শঙ্কায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি!

আপডেট : ২১ জুন ২০২৬, ০৩:৪৯ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের চাপে লেবাননে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও, থেমে নেই ইসরায়েলের হামলা। বারবার হামলা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিলেও, তা মানছে না যুদ্ধবাজ দেশটি। এতে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার চুক্তির পাশাপাশি হুমকিতে পড়েছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতার ভবিষ্যৎ। উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাতের অবসানে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকের অন্যতম প্রধান বিষয় লেবাননে ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধ করা। কিন্তু ইসরায়েল হাঁটছে উল্টো পথে; এমনকি ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির পরও লেবাননে হামলার বিষয়ে অটুট দেশটির উগ্রপন্থি নেতারা। গত শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে পূর্বনির্ধারিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনাও স্থগিত করা হয়। নির্দিষ্ট কারণ না জানা গেলেও, ধারণা করা হচ্ছে লেবাননে ইসরায়েলের হামলার কারণেই আলোচনা শেষ মুহূর্তে থমকে গেছে। শুরুতেই এমন ধাক্কায় শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ ঘিরে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে।

আলজাজিরা জানিয়েছে, গত শুক্রবার বিকেল ৪টা থেকে নতুন করে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পরও লেবাননে ইসরায়েলের বিমান হামলায় অন্তত ২২ জন নিহত হয়েছেন। লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এনএনএ জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর শুক্রবার রাত থেকে গতকাল শনিবার সকাল পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ অঞ্চলে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ও ড্রোন একাধিক হামলা চালায়। এতে আবাসিক ভবন ও বাড়িঘর ধ্বংস হয়। একইসঙ্গে ভোরের আগে ইসরায়েলি গোলন্দাজ বাহিনী নাবাতিয়েহ ও আশপাশের এলাকায় গোলাবর্ষণ করে। এসব হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হন। লেবাননে সংঘাত বন্ধ হওয়াটা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ৬০ দিনের আলোচনার পূর্বশর্ত। এই আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং অন্যান্য জটিল বিরোধপূর্ণ বিষয় সমাধানের চেষ্টা করা হবে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি আবার চালু করা এবং বৈশ্বিক তেল সরবরাহ স্থিতিশীল রাখার জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী চুক্তি করাও এর লক্ষ্য।

ইসরায়েল যে তেহরান-ওয়াশিংটনের মধ্যে সমঝোতা নস্যাৎ করতে চাইবে এমন শঙ্কার কথা আগেই বলছিলেন বিশ্লেষকেরা। তারা বলছেন, ইসরায়েলের এমন কর্মকাণ্ড যে শুধু পরিস্থিতিকেই আরও জটিল করে তুলেছে, তা নয়। পশ্চিম এশিয়ার স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার সরকার ক্রমশ বেপরোয়া হয়ে উঠছে। সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাইনা খালেন বলেন, ইসরায়েল যদি হামলা চালিয়ে যায়, ইরানের দৃষ্টিতে তা হবে সমঝোতা স্মারকের লঙ্ঘন। এই সমঝোতার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে বাধ্য করতে পারে কি না, তার ওপর। সবশেষ বিমান হামলা নিয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। তবে শুক্রবার ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর এক মুখপাত্র বলেছিলেন, তাদের বাহিনী ‘তাৎক্ষণিক হুমকি দূর করার কাজ অব্যাহত রাখবে’। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ বলেছে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের আগ্রাসন অব্যাহত থাকলে তারাও পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে যাবে।

এদিকে, আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটন ডিসিতে আবারও ইসরায়েল ও লেবাননের প্রতিনিধিদের মধ্যে নতুন দফার আলোচনা হবে। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের দেওয়া এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। এ সময় তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে লেবাননের দ্বিপক্ষীয় আলোচনা দেশটির পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সহিংসতা অবসানের একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ। দুই নেতা আগামী ২৩ ও ২৫ জুন অনুষ্ঠেয় আলোচনা নিয়েও কথা বলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, বৈঠকগুলোতে দুটি সার্বভৌম সরকার স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করবে। এর আগে গত এপ্রিল মাসে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে প্রথম দফার সরাসরি আলোচনা হয়। ১৯৯৩ সালের পর ওই প্রথম দুই দেশের প্রতিনিধিরা মুখোমুখি বৈঠকে বসেন।

২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর থেকে লেবাননের সরকার যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত একটি রোডম্যাপের অংশ হিসেবে হিজবুল্লাহকে ‘নিরস্ত্র’ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। লেবাননের সরকারও দেশটির দক্ষিণাঞ্চল থেকে ইসরায়েলি বাহিনীকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছে। তবে জুন মাসে হওয়া একটি চুক্তিতে হিজবুল্লাহকে দক্ষিণ লেবাননের লিতানি নদীর উত্তরে সরে যাওয়ার কথা বলা হলেও, সেখানে ইসরায়েলের সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।

অন্যদিকে, যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহু নিজ দেশেই চাপে রয়েছেন। সাম্প্রতিক যুদ্ধের প্রেক্ষিতে নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তায় ভয়াবহ ধস নেমেছে। ইসরায়েলের চ্যানেল ১২’র একটি নতুন জরিপ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, শরৎকালে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনে অধিকাংশ ইসরায়েলি নেতানিয়াহুর পুনঃনির্বাচিত হওয়ার বিপক্ষে। জরিপে দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৫৯ শতাংশ মনে করে যে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর রাজনীতি ছেড়ে দেওয়া উচিত। বিপরীতে ৩৩ শতাংশ তার প্রার্থিতাকে সমর্থন করে এবং ৮ শতাংশ এখনো এ বিষয়ে সিদ্ধান্তহীন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত