সম্মোহিত সময়

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২২, ১০:২৩ পিএম

ইহুদি বংশোদ্ভূত মার্কিন ভাষাচার্য, জ্ঞানভিত্তিক বিজ্ঞানী, দার্শনিক, সমকালীন সমাজ ও রাজনীতির কট্টর সমালোচক নোয়াম চমস্কি ( ১৯২৮-) গত ১৭ এপ্রিল  জেরুজালেম পোস্টে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ইউক্রেনকে রাশিয়ার সঙ্গে বিবাদ বিতন্ডায় নমনীয় হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন  (Ukraine must make concessions to Russia’s demands)। খোদ আমেরিকার নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোটের পক্ষ থেকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়ার প্রেক্ষাপটে  চমস্কির এহেন পরামর্শ বিশেষ গুরুত্ববহ। চমস্কি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে পারমাণবিক যুদ্ধের গৌরচন্দ্রিকা মনে করেন। আলামত দেখে বোঝা যাচ্ছেও তাই। এখানে এক পক্ষ নমনীয় না হলে সমানে সমানে হওয়ার জেদাজেদিতে মারণাস্ত্র বিক্রি বাড়বে, মানুষই মানুষকে মরণ কামড় দেওয়ার উন্মাদনা বৃদ্ধি পাবে, ঠান্ডা যুদ্ধের পুনর্জাগরণ ঘটবে, শিবিরে শিবিরে ভাগ হয়ে দুর্বল হবে বিশ্বশান্তি, সত্য দুর্বল হবে, মিথ্যা বলবান হবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে  মানাবাধিকার আর প্রাকৃতিক ভারসাম্য।

দুবছর আগে ২০২০ সালের ৩০ এপ্রিল, মার্কিন মুলুকসহ বিশ্বব্যাপী করোনা যখন প্রচন্ড মারমুখী, নিজে আইসোলেশনে চলে গিয়েছিলেন চমস্কি। সেখান থেকেই এক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন করোনার উদ্ভব-উৎপত্তি, বিস্তৃতি সবই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তার মতে চীনের বাইরে দেশগুলোর কাছে করোনার ভয়াবহতার তথ্য আগে থেকে থাকা সত্ত্বেও (Nothing was done. The crisis was then made worse by the treachery of the political systems that didn’t pay attention to the information that they were aware of.) রাজনৈতিক ভেদবুদ্ধির ফেরে কিছুই করা হয়নি, নইলে করোনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি কমানো যেত। দুই পরাশক্তির মধ্যে কে কাকে টপকাবে কিংবা কে কাকে আটকাবে এ-ধরনের একটা ‘নিজের নাক কেটে পরের যাত্রাভঙ্গ’ কৌশলের প্যাঁচে পড়ে গোটা বিশ্ব হয় এক মর্মান্তিক মহামারীর শিকার।

চমস্কি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন মানবভাগ্যের জন্য এরপর অপেক্ষা করছে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে উপর্যুপরি প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলার মতো মর্মান্তিক মুহূর্তগুলো। আর এসবের  গ্র্যান্ড ফিনালে হবে পারমাণবিক যুদ্ধে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ সীমিত অবয়বে ও পরিমিত মেজাজে রাখতে না পারলে এটি দীর্ঘমেয়াদি মহাসমরে রূপ নেবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে করোনার অভিঘাতে ঘি ঢালা হচ্ছে ইউক্রেন-রাশিয়া সমর। তবে এ যুদ্ধ সিরিয়া, ইরান, ইরাক, আফগানিস্তানের মতো থেমে থেমে চলবে না। এখানে দুপক্ষই পারমাণবিক অস্ত্র বিশারদ, পন্ডিতে পন্ডিতে পাছড়া-পাছড়িতে গোটা দুনিয়ার প্রাণ যায় যায় অবস্থা হবে। সে কারণে চমস্কি ইউক্রেনকে আহ্বান জানিয়েছেন সুর নরম করতে,  (যদিও তা হবে অসম্ভব এবং অত্যন্ত স্পর্শকাতর) যাতে উত্তেজনা বৃদ্ধি না পায়। করোনা মহামারীকালে বিশ্বব্যাপী যে আর্থ-সামাজিক বিপর্যয় ঘটেছে তার থেকে উঠে দাঁড়াতে বিশে^র এখন সুস্থ সময় প্রয়োজন। করোনায় সম্মোহিত সময় আর যাতে প্রলম্বিত না হয় সেদিকে সবাইকে নজর দিতেই হবে।        

