জাতিসংঘ কর্তৃক যে ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য গৃহীত হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রদান করা। ২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ দিনটিকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। প্রতিবছর ১২ ডিসেম্বর সবার জন্য সমান ও টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা ও সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিবস’ পালন করা হয়। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য : ‘কাউকে বাদ না রেখে সবার স্বাস্থ্য সুরক্ষায় স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ করা।’ সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বলতে বোঝায় যে, সব মানুষ কোনো আর্থিক ভোগান্তি ছাড়াই মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা পাবে। তাই সবার জন্য শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশে^র অনেক দেশ মহামারী করোনায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে এই বছরের প্রতিপাদ্য বিষয়টি খুবই প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ।
বিশ্বের শীর্ষ স্বাস্থ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংগঠনসমূহ মনে করে, মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া, মারাত্মক দারিদ্র্যের অবসান ঘটানো, জলবায়ুসংক্রান্ত বিরূপ প্রতিক্রিয়া মোকাবিলার সক্ষমতা অর্জন করা এবং মারাত্মক মহামারীর অবসান ঘটানোর সঙ্গে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি সম্পর্কিত, কারণ সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার মাধ্যমে উক্ত বিষয়গুলো অর্জন করা সম্ভব। ২০৩০ সালের মধ্যে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সকলের সম্মিলিত প্রয়াস দরকার। স্বাস্থ্য অধিকার হচ্ছে সর্বজনীন মানবাধিকার। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার মাধ্যমে সবার নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির পথ সুগম হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংবিধানে উল্লেখ আছে, সর্বোচ্চ মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবাপ্রাপ্তি হচ্ছে মানবাধিকার। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ তাদের জাতীয় সংবিধানে স্বাস্থ্যসেবার অধিকারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছে। বাংলাদেশের জাতীয় সংবিধানের ১৫ ধারার (ক) অনুচ্ছেদে এবং ১৮ ধারার (১) অনুচ্ছেদে স্বাস্থ্যসেবা ও জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার অর্থ হলো উন্নত স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন অর্জন করা, কেউ যাতে অসুস্থতাজনিত কারণে দারিদ্র্যের কবলে না পড়ে সেটা প্রতিরোধ করা এবং মানুষকে স্বাস্থ্যবান ও অধিকতর উৎপাদনশীল জীবনযাপনে সহায়তা করা। বলা হয়ে থাকে যে, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য বিনিয়োগ করা হলে ব্যাপক সুবিধা অর্জিত হয়। সহজে প্রাপ্তিসাধ্য ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবার অভাবে পরিবার ও জাতি দারিদ্র্যের কবলে পড়ে।
সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্য হলো জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার আলোকে উন্নত স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা। উক্ত লক্ষ্যমাত্রার (৩ নম্বর) সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য আর্থিক ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা, মানসম্মত, কার্যকর ও সহজে পাওয়া যায় এমন স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। যে দেশসমূহ সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিয়েছে, তারা এর উপকারিতা লক্ষ্য করেছে। তারা অধিকতর স্বাস্থ্যবান সম্প্রদায় ও অধিকতর শক্তিশালী অর্থনীতি অর্জন করেছে। কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি সত্ত্বেও দেশে এখনো সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়নি। বাংলাদেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ এখনো স্বাস্থ্য সুরক্ষার বাইরে রয়ে গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বছরে বিশ^জুড়ে প্রায় ১০০ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যসেবা হতে বঞ্চিত হচ্ছে। তাদের মধ্যে প্রায় ১৫ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় মেটাতে গিয়ে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে এবং তারা দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশে ৪ কোটি ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছে এবং প্রতিবছর অসুস্থতার কারণে ৬৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের শিকার হচ্ছে।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার জন্য সরকারিভাবে জনপ্রতি ৩৭ ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে, কিন্তু প্রয়োজন ৮৫ থেকে ১১২ ডলার। অথচ পাশর্^বর্তী দেশগুলোয় এই বরাদ্দ অনেক বেশি। এই বিষয়ে সরকারকে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে, অন্যথায় সব মানুষকে স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় আনা সম্ভব হবে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের এক গবেষণায় জানা যায়, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা অর্জনে বাংলাদেশের প্রধান অন্তরায় হচ্ছে উচ্চমাত্রায় ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয়। ব্যক্তির সিংহভাগ টাকা চলে যায় ওষুধের পেছনে। অর্থাৎ বছরে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতে মোট ১০০ টাকা খরচ করলে তার মধ্যে ৬৪ টাকা চলে যায় ওষুধ কিনতে। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার ধারণায় ২০৩০ সালের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে সাধ্যের মধ্যে নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে। অথচ আমাদের দেশে চিকিৎসা পেতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয় এর ৬৭ শতাংশই রোগীকে বহন করতে হচ্ছে। অন্যদিকে, দেশের ৮৬ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা নেয় বেসরকারি খাত হতে। এখানে চিকিৎসা খরচ অনেক বেশি এবং এই খাতে সরকারের প্রায় কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আরও দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, সেবার মান বাড়ার পরও দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা ৯৩ শতাংশ রোগী কোনো ওষুধ পায় না।
লক্ষ্য করা জরুরি, ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতি (আয়ুর্বেদ, ইউনানী ও হোমিওপ্যাথি) দেশের সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশসমূহের প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ তাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার জন্য এই ধরনের ভেষজভিত্তিক ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। ঐতিহ্যগত এই চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহারের একটি সুবিধা হলো এই যে, এসব পদ্ধতি অনুসরণ করে আমরা ব্যয়বহুল বিদেশি ওষুধ আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ফেলতে পারি। আমরা স্থানীয় সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেরাই কম খরচে ওষুধ তৈরি করতে পারি। এই পদ্ধতির মাধ্যমে যে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা করা সম্ভব তা এখন পরীক্ষিত সত্য। দেশের অনেকেই বিপুল অর্থ ব্যয় করে বিদেশে যান চিকিৎসার জন্য। দেশে স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের মাধ্যমে আমরা এটা প্রতিরোধ করতে পারি।
লেখক : পাবলিক হেলথ্ ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশের সাবেক নির্বাহী পরিচালক