না, করোনাভাইরাস কিছুতেই আমাদের পিছু ছাড়ছে না। করোনার নতুন নতুন ধরন আমাদের শিকারি কুকুরের মতো তাড়া করে ফিরছে। ভয়ের আবহ থেকে আমরা যেন আতঙ্কের ভুবনে প্রবেশ করছি। একুশের গোড়ায় টিকায় ভরসা করে আমরা ভেবেছিলাম, যাক বাঁচা গেল। কিন্তু দ্বিতীয় তরঙ্গে ভেঙে গেল স্বপ্ন। আর ২০২২ শুরু হলো তৃতীয় ঢেউয়ের ভ্রুকুটি নিয়ে। তাই আমাদের আরও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ওমিক্রনের চোখরাঙানি যেন উপহাস করছে নতুন বছরকে। এক মুহূর্তের শৈথিল্য আরও ভয়াবহ দিকে নিয়ে যেতে পারে আমাদের। যত দিন যাচ্ছে, ততই ভোল পাল্টে ভয়ংকর হয়ে উঠছে করোনার অতিসংক্রামক ধরন ওমিক্রন। করোনার এই সাউথ আফ্রিকান ধরন এরই মধ্যে পৌঁছে গেছে প্রায় ১১২টি দেশে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, এই ঢেউ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিতে পারে। কাজেই ওমিক্রন সংক্রমণ ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।
ফেলে আসা বছরটার পরতে পরতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ, মহামারী, মৃত্যু আমাদের পাশে ওত পেতে বসেছিল। প্রিয়জন বিয়োগ, অপরিমেয় ক্ষতি আর বিচ্ছেদ তা থেকে অনেক সময়েই চিড় ধরছে আত্মবিশ্বাসে। আমাদের মধ্যে বোধহয় এমন কেউ নেই, যার চেনাজানা বিশ্বে কেউ করোনার নিষ্ঠুর থাবার শিকার হয়নি। ফলে শরীরের থেকে বড় হয়ে উঠছে মন। করোনার ঢেউ আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে বিপর্যস্ত করে ফেলেছে। যার জেরে আমরা অনেকেই মুখোমুখি হয়েছি দীর্ঘকালীন মনখারাপ, নেগেটিভিটি আর ডিপ্রেশনের। এর পাশাপাশি আছে আর্থিক বিপন্নতা। ভেঙে পড়ছে অর্থনৈতিক অবকাঠামো। কর্মহীনতার দগদগে চেহারাটা ধরা পড়ছে নানা স্তরে। লকডাউন ও প্রচ্ছন্ন লকডাউন দুমড়েমুচড়ে দিয়েছে আমাদের স্বাভাবিক প্রাত্যহিক জীবনযাত্রাকে। ২০২১ সালের গোড়ার দিকটায় ভাবা হয়েছিল, বোধহয় মহামারীর প্রকোপ থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারছি। বাজারে অল্পস্বল্প করে লেনদেন বাড়ছিল। ভিড় জমছিল পর্যটন কেন্দ্রে, পার্কে, রেস্তোরাঁয়। সরকারও ভেবেছে, বুঝি পরিস্থিতি সামলে নেওয়া গিয়েছে। তাই বিভিন্ন এলাকায় সংসদীয় আসনের উপনির্বাচন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের দামামা বাজিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যেই করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ভোটের সঙ্গে গলাগলি করে এসেছে। এই দ্বিতীয় ঢেউ দেশের অর্থনীতি ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে তছনছ করে দিয়েছে। যার জেরে গেল বছর আমাদের অর্থনীতি তেমনভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। তবে নানা ‘ভেলকিবাজি’-র ফলে আমাদের মাথাপিছু আয় বেড়ে গেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের মানুষের গড় আয় কমে না গিয়ে বেড়েছে। তাই বলে এই মহামারীর ফলে সব বাংলাদেশি নাগরিকের আয় কিন্তু বাড়েনি।
অর্থশাস্ত্রবিদদের মতে তথ্যপ্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত ক্ষেত্রগুলোতে সাধারণ মানুষের ব্যয় বেড়েছে, ফলে এসব ক্ষেত্রে গাণিতিক নিয়মেই আয় বেড়েছে। বেসরকারি ক্ষেত্রে কিছু সংস্থা ভালো করছে। পাশাপাশি যারা সরকারি চাকুরে, তাদের আয়ে কোনো রকম টান পড়েনি। কিন্তু এই কালপর্বে যাদের আয় কমেছে, তাদের সংখ্যাটা এতটাই বেশি এবং আয় এতটাই কমেছে যে, গড় আয় বিষয়টা তাদের জন্য স্রেফ প্রহসন হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদ্বেগ এইখানে, যাদের আয় কমেছে, তারা গরিব মানুষ এবং সংখ্যায় অনেক বেশি আর এর বিপ্রতীপে যাদের আয় বেড়েছে, তারা অবস্থাপন্ন, তারা সংখ্যায় অনেক কম। ফলে এই করোনাকালে আমাদের মতো দেশে অসাম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। কল্যাণকামী রাষ্ট্রে সরকার যতটা পেরেছে বিনামূল্যে রেশন দিয়ে গরিব মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে উদ্যোগী হয়েছে। আমাদের দেশেও বিভিন্ন রকম ঋণ-অনুদান, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতা বাড়িয়ে সরকার চেষ্টা করেছে গরিব মানুষকে সহায়তা প্রদানের। এর ফলে হয়তো মানুষ খাবারটা পেয়েছে কিন্তু কর্মসংস্থানের ব্যাপক সংকোচন মানুষকে এক বিপন্ন সময়ের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এ অবস্থায় ২০২২ সাল এসেছে ওমিক্রনের বিপদকে সঙ্গে নিয়ে। এখন পর্যন্ত ওমিক্রনের ছড়িয়ে পড়ার যে তীব্র স্পৃহা তাতে নতুন বছরের গোড়ার কয়েক মাস অবস্থা তেমন বদলাবে, এমন ভরসা পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিবেশী ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যে অবিশ্বাস্য গতিতে ওমিক্রন সংক্রমিত হচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আবারও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আবার কি লকডাউন শুরু হবে? আবার কি কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে? ছাত্রছাত্রীদের জন্য স্কুলের দরজা আবারও বন্ধ হয়ে যাবে? বন্ধ হবে বাস-ট্রেন, উড়োজাহাজ? মানুষের মনে সৃষ্টি হয়েছে এমন নানা প্রশ্ন, দ্বিধা, সংশয় ও হতাশা।
মহামারীর কিছু রাজনৈতিক চরিত্র আছে। সরকার ভাবে মহামারী মোকাবিলার সেরা উপায় লকডাউন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কার লক? কার ডাউন? ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের অন্যতম উপদেষ্টা বিজ্ঞানী-অধ্যাপক নেল ফার্গুসন লকডাউনকে পরিচিতি দিয়েছেন। আর সেটাকেই করোনা ঠেকানোর শ্রেষ্ঠ উপায় বলে বাতলে দিয়েছেন বিশ্বকে। উন্নত দেশগুলোর জন্য এই নিদান হয়তো শ্রেয় কিন্তু আমাদের মতো দেশগুলোতে লকডাউন তো হাতে হ্যারিকেন। তা ছাড়া নেল ফার্গুসনের লকডাউন তত্ত্বের একমেবদ্বিতীয়ম ভাবনাকে স্রেফ উড়িয়ে দিয়েছেন ভারতের কলকাতায় জন্মগ্রহণকারী এক নারী। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামারী বিশেষজ্ঞ সুনেত্রা গুপ্ত মনে করেন, লকডাউন করোনাযুদ্ধে আদৌ কোনো কাজে লাগে না। উল্টো সমস্ত কাজকর্ম স্তব্ধ করে দেয়। আটকে দেয় জীবনের সাধারণ গতি। আমাদের অভিজ্ঞতাও বলে ২০২০ সালের ২৬ মার্চ মধ্যরাত থেকে চালু হওয়া লকডাউন যতখানি আর্থিকভাবে আমাদের ঘায়েল করেছে, তার সিকি ভাগও কভিড-১৯-কে জব্দ করতে পারেনি। আখেরে লকডাউনে ক্ষতি অনেক বেশি এবং দীর্ঘমেয়াদি। এতে কত মানুষের কাজ চলে গেছে। তাতে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। ছোটরা স্কুলে যাচ্ছে না। তাদের বেড়ে ওঠায় বিরাট ফাঁক তৈরি হচ্ছে। আগামী বহু বছর ধরে এই বিরাট ক্ষতির খেসারত দিতে হবে।
তবে কি বাইশে পা দিয়ে আমাদের ওমিক্রন নিয়ে খুব বেশি চিন্তার কারণ নেই? সম্ভবত নেই। তার কারণ, এখন পর্যন্ত পাওয়া সবগুলো স্ট্রেইনের মধ্যে এটি মনে হয় সবচেয়ে কম প্রাণঘাতী। তাহলে কি আমরা ‘ডু ফুর্তি উড়তি উড়তি’ করে বেড়াব? আমাদের অন্য কিছু করণীয় নেই? ওমিক্রন ছড়িয়ে যাক মনের সুখে? মরছি না যখন, তাহলে সব আগের মতোই চলুক। শিকেয় উঠুক করোনাবিধি। জ্বর-সর্দি-কাশিতে দুদিন ভুগে নেব না হয়। তারপর তো শান্তি। ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে ব্যাপারটাকে এভাবে রাখা যায় কিন্তু সমষ্টির কথা ভাবলে স্টান্সটা বদল করতে হয়। কেন না, সংক্রমণ বাড়লে সমস্যাটা হয়ে দাঁড়ায় প্রশাসন, চিকিৎসা অবকাঠামোর। সর্বোপরি সরকারের। একসঙ্গে বিরাট সংখ্যার রোগী চিকিৎসাব্যবস্থার ঘাড়ে চাপলে কী হতে পারে, ফেলে আসা এপ্রিল-মে-জুনের মর্মান্তিক ছবিটার কথা মনে করতে পারলেই, বুঝতে পারব। সেই সময় গণকবর, হাসপাতালে সিট না পাওয়া, ভেন্টিলেটর না পাওয়া, লাশ কবর দেওয়ার জন্য স্বজনের খোঁজ না পাওয়া ইত্যাদি ঘটনাগুলোর কথা মনে করলে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও সামনে চলে আসে। হ্যাঁ, আমাদের অবশ্যই মুখ ঢাকতে হবে মাস্কে। যতটা সম্ভব এড়াতে হবে ভিড়কে। তাহলেই দূরে থাকবে লকডাউন। খোলা থাকবে সমস্ত কর্মক্ষেত্র, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়। খোলা থাকবে দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। আমরা সচেতন হলে শিকার হতে হবে না লকডাউন রাজনীতির। ২০২২ সালে আমরা লড়াই শুরু করেছি ওমিক্রনের সঙ্গে। আমাদের প্রধান ঢাল হোক মাস্ক। আসুন মাস্ক দিয়ে লকডাউনের রাজনীতিকে প্রতিহত করি। সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি, স্বাভাবিক জীবনকে নিশ্চিত করি।
লেখক লেখক ও কলামনিস্ট