও নিরাপদ নয়। ক্যাঁচরা (খুবই ছোট) মাছ কারেন্ট জালে আটকে না, কিন্তু চায়না জালে আটকে যায়। চায়না জালের কারণেই মৎস্যশূন্য হয়ে পড়ছে নদী-নালা ও খাল-বিল।
লেখক : আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক
advzainulabedin@gmail