বুকারজয়ী ভারতীয় ঔপন্যাসিক ও লেখক অরুন্ধতী রায় ২০২০ এর ৮ এপ্রিল এই [করোনা] মহামারী নতুন দুনিয়ায় ঢোকার পথ শীর্ষক লেখায় তুলে ধরেছিলেন করোনা আক্রমণের প্রদোষ কালের কথা দরজার হাতল, কাগজের বোর্ড, শাক-সবজির ব্যাগ, এমন নির্দোষ জিনিসগুলোর দিকে তাকালেও এখন মনে হয় অদৃশ্য, অনাবৃত জীবাণু রয়েছে সেখানে, যা আমাদের ফুসফুসকে আঁকড়ে ধরার জন্য মুখিয়ে আছে। আতঙ্কিত না হয়ে এখন কার পক্ষে লাফিয়ে বাসে চড়া বা বাচ্চাকে স্কুলে পাঠানোর মতো বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করা সম্ভব? ঝুঁকির কথা না ভেবে কে ভাবতে পারে মামুলি আনন্দের কথা? আমাদের মধ্যে এমন কে আছে, যে আধা চিকিৎসক, ভাইরোলজিস্ট, পরিসংখ্যানবিদ বা ভবিষ্যদ্বক্তা নয়? এমন কোনো বিজ্ঞানী বা চিকিৎসক কি আছেন, যিনি গোপনে অলৌকিক কিছুর আশা করছেন না? কোনো ধর্মীয় গুরু আছেন, যিনি অন্তত গোপনে বিজ্ঞানের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি? আর এই ভাইরাসের বিস্তারের মধ্যেই বিরান শহরে পাখির গান, রাস্তার ক্রসিংয়ে ময়ূরের নাচ ও আকাশের নীরবতা কাকে রোমাঞ্চিত করবে না?

তারপর করোনাকান্ড দেখেছে গোটা বিশ্ব। এখন অনেক দেশে এমনভাব দেখা যায় যে করোনা কী করতে পেরেছে আমাদের? করোনা গোটা বিশ্বকে, সমাজকে, ব্যক্তিকে এমন এক সম্মোহিত সময়ের মধ্যে নিক্ষেপ করেছে যে  স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে স্বার্থান্ধ অর্থনীতি আর রাজনীতির ভেদবুদ্ধিজ্ঞানের কাছে জিম্মি হয়েই চলেছে। করোনার আক্রমণের লক্ষ্য বা প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল সমাজ ও পরিবার বিচ্ছিন্ন একেকজন মানুষ, সেই একেকজন মানুষের মন-মানসিকতায়, আত্মবিশ্বাস ও শক্তিতে, আত্মশুদ্ধিতে কেমন পরিবর্তন সূচিত হয়েছে বা হচ্ছে সেটাই এখন ভাববার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সহজে সংক্রমণের ভয় ঢুকিয়ে, প্রতিরোধ ও প্রতিষেধকের ধোঁয়াশে পরিস্থিতিতে ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধার, মানুষ সামাজিক দূরত্বে থাকার নামে পরিবার ও আপনজনেরাও রোগাক্রান্তকে  সহানুভূতি জানাতে ভয় পেয়েছে, এমনকি স্থানীয় লকডাউনের নামে প্রচন্ড অমানবিক আচরণের শিকার হতে হয়েছে এই মানুষকেই। আক্রান্ত বলে কথিত পরিবারের শিশুসহ ছয়জনকে ঘরে আটকাতে ছয়টি তালা ঝুলিয়েছে প্রতিবেশীরা এ ছবি সামাজিক মিডিয়ায় এসেছিল।

পরিবেশ প্রতিবেশে অভূতপূর্ব অনেক কিছুই ঘটেছিল যা প্রচারে নিত্য বেদনা ও বিস্ময়ের উদ্রেক হতো। করোনা আক্রমণের গতি-প্রকৃতি পরিবর্তনের মাত্রা এবং এর এখতিয়ার এত ব্যাপক ছিল যে এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা যেমন কষ্টকর তেমনি নিকট অতীতকেও স্মরণে আনার ফুরসত কমে স্মৃতিভ্রষ্টতায় ভুগছে অনেকে। সত্যজিৎ রায়ের ‘বিপিন চৌধুরীর স্মৃতিভ্রষ্টতা’ এ ধরনের একটি কল্পকাহিনী।  

এসব বাস্তব বিষয় বিবেচনায় এনেই স্বামী বিবেকানন্দের ভাষায় ব্যক্তি মানুষকে   ‘মনরে! মনরে চল নিজের নিকেতনে’র ভাবনায় নিজে নিজে হতে হবে সচেতন, সাবধান। নিজে শরীরের দেহের যত্ন, মনকে ভালো খাবার, পরিবেশকে বান্ধব করে তোলার পদক্ষেপ নিজেকেই নিতে হবে। সে সময় কর্তৃপক্ষ যেমন বলেই দিয়েছিলেন, ‘চিকিৎসক ও চিকিৎসার আশায় বসে না থেকে নিজেই দায়িত্বশীল হন নিজের প্রতি।’ ব্যক্তি নাগরিককে তখন বড় করুণ দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে ফিরে যেতেই হয়েছিল, তাকেই তার শক্তি ও সাহস এবং শান্তির প্রেরণা খুঁজতে হবে। তাকে অনুভবের আয়নায় বৃষ্টির রিম ঝিম শব্দে, শ্রাবণের জোয়ারে নদীর পথ চলায়, পাখির কুজনে, কুহেলী কুয়াশায় ঢাকা শীতের ভোর, শরতের নির্মেঘ আকাশ, কৃষ্ণচূড়া, বাগানবিলাস আর আজালিয়ার সৌন্দর্যে ভাবালুতায় মুখ লুকাতে হবে, শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে হবে। পশু, পাখালীর নিত্যদিনের সাংগীতিক জীবনযাত্রা কান পেতে শুনতে তাদের সঙ্গে সবার সঙ্গে একাত্ম হতে হবে। এরা সবাই বিধাতার, বিধাতাও এদের সবারই। মনের সব জড়তা, কূপম-ূকতা, দীনতা, হীনতা ঝেড়ে মুছে ফেলে নিজেকে নির্ভার করে তুলতে হবে। হিংসা, দ্বেষ, ঈর্ষা, রাগ, ক্ষোভ, ভয়, আশঙ্কা, সংকোচ, শঙ্কা, সংক্ষুব্ধতা সবই ত্যাগ করতে পারলে নিত্যনতুন উদ্যমে গৌরব প্রত্যাশায় উদ্বেল হয়ে উঠবে মন। নিজেকে নির্ভার করে তুলতে হবে। করোনা প্রতিরোধে এবং সম্মোহিত সময়ে এখন অন্যতম অবলম্বন নিজের মনের জোর ও মানসিক শক্তির। 

এটা ভুলে যাওয়া কিংবা উপেক্ষার আবকাশ নেই যে মহামারী করোনা এসেছিল  যুগ যুগ ধরে মানবতার অবমাননা, বৈষম্য, লোভ-লালসা, মিথ্যাবাদিতা ও অহমিকার যে পাপাচার বিশ্বকে  গ্রাস করছিল তার সমুদয় দূর করতে গোটা  বিশ্বময় একটা প্রবল ঝাঁকুনি দিতেই। করোনাভাইরাস শক্তিশালীদের মাথা নত করতে বাধ্য করেছিল এবং সারা বিশ্বকে এমনভাবে থমকে দিয়েছিল, যা আগে  কেউ পারেনি। করোনা সবাইকে চিন্তা করতে বাধ্য করছে যে এই মহামারী  নিজেদের জন্য তৈরি করা হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে মহামারী সব সময় বিশ্বকে নতুনভাবে কল্পনা করতে বাধ্য করে। এক বিশ্ব থেকে নতুন আরেক বিশ্বে যাওয়ার বাহক হতে পেরেছে কি  করোনা?

সম্মোহিত সময়ে  উপলব্ধির উপলব্ধিও ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। ধারকর্জ করে কেনা টিকা ‘ফ্রি বিতরণের’ হিসাব যখন অস্বচ্ছতায় আকীর্ণ হয়, মারণাস্ত্র বিক্রির উপলক্ষ নির্মাণের নামে একটার পর একটা যুদ্ধ বাধানো হয়, সামাজিক অস্থিরতা, কর্মহীন মানুষের দারিদ্র্য চরমে পৌঁছানোর পরও অপব্যয় অপচয় দুর্নীতি অব্যাহত থাকে, দুর্নীতিজাত অর্থ ব্যয়ে  কর্মচাঞ্চল্য দেখিয়ে সবকিছু  ‘চমৎকার চলছে’ এমন প্রগলভতা প্রকাশ,  দারিদ্র্যের পরিসংখ্যান কিংবা  বারবার উঁকি দেওয়া অসহিষ্ণু পরিস্থিতির দায়ভার অনির্বচনীয়, অপ্রাসঙ্গিক বস্তপচা দোষারোপের মাধ্যমে মোকাবিলার পথ বেছে নেওয়া হয়, সবার মুখ বন্ধ করার ব্যবস্থা করে কথা বলার মতো শক্তিশালী কাউকে না পাওয়ার আক্ষেপ করা হয় তখন প্রতীয়মান হয় যাবতীয় সংস্কার ও হিংসা, লালসা, তথ্য ব্যাংক ও মৃত ধারণাগুচ্ছ, মৃত নদী ও ধোঁয়াটে আকাশের  বোঝাসহ সবাই বহাল তবিয়তে এগিয়ে চলছে। এই সম্মোহিত সময় পেরিয়ে  নতুন এক পৃথিবীর পথে ওঠার প্রস্তুতি এবং এসব  বোঝা ছাড়াই এগোনোর লক্ষ্যে থাকতে হবে অবিচল।

লেখক সরকারের সাবেক সচিব এনবিআর-এর সাবেক চেয়ারম্যান

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত