ঈদযাত্রা হোক নিরাপদ ও যানজটমুক্ত

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২২, ১০:৪৩ পিএম

প্রতি বছর ঈদের নানান সংবাদের মধ্যে একটি অন্যতম সংবাদ থাকে ঈদযাত্রার নানান ভোগান্তি। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে দীর্ঘ এত মাইল যানজট বা লঞ্চে উপচেপড়া ভিড় ও ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন কিংবা ফেরিঘাটে দীর্ঘ ও তীব্র যানজট প্রভৃতি সংবাদের সঙ্গে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। এসব সংবাদ আমাদের ঈদকেন্দ্রিক কেনাকাটা, ঈদের জমজমাট বাজার কিংবা নানান ঈদ-সম্পর্কিত রিচুয়ালসের অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে, আমরাও অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি এবং ভোগান্তির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করেছি।

কেননা, নানান সীমাবদ্ধতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া আমাদের এখন জাতীয় চরিত্রের অংশে পরিণত হয়েছে। এটার অবশ্য অনেকগুলো ভালো দিক আছে। কেননা, প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশে চাহিদার তুলনায় জোগান কম থাকবে এবং কোটি কোটি মানুষের বহুমাত্রিক আকাক্সক্ষার সবসময় পূর্ণতা থাকবে না, সেটা খুবই স্বাভাবিক। ফলে, ‘মানিয়ে নেওয়াই ভালো’ এ জাতীয় মানসিকতা আমাদের তৈরি হয়ে গেছে। তাছাড়া, মানুষ এমনিতেই প্রাণী হিসেবে ঐতিহাসিকভাবেই শ্রেষ্ঠ অভিযোজন ক্ষমতাসম্পন্ন প্রাণী। ফলে, ঈদযাত্রার নানান ভোগান্তিও মানুষ মোটামুটি মেনে নিয়েছে। এবং সে মোতাবেক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। চরম ভোগান্তিতে থাকা ঘরমুখী মানুষের যখন সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়, তখন এসব মানুষ অত্যন্ত চমৎকার একটা হাসি নিয়ে বলে, ‘ঈদের আনন্দ করতে হলে তো একটা কষ্ট হবেই। মা-বাবা ভাই-বোনদের সঙ্গে, পরিবারের সঙ্গে ঈদ করব। সে আনন্দের কাছে এ কষ্ট কিছুই না’। মানুষের এই যে মানিয়ে নেওয়ার প্রবণতা এবং পরিবারের সঙ্গে ঈদ-আনন্দ শেয়ার করার মানসিকতা, এটাও আমাদের ঈদ সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। তথাপি, সম্প্রতি যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এবারের ঈদযাত্রার যে একটা ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, সেটা খানিকটা চিন্তার উদ্রেক করেছে বৈকি। আমরা সবাই চাই, আমাদের সবার ঈদযাত্রাটা নিরাপদ হোক কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব সেটাই মূল প্রশ্ন। তবে, আজকের দুনিয়াতে অসম্ভব বলে খুব বেশি কিছু কী আছে? সেটাও আশার আলো দেখায়! 

এটা এখানে লেখা বাহুল্য যে, ২০২০ এবং ২০২১ সালের ঈদযাত্রাটা খুব একটা আনন্দদায়ক ছিল না। করোনাভাইরাসের কারণে সরকার ঈদযাত্রাকে পুরোপুরি নিরুৎসাহিত করেছে এবং ঈদের সময় কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। কিন্তু মানুষকে রুখে রাখা যায়নি। ‘দ্যাশের টান’কে রুখে দেওয়ার সাধ্য করোনাভাইরাসেরও নেই, কঠোর বিধিনিষেধেরও নেই। তাই, সমস্ত গণপরিবহন বন্ধ রাখার পরও লাখ লাখ মানুষ ঢাকা ছেড়ে ‘দ্যাশের বাড়িতে’ ঈদ করেছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের, নিম্নবিত্তের এবং শ্রমজীবী মানুষ সীমাহীন কষ্ট করে ‘দ্যাশের বাড়িতে’ ফিরে গেছে ঈদ করতে। কেননা, এ লোহা-লক্কড়ের, দালানকোঠা ও ঝকঝকে ঢাকা শহর এসব নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য এখনো ‘দেশ’ হয়ে ওঠেনি। তাই, তারা ‘দেশ’ ছেড়ে ‘দ্যাশে’ যায়।

এবার যেহেতু করোনার চোখ রাঙানি নেই, কঠোর বিধিনিষেধ নেই এবং খানিকটা রুদ্ধশ্বাসমুক্ত স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে, সেহেতু এবার প্রচুর মানুষ গ্রামের বাড়িতে, ‘দ্যাশের বাড়িতে’ ঈদ করতে যাবে, সেটাই স্বাভাবিক। গত দুুইবার যারা যেতে পারেনি, তারাও যাবে ‘দ্যাশের বাড়িতে’ বাবা-মা আর পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ করতে। বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি করোনার ভয়ে এবং যাত্রা-কষ্টের আতঙ্কে গত দুই বছর নগরে ঈদ পালন করলেও এবার কোনোভাবেই নিজেকে নগরে আটকে রাখবে না। নিজের সন্তান-সন্ততিকে নিয়ে যাবে নিজের গ্রামের বাড়িতে বাস করা বাবা-মার সঙ্গে ঈদ করার জন্য। দাদা-দাদি বা নানা-নানির সঙ্গে নাতি-নাতনির ঈদ যেন ভালোবাসা আর আবেগের এক স্বর্গীয় অপূর্ব মিলনমেলা। ফলে, এবার যে মানুষের ঢল নামছে ঈদযাত্রায় সেটা সহজেই অনুমেয়। তাছাড়া, ঈদকে মাঝখানে রেখে আগে-পিছে একটু হিসাব-নিকাশ করে নিলে, দেখা যাচ্ছে প্রায় ৯/১০ দিন ছুটি। ফলে, ঈদযাত্রায় এটাও একটা বাড়তি প্রণোদনা জোগাবে নিঃসন্দেহে।

২০১৯ সালের আগে এক হিসাব অনুযায়ী ঈদে বাড়ি যেতেন প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ লোক। ২০২০ এবং ২০২১ সালে করোনাভাইরাস এবং বহুবিধ নিষেধাজ্ঞার কারণে সেটা ছিল প্রায় ৬০ লাখের মতো। যাত্রী কল্যাণ সমিতির ব্রিফিং অনুযায়ী, এবার সেটা প্রায় দ্বিগুণ হবে। অর্থাৎ ১ কোটি ২০ লাখেরও বেশি মানুষ ঢাকা ছেড়ে যাবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ঢাকা থেকে বের হওয়ার যে পথ, সেখানে যাদি ১ কোটির বেশি মানুষ একই সঙ্গে যাত্রা শুরু করে, তাহলে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হবে, তা সহজেই অনুমেয়।

এক হিসাব অনুযায়ী সড়কপথ, রেলপথ, নৌপথ এবং আকাশপথে ঢাকা থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১৩-১৪ লাখ লোক বের হতে পারবে। বাসে করে সড়কপথে ৮ লাখ, ট্রেনে একদিনে সর্বোচ্চ ১ লাখ, লঞ্চে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫০ হাজার, প্লেনে খুব বেশি নয় আর ব্যক্তিগত গাড়িতে ৩-৪ লাখ। এছাড়াও অবৈধভাবে ট্রেনের ছাদে এবং ট্রাকে করে প্রায় ২ লাখ মানুষ ঢাকা থেকে বের হতে পারবে। সব মিলে ১৫-১৬ লাখ। কিন্তু ঈদের আগের প্রথম ৪ দিন দৈনিক গড়ে প্রায় ৩০ লাখ লোক ঢাকা ছাড়বে। অর্থাৎ আমাদের সর্বমোট সক্ষমতার দ্বিগুণ মানুষ প্রতিদিন ঢাকা ছাড়বে। স্বাভাবিক কারণেই রাস্তার ওপর এবং গণপরিবহনের ওপর একটা বিরাট চাপ পড়বে।

এর বাইরেও নানান বিড়ম্বনা যেমন অতিরিক্তি ভাড়া আদায়, টিকিটের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে কালোবাজারে চড়াদামে টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা, রাস্তায় রাস্তায় চাঁদাবাজি, রাস্তায় ট্রাফিক-নিয়ন্ত্রণে নানান অব্যস্থাপনা, হাইওয়েতে নানান অব্যবস্থাপনা, ফেরিঘাটে যাত্রী এবং যানবাহনের চাপে দীর্ঘ যানজট এবং বিভিন্ন টোল প্লাজায় দীর্ঘ লাইন প্রভৃতি। সব মিলিয়ে ঈদ যাত্রা একটা কঠিন যাত্রায় পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আমার ধারণা, আমরা সাধারণ মানুষ যেসব বিষয় সহজেই অনুমান এবং ধারণা করতে পারছি, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা নিশ্চয় আরও বেশি ধারণা রাখেন এবং সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন। আমরা বিশ্বাস করতে চাই যে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ লাখ লাখ মানুষের ঈদযাত্রাকে নির্বিঘœ করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন। সড়কপথ, নৌপথ এবং রেলপথে যেহেতু অধিকাংশ মানুষ ভ্রমণ করেন, সেক্ষেত্রে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করার পাশাপাশি, যাত্রীদের জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্বের দাবি রাখে। কেননা, ঈদযাত্রায় অনেক সময় নানান দুর্ঘটনা ঘটে। লঞ্চডুবির ঘটনা প্রায় আমরা দেখতে পাই। সুতরাং অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করার ব্যাপারটিও গুরুত্বের সঙ্গে মনিটরিংয়ের প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি। বিশেষ করে লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী না তোলা এবং ট্রেনের ছাদে যাতে কোনো যাত্রী ভ্রমণ করতে না পারে সে ব্যাপারটি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি মহসড়কগুলোর যানজট নিয়ন্ত্রণে হাইওয়ে পুলিশের সংখ্যা এবং তৎপরতা বাড়ানোকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। ঢাকা থেকে বের হওয়ার পথগুলোতে যাতে কোনোভাবে যানজটের সৃষ্টি না-হয়, সেদিকে বিশেষ করে নজর দিতে হবে।

পাশাপাশি সবাই এক সঙ্গে যাত্রা শুরু না-করে, পরিবারের অফিস-যাওয়া সদস্যকে রেখে অন্য সদস্যরা ২৫ তারিখের আগেই ঢাকা ত্যাগ করলে ঈদযাত্রা অনেক আরামপ্রদ হবে বলে বিশেষজ্ঞরা যে মতামত দিচ্ছেন সেটাও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা জরুরি। কেননা, এ সিদ্ধান্তটা নিতে হবে ব্যক্তি পর্যায়ে। তবে, আমরা চাই এবারের ঈদযাত্রা হোক নিরাপদ এবং যানজটমুক্ত। সেজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, বাস-লঞ্চ মালিক ও কর্মচারীরা, সরকার এবং ব্যক্তি পর্যায়ের সিদ্ধান্ত প্রভৃতি একত্রে একটা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করলে এবারের ঈদযাত্রা অবশ্যই আনন্দময়, নিরাপদ ও যানজটমুক্ত হবে আমি বিশ্বাস করতে চাই। আমার বিশ্বাস বাস্তবতার আলো দেখবে! সবার ঈদযাত্রা নিরাপদ ও আনন্দময় হোক।

লেখক নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত