আর্জেন্টিনার সামনে সালাহর মিসর

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৭:৫৩ এএম

‘চোখ দুটো বন্ধ করো। ভুলে যাও গ্যালারির ওই ৭০ হাজার মানুষের চিৎকার, ভুলে যাও ক্যামেরার লেন্স। স্রেফ একটা পর্দা ফেলে দাও মনের ভেতর। গোলকিপারকেও দেখার দরকার নেই, শুধু নিজের কিকটায় মন দাও।’ টাইব্রেকারের ঠিক আগ মুহূর্তে ড্রেসিংরুমের আবহ যেন থমকে গিয়েছিল। মিসরীয় ফুটবলারদের চোখেমুখে ৯২ বছরের এক অভিশপ্ত নকআউট গেরোর তীব্র আতঙ্ক। ঠিক তখনই জাদুকরের মতো এগিয়ে এলেন কোচ হোসাম হাসান। ফুটবলারদের কাঁধে হাত দিয়ে বাতলে দিলেন এই ‘পেনাল্টি মন্ত্র’। কোচের এই একটি কথাই যেন টনিকের মতো কাজ করল পুরো দলের ওপর। বিশেষ করে অধিনায়ক মোহামেদ সালাহর জন্য, যিনি এর আগে পেনাল্টি মিসের চোরাবালিতে হারিয়েছেন অনেক কিছু। কিন্তু এই রাতে কোচের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে সালাহ যখন জাদুকরী ‘পানেনকা’ শটে বল জালে জড়ালেন, তখন তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া জল বলছিল ফারাওদের ঐতিহাসিক এক পুনরুত্থানের গল্প আজ রচিত হলো। কোচের সেই অমোঘ বাণী আর সালাহর জাদুকরী নেতৃত্ব; এই দুইয়ের যুগলবন্দিতেই কপাল পুড়ল অস্ট্রেলিয়ার।

ডালাসের সেই বিকেলটা আসলে শুধু ফুটবলের ছিল না, ছিল এক আক্ষেপ মোচনেরও গল্প। যে জাতি মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট মাথায় পরেছে সাত-সাতবার, অথচ বৈশ্বিক মঞ্চের নকআউট নামক গোলকধাঁধায় পা দিলেই যারা পথ হারিয়ে ফেলত, সেই মিসর অবশেষে ডানা মেলল। হোসাম আবদেলমাজিদের ধীরগতির রানআপ, অস্ট্রেলিয়ার পোড়খাওয়া কিপার ম্যাট রায়ানের ভুল দিকে ঝাঁপ দেওয়া, আর বলটা জালে জড়ানোর পর সালাহর হাঁটু গেড়ে বসে অঝোরে কেঁদে ফেলা; এই সবকিছু যেন একটা ফ্রেমে বাঁধা ফুটবলীয় মোক্ষলাভ। মাত্র দুই সপ্তাহ আগে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রথম জয়ের মুখ দেখেছিল যে দল, তারাই অস্ট্রেলিয়াকে টাইব্রেকারে ৪-২ ব্যবধানে গুঁড়িয়ে দিয়ে এখন শেষ ষোলোর অভিযাত্রী।

অথচ ম্যাচের গল্পটা হতে পারত চরম ট্র্যাজেডির। করিম হাফেজের মাপা ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে ম্যাচের ১৩ মিনিটেই ইমাম আশুর যখন দলকে এগিয়ে নিলেন, গ্যালারির লাল সমুদ্র তখন কেবলই উৎসবের ক্ষণ গুনছিল। কিন্তু ফুটবল ভাগ্য নাটক জমা রেখেছিলেন দ্বিতীয়ার্ধের জন্য। ৫৫ মিনিটে অস্ট্রেলিয়ার ফ্রি-কিক ঠেকাতে গিয়ে নিজের জালেই বল জড়িয়ে বসলেন মিসরীয় ডিফেন্ডার মোহাম্মদ হানি। একই বিশ্বকাপে নিজের দ্বিতীয় আত্মঘাতী গোলের এই অপবাদ মাথায় নিয়ে যখন হানি মাঠ ছাড়ার উপক্রম, তখন ম্যাচ গড়াল ১২০ মিনিটের ম্যারাথন ক্লান্তিতে। নির্ধারিত সময়ের শেষ মুহূর্তে রামি রাবিয়ার বুলেট হেড অস্ট্রেলিয়ার তরুণ কিপার প্যাট্রিক বিচ এক হাতে অবিশ্বাস্যভাবে ফিরিয়ে না দিলে হয়তো টাইব্রেকারের এই স্নায়ুযুদ্ধটারই জন্ম হতো না।

অস্ট্রেলিয়ার কোচ টনি পপোভিচ পেনাল্টির ঠিক আগমুহূর্তে কিপার বদলে অভিজ্ঞ ম্যাট রায়ানকে নামিয়ে জুয়া খেলেছিলেন, কিন্তু হ্যারি সুটার আর ১৮ বছরের তরুণ লুকাস হেরিংটনের শট মিসের মহড়ায় সেই বাজি ভেস্তে যায়। ম্যাচ শেষে হৃদয়ভাঙা বিদায়ের পর অস্ট্রেলিয়ার কোচ তার ভেতরের হতাশা লুকাতে পারেননি, ‘খুব কষ্ট হচ্ছে, যখন জয়ের এত কাছে এসেও এভাবে ফিরে যেতে হয়। আমরা বিশ্বকে দেখিয়েছি যে অস্ট্রেলিয়ার ফুটবল কতটা শক্তিশালী। এই ছেলেরা একটি অসাধারণ দল এবং আমি ওদের জন্য ভেতরে ভেঙে পড়েছি। দুর্ভাগ্যবশত পেনাল্টি শুটআউটে আমাদের বিদায় নিতে হলো, যা এই মুহূর্তে মেনে নেওয়া সত্যিই ভীষণ কঠিন ও বেদনাদায়ক। আমাদের বিশ্বকাপ যাত্রা এখানেই শেষ।’

অন্যদিকে, ইতিহাস লেখার রাতে সালাহর চোখের জল ছিল কাতার বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন করতে না পারার সেই পুরনো ক্ষতবিক্ষত স্মৃতির উপশম। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট সামলে ১২০ মিনিট মাঠে থাকা এই তারকা পেনাল্টিতে ‘পানেনকা’ শটে লক্ষ্যভেদ করে অধিনায়ক হিসেবে তার দায়িত্বের প্রতি সুবিচার করেছেন। ম্যাচ শেষে মনের সমস্ত আবেগ ঢেলে সালাহ বলেন, ‘আজকের অনুভূতিটা সত্যিই অবিশ্বাস্য। আমি সবসময় ছেলেদের মুখে এই হাসি দেখতে চেয়েছিলাম, তারা এই মুহূর্তটা উপভোগ করুক। এর চেয়ে আনন্দের আর কিছু হতে পারে না। আজ আমার জীবনের অন্যতম সেরা একটা দিন।’

এদিকে সংবাদ সম্মেলনে নিজের সেই গোপন ‘পেনাল্টি মন্ত্র’ দেওয়ার পেছনের কারণ ফাঁস করে মিসর কোচ হাসানও নিজের গর্বের কথা জানান, ‘টাইব্রেকারের ঠিক আগে আমি ফুটবলারদের কাছে গিয়েছিলাম। আমি চেয়েছিলাম তাদের ওপর থেকে সব চাপ সরিয়ে নিতে। আমি তাদের বলেছিলাম চাপের মুখে নতি স্বীকার করো না... আমি অত্যন্ত গর্বিত যে ছেলেরা ম্যাচের প্রথম মিনিট থেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এমন লড়াকু ফুটবল খেলেছে। আমার মনে হয় ম্যাচের ৯০ শতাংশ সময় নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতেই ছিল।’

ডালাসের রোমাঞ্চকর এই রাত পেরিয়ে ফারাওদের নতুন এই স্বপ্নযাত্রা এখন আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামের দিকে। আগামী মঙ্গলবার যেখানে তাদের দিতে হবে আরও এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা। সালাহদের সামনে দাঁড়িয়ে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন লিওনেল স্কালোনির অপ্রতিরোধ্য আর্জেন্টিনা। ফুটবল রোমান্টিকদের জন্য আটলান্টার এই মঞ্চ তাই কেবল একটি ম্যাচ নয়, বরং ফারাওদের নতুন ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে এক অসম সাহসী লড়াইয়ের গল্প।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত