অধ্যাপক ডা. দিদারুল আহসান
ত্বক ও যৌনব্যাধি বিশেষজ্ঞ আল রাজী হাসপাতাল, ঢাকা
বর্ষাকাল মানেই একদিকে স্বস্তির বৃষ্টি, অন্যদিকে ভ্যাপসা গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া। এ সময় অতিরিক্ত ঘাম, ভেজা কাপড় দীর্ঘক্ষণ পরে থাকা এবং ত্বকের ভাঁজে আর্দ্রতা জমে থাকার কারণে বিভিন্ন ধরনের ছত্রাকজনিত চর্মরোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে ঘামাচির পরই ত্বকে ছত্রাক সংক্রমণ দেখা দেয়। কারণ ঘাম ও ভেজা পরিবেশ ছত্রাক বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত উপযোগী। তবে যারা ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা মেনে চলেন, নিয়মিত গোসল করেন এবং শরীর শুকনো রাখেন, তাদের মধ্যে এ ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক কম হয়।
ছত্রাকজনিত চর্মরোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় দাদ, ছুলি ও ক্যানডিডিয়াসিস। এ রোগগুলো মূলত ত্বকের ওপরের স্তরকে আক্রান্ত করে এবং চুলকানি, অস্বস্তি ও ত্বকের সৌন্দর্যহানির কারণ হয়।
দাদ : বৃত্তাকার চুলকানিযুক্ত সংক্রমণ
দাদ বা ডার্মাটোফাইটোসিস (টিনিয়া) সাধারণ ছত্রাকজনিত রোগ। সংক্রমিত ব্যক্তি, প্রাণী কিংবা ব্যবহৃত পোশাক, তোয়ালে ও অন্যান্য সামগ্রীর মাধ্যমে ছড়াতে পারে। দাদের প্রধান লক্ষণ হলো ত্বকে গোলাকার বা চাকতির মতো লালচে দাগ সৃষ্টি হওয়া। দাগের কিনারা কিছুটা উঁচু থাকে এবং সেখানে ছোট ছোট গুটি বা ফুসকুড়ি দেখা যায়। আক্রান্ত স্থানে তীব্র চুলকানি হয়। মাথার ত্বক, হাত-পা, কুঁচকি ও নখেও দাদ হতে পারে।
চিকিৎসা
রোগের তীব্রতা ও আক্রান্ত স্থানের ওপর চিকিৎসা নির্ভর করে। সাধারণ ক্ষেত্রে ক্লোট্রিমাজল, টার্বিনাফিন বা কেটোকোনাজল জাতীয় অ্যান্টিফাঙ্গাল ক্রিম ব্যবহার করা হয়। মাথার ত্বক বা নখ আক্রান্ত হলে দীর্ঘমেয়াদে মুখে খাওয়ার অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ যেমন টার্বিনাফিন বা ইট্রাকোনাজল প্রয়োজন হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া স্টেরয়েডযুক্ত মলম ব্যবহার উচিত নয়, কারণ এতে রোগ আরও জটিল হতে পারে।
ছুলি : ত্বকে সাদা বা গাঢ় ছোপ
ছুলি ও সাধারণত ছত্রাকজনিত রোগ। এটি ম্যালাসেজিয়া নামক এক ধরনের ইস্টের অতিবৃদ্ধির কারণে হয়।
সাধারণত বুক, পিঠ, গলা, কাঁধ ও বাহুতে ছোট ছোট সাদা, বাদামি বা গোলাপি ছোপ দেখা যায়। অনেক সময় এসব ছোপ একত্রিত হয়ে বড় দাগ তৈরি করে। গরম ও ঘামের কারণে চুলকানি বা জ¦ালাপোড়া বাড়তে পারে। শ্যামলা ত্বকে সাধারণত হালকা রঙের এবং ফর্সা ত্বকে তুলনামূলক গাঢ় দাগ বেশি চোখে পড়ে। অনেকেই ভুল করে একে শে^তী রোগ মনে করেন।
চিকিৎসা
ছুলির ক্ষেত্রে কেটোকোনাজল, সেলেনিয়াম সালফাইড বা সিক্লোপিরক্সযুক্ত শ্যাম্পু ও লোশন কার্যকর। আক্রান্ত স্থানে নিয়মিত অ্যান্টিফাঙ্গাল ক্রিম ব্যবহারে ভালো ফল পাওয়া যায়। সংক্রমণ ব্যাপক হলে চিকিৎসকের পরামর্শে মুখে খাওয়ার অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ দেওয়া হতে পারে। চিকিৎসার পরও ত্বকের স্বাভাবিক রঙ ফিরে আসতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
ক্যানডিডিয়াসিস : ভাঁজযুক্ত ত্বকের সাধারণ সমস্যা
ক্যানডিডিয়াসিস ক্যান্ডিডা নামক ছত্রাকের কারণে হয়। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, ডায়াবেটিস রোগী, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘদিন স্টেরয়েড ব্যবহারকারীদের মধ্যে এ রোগ বেশি দেখা যায়। শরীরের যেসব স্থানে ঘাম জমে বা ত্বকের ভাঁজ থাকে যেমন কুঁচকি, বগল, স্তনের নিচের অংশ এবং আঙুলের ফাঁকে সেখানে সংক্রমণ বেশি হয়। আক্রান্ত স্থানে লালচে ভাব, চুলকানি, জ¦ালাপোড়া এবং স্যাঁতসেঁতে ক্ষত তৈরি হতে পারে। শিশুদের জিহ্বা ও মুখগহ্বরেও ক্যানডিডা সংক্রমণ দেখা যায়।
চিকিৎসা
ক্যানডিডিয়াসিসের ক্ষেত্রে আক্রান্ত স্থান শুকনো রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ক্লোট্রিমাজল, মাইকোনাজল বা নিস্টাটিনজাতীয় অ্যান্টিফাঙ্গাল ক্রিম ব্যবহার করা হয়। মুখগহ্বর আক্রান্ত হলে নিস্টাটিন সাসপেনশন বা অন্যান্য উপযুক্ত ওষুধ দেওয়া হয়। জটিল বা বারবার হওয়া সংক্রমণের ক্ষেত্রে মুখে খাওয়ার অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে। এ ছাড়া যাদের ডায়াবেটিস আছে, সেটাও নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
প্রতিরোধেই সুরক্ষা
ছত্রাকজনিত চর্মরোগ প্রতিরোধে প্রতিদিন গোসল করা, ঘাম হলে দ্রুত কাপড় পরিবর্তন করা, ভেজা পোশাক দীর্ঘক্ষণ না পরা এবং ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি না করা প্রয়োজন। শরীরের ভাঁজযুক্ত অংশ পরিষ্কার ও শুকনো রাখতে হবে। এ ছাড়া অপ্রয়োজনে স্টেরয়েডযুক্ত ক্রিম ব্যবহার না করাই ভালো।
মনে রাখতে হবে, ছত্রাকজনিত চর্মরোগ সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। তবে রোগের ধরন অনুযায়ী যথাযথ চিকিৎসা ও ধৈর্যের সঙ্গে ওষুধ ব্যবহার করা প্রয়োজন। উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে ভালো।