মানবিক সম্পর্কগুলো মন্দের দিকে

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২২, ১০:২০ পিএম

বিদ্যমান নির্মম পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটা মানুষকে ঠেলতে ঠেলতে এখন এমন জায়গাতে নিয়ে গেছে যেখানে সে নিজের স্বার্থটা ছাড়া অন্যকিছু আর দেখতে পায় না। কিছু পুরনো ঘটনা দেখা যাক। নারায়ণগঞ্জে কাউন্সিলর পদে ভোটের লড়াইয়ে [ইত্তেফাক, ২২-১২-২১] স্বামী-স্ত্রী যদি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হন তাতে অস্বাভাবিকতা আছে বলে মনে হয় না। ওই একই পত্রিকায় একদিন আগের খবরটা কিছুটা উন্নত স্তরের : সম্পত্তির জন্য বড় ভাইকে ছোট ভাইরা পাগল সাজিয়ে ৮ বছর ধরে শিকলবন্দি করে রেখেছিল, কর্তৃপক্ষের লোকেরা এসে শেষ পর্যন্ত তাকে মুক্ত করেছে। কয়েকদিন পরের আরও মারাত্মক খবর, জমি নিয়ে বিরোধে জিততে আখাউড়ায় মা’কে খুন করেছে ছেলে। আর বিস্তর আলোড়ন-সৃষ্টি-করে অবশেষে-পদত্যাগকারী প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারমূলক গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ তো আছেই। অন্যরা তা করেছেন, ভদ্রলোকের স্ত্রীও করেছেন। স্ত্রী এবং দুই সন্তানকে লাইসেন্স করা বন্দুক নিয়ে তিনি তাড়া করেছিলেন, যার ফলে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, এমন অভিযোগ এনে স্ত্রী থানায় এজাহার দিয়েছেন। ঘটনাগুলোকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন মনে হতে পারে, কিন্তু আসলে মোটেই তা নয়, এরা সবাই একটি বড় ঘটনারই নানাবিধ প্রকাশ বটে, আর ওই ঘটনাটি হলো এই যে গোটা ব্যবস্থাটাই এখন মারাত্মক রকমের ব্যাধিগ্রস্ত। এবং ব্যবস্থাটা হচ্ছে পুঁজিবাদী।

এই ব্যবস্থায় মানুষ নিরাপদে নেই। ঘরেই নেই; রাস্তাঘাটে থাকবে কী করে? প্রতিদিন সড়কে মানুষ মারা যাচ্ছে। মারা যাচ্ছে না বলে বলা যায় মারা পড়ছে; আরও যথার্থ হবে বললে যে মানুষ মারা হচ্ছে। গত এক বছরে সড়কে নিহত হয়েছেন নাকি ৬,২৮৪ জন [প্রথম আলো, ০৯-০১-২২]। এই মাত্র সেদিন একই পরিবারের পাঁচ ভাই এক সঙ্গে নিহত হয়েছেন চট্টগ্রামে। রাস্তা পার হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন তারা; একটি মাইক্রোবাস দুরন্ত বেগে ছুটে এসে পিষে ফেলে তাদের হত্যা করল; তাদের এক বোনও আহত হয়েছেন গুরুতর ভাবে। আরও এক ভাই মারা গেলেন কয়েকদিন পরে। তিনিও আহত হয়েছিলেন। এরা সবাই তাদের সদ্যপ্রয়াত পিতার শ্রাদ্ধপরবর্তী পূজার অনুষ্ঠান শেষে গৃহে ফিরছিলেন। তাদের বৃদ্ধ মা শোকে একেবারে পাথর হয়ে গেছেন। চট্টগ্রামেরই ফটিকছড়িতে দুজন স্কুলছাত্রীকে হত্যা করল একটি উন্মত্ত ট্রাক, যার কথা ওপরে উল্লেখ করেছি। এই সব চালক সব সময়েই তাড়ার মধ্যে থাকেন। কখনো কখনো পুলিশ তাড়া দেয়, বাকি সময়ে তাড়া দেয় মালিকরা; কিন্তু আসল তাড়াটা আসে অদৃশ্য আরেকজনের কাছ থেকে। তার নাম টাকা। টাকাই তাড়া করে বেড়াচ্ছে সবাইকে। মালিক, চালক, পুলিশ, অব্যাহতি নেই কারোই।

যানবাহন তো মারছেই, দুর্বৃত্তরাও ঘরে বসে নেই। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে গেছেন স্বামী-স্ত্রী, সঙ্গে তাদের শিশুসন্তান, স্থানীয় দুর্বৃত্তরা স্ত্রীকে ধরে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ কাজ চালাল। অসহায় স্বামী ফোন করলেন ৯৯৯-এ। তাকে পরামর্শ দেওয়া হলো থানায় জানাতে। দুষ্কর্ম শেষে দুর্বৃত্তরা মহিলাকে আটকে রাখল একটি হোটেলে। মনের জোর কাজে লাগিয়ে ও বুদ্ধি খাটিয়ে কোনো মতে বের হয়ে মহিলা যোগাযোগ করতে সক্ষম হলেন র‌্যাবের সঙ্গে। র‌্যাবের সদস্যরা এসে তাকে উদ্ধার করল। এর পরে এলো পুলিশের ঝামেলা। অপরাধীদের পাকড়াও না করে, ‘রহস্য’ উদ্ঘাটনের জন্য পুলিশ মহিলাকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে নিল; আটকে রেখে তিনদিন ধরে তাকে জেরা করল, তার জবানবন্দি নিল। তাতে প্রমাণ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল যে ধর্ষকরা মহিলার পূর্বপরিচিত, এবং তারা চাঁদা চেয়েছিল, তাই নিয়ে, ইত্যাদি ইত্যাদি। যাকে বলে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা, তারই চেষ্টা। সেটা সম্ভব হয়নি, কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্য একটি বাহিনী, র‌্যাব, নির্যাতিত মহিলাকে উদ্ধার করেছে, এবং তারা জানতে পেরেছে কী ঘটেছে। ভিন্ন খাতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টার পেছনের কারণ সম্ভবত এই যে, অপকর্মকারী প্রধান দুর্বৃত্তটি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। সে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতির অনুসারী, এবং ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে তার অংশগ্রহণ বেশ দৃশ্যমান। স্থানীয় এমপি’র সঙ্গেও সে ছবি তুলেছে। দেখাতে পারে। নির্যাতিত মহিলা বলেছেন যে পুলিশ তাকে যা বলতে বলেছিল তিনি তাই বলেছেন, প্রাণের ভয়ে। প্রধান আসামিটি এর আগে এক ছাত্রীকে হোটেলে আটকে রেখে ধর্ষণ করেছে বলে তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে অনেক মামলা, শ্রীমান ইতিমধ্যে একবার জেলও খেটে এসেছে। কিন্তু এবার তাকে ধরা যাচ্ছিল না। সে নাকি প্রকাশ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছিল কয়েকদিন ধরে। শেষমেশ অবশ্য ধরা পড়েছে। না-পড়ে উপায় ছিল না, কারণ গণমাধ্যমে হৈ-চৈ শুরু হয়ে গিয়েছিল। প্রতিকার না হলে পর্যটন শিল্পে ধস নামবে এমন আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছে।

এরই পাশাপাশি, সাগর সৈকতে নয়, ঘোড়াশালের রেলস্টেশনের কাছে আরেক মহিলা ধর্ষিত হয়েছেন। তিনিও তার স্বামীর সঙ্গে ঘুরতে বের হয়েছিলেন; উভয়েই শ্রমজীবী, থাকেন তারা দুই শহরে, ছুটি নিয়ে একসঙ্গে কিছুটা সময় কাটাচ্ছিলেন। ঘুরতে বের হয়েই বিপদে পড়লেন। তিনটি যুবক এসে স্বামীকে মারধর করে স্ত্রীকে ধরে নিয়ে চলে গেল, দেড় কিলোমিটার দূরে কোথাও। উদ্দেশ্য ওই একই। অসহায় স্বামী আকুল কণ্ঠে স্থানীয় দোকানপাটের লোকজনদের কাছে গিয়ে সাহায্য চাইলেন। আর তখনই সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটল, যেমনটা আগের দিনে কখনো ঘটত না। কেউ সাড়া দিল না, তাদের ভয় ঝামেলাতে পড়বার। বিপন্ন স্বামী দেখেন তিনি একেবারে একলা। বুদ্ধি করে ৯৯৯-এ ফোন করেছেন। ভাগ্য ভালো, সাড়া পেয়েছেন। স্ত্রীকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু যা ঘটবার তা তো ঘটে গেছে। বাংলাদেশে এক সময়ে এখানে সেখানে বেশ ভালো রকমের বনজঙ্গল ছিল, ভয় থাকত মাংসাশী পশুর আক্রমণের। বনপথে পথিক পেলে ডাকাতরাও হামলা করত; এখন তো বনজঙ্গল নেই, সাফসুতরো হয়ে গেছে, প্রায় কোনো স্থানই আর নির্জন নয়, সর্বত্রই আলো, সর্বক্ষণই জনতার ভিড়, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে আগের সেই বর্বর সময়ের তুলনাতে মানুষ অধিক বিপন্নদশায় রয়েছে, মনুষ্যবেশী মাংসাশী ডাকাতদের হাতে গিয়েও তারা পড়ছে। আরও যেটা হতাশাজনক তা হলো আর্তচিৎকার শুনলে আগের দিনে মানুষ সাড়া দিত, এখন দেয় না। সব সাহস এখন বদমাশদের; সব ভীরুতা ভালো মানুষের। শেষ পর্যন্ত এটাই দাঁড়িয়েছে উন্নতির পরিণতি। মানবিক সম্পর্কগুলো বদলে গেছে। ভালোর দিকে নয়, খারাপের দিকেই।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নিয়মই এটা যে সে মুনাফা বাড়াবে এবং বাড়াতে গিয়ে শ্রমশক্তিকে কেবল যে শোষণ করবে তাই নয়, বেকারত্বও বৃদ্ধি করবে। সেটা সে করছেও। করোনাকালে বিশ্বব্যাপী বেকারের সংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে বাংলাদেশেও। করোনার আগেই বেকারত্বের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার ২৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান ছিল দ্বিতীয়, এখনো নিশ্চয়ই তাতে পরিবর্তন ঘটেনি। সার্বিক অবস্থাটা আগেও খারাপ ছিল, এখন আরও খারাপ হয়েছে। বিসিএস পরীক্ষায় পাস করেছে, কিন্তু চাকরি পায়নি এমন তরুণের সংখ্যা দেখলাম ৩১,৮৭৪ জন। যে পত্রিকা খবরটি দিয়েছে, সেটিতে পাশাপাশি পাস-করা ওই বেকারদের একজনের ছবিসহ একটি বক্তব্য ছাপা হয়েছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে যুবকটি গলায় প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে আছে; প্ল্যাকার্ডে লেখা, ‘আমি বিসিএস পাস বেকার’। তার বক্তব্য, “ভিক্ষুকদেরও দাম আছে, কিন্তু আমার নেই।” [দেশ রূপান্তর, ১০-০২-২০] উচ্চশিক্ষিত আরেক যুবক বিসিএস পর্যন্ত যেতে পারেনি, আসতে পারেনি এমনকি ঢাকা পর্যন্তও, বগুড়াতে নিজের বাসার কাছে লাইটপোস্টের গায়ে বিজ্ঞাপন টানিয়ে দিয়েছে, ‘দু’বেলা খাবারের বিনিময়ে পড়াতে চাই।’ বিজ্ঞাপনটি ফেইসবুকে ভাইরাল হওয়াতে পুলিশ বাহিনী তৎপর হয়েছে, অভ্যন্তরে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে কি না জানবার জন্য; পরে যখন নিশ্চিন্ত হয়েছে যে যুবকের অন্য কোনো অভিসন্ধি নেই, চাকরি পাওয়া ছাড়া; বাহিনীর লোকেরা তখন সাহায্যের হাত প্রসারিত করেছে, এবং তাদের আগ্রহের দরুন যুবকটির জন্য শেষ পর্যন্ত একটি চাকরির ব্যবস্থা হয়েছে। কিন্তু ওই যুবক মোহাম্মদ আলমগীর কবির নাম তো একা নয়, লাখ লাখ যুবক বেকারের সে একজন মাত্র; অন্যরা সবাই যদি ওই রকমের বিজ্ঞাপন প্রচারে নেমে পড়ে তাহলে সেসব পড়বার লোক পাওয়া যাবে না, সাড়া দেওয়া তো ভার।

নতুন নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে। পদ ছিল পাঁচটি। পদের জন্য যোগ্যতাটা শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, কর্মদক্ষতা সবদিক থেকেই অতিশয় উচ্চ মানের হওয়া চাই। কিন্তু পদের জন্য নাম এসেছিল ৩২২টি। নাম দলীয়ভাবে এসেছে, পেশাজীবীদের ৬টি সংগঠনও নাম পাঠিয়েছে। যেটা খেয়াল করবার বিষয় সেটা হলো যে ব্যক্তিগত ভাবেও ১৩৩ জনের মতো প্রার্থী দরখাস্ত দাখিল করেছিলেন। এদের কেউ কেউ বিদেশে আছেন, অন্যদেরও অবকাশভোগী হওয়ার কথা। এ বিষয়ে আমাদের বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে এদের প্রত্যেকেই মনে করেন যে তিনি যোগ্য, আমরাও মনে করি তারা প্রত্যেকেই যোগ্যতাসম্পন্ন; কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে পদ তো মাত্র পাঁচটি, বাকিরা তো ‘বেকার’ই রয়ে গেলেন। নির্মম বাস্তবতা হলো দেশে কর্মী আছে কিন্তু কাজ নেই; অথচ উন্নতি কিন্তু মোটেই থেমে নেই, অনবরত ঊর্ধ্বগামী হচ্ছে।

চাকরি যে কতটা প্রাণান্তকর প্রয়োজন তার একটি প্রমাণ হচ্ছে চাকরির জন্য পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা। প্রশ্ন ফাঁস হয়। লাখ লাখ টাকার লেনদেন ঘটে। এর সঙ্গে অন্যরা তো বটেই, শিক্ষকরাও জড়িত হয়ে পড়েন। সম্প্রতি অভিযুক্ত হয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক। জনপ্রতিনিধিরা যে পেছনে পড়ে থাকছেন তাও নয়। অডিট অফিসার নিয়োগের জন্য পরীক্ষা হচ্ছিল। শোনা গেল প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। এবং তার সঙ্গে জড়িত হচ্ছেন বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার ভাইস-চেয়ারম্যান। ইনি একজন মহিলা। ছাত্রী থাকা অবস্থায় ইডেন কলেজে ছাত্রলীগের বেশ বড় মাপের নেত্রী ছিলেন; তখন ভর্তিবাণিজ্য ও ছাত্রীনির্যাতনের দায়ে অভিযুক্তও হয়েছেন। পরবর্তী সময়ে সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নিয়ে কর্মক্ষেত্রের সম্প্রসারণ ঘটাতে এবং জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হতে পেরেছেন। [সমকাল, ২৩-০১-২২] এরপরে ওই প্রশ্ন-ফাঁস কান্ডে তার সংযুক্তি। ধাপে ধাপে ক্রমোন্নতি।

লেখক ইমেরিটাস অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত