হাফ বাবু ফুল বাবু বাঙালি

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২২, ১১:১৮ পিএম

১৪২৯-এর বৈশাখের ৭ তারিখে দেশ রূপান্তর পত্রিকায় কেবল পদ্যের উদ্ধৃতি টেনে বাঙালি বন্দনা করে বাঙালিদের জন্য যথেষ্ট করেছি বলে মনে হয়েছিল, কিন্তু অচিরেই বোধ হলো এতে বঙ্গীয় গদ্যকারদের প্রতি অবিচার করা হয়েছে, বাঙালি সংকীর্তনে তাদের অবদানও কম নয়, তাদের রচনা উপেক্ষা করা সমীচীন হবে না। সুতরাং গদ্য কিস্তির একটি সংকলন করতে হলো। ১২৭০ বঙ্গাব্দে শীল অ্যান্ড ব্রাদার্সের মুদ্রণযন্ত্রে প্যারিমোহন সেন (১৮১৪-১৮৪৮)-এর লেখা ‘রাঁড়, ভাঁড়, মিথ্যা কথা, তিন লয়ে কলিকাতা’ ছাপা হলো। এটি গীতিনাটক। শুরুতেই নিপাট গদ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হিতোপদেশ, যা বাঙালি বাবুদের অবশ্যমান্য : পর স্ত্রী পর ধন, সদা করিবে হরণ। (প্যারিমোহন সেন আশ্বস্ত থাকতে পারেন তার স্বজাতি এই হিতোপদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন।)  মিথ্যা কথা, প্রতারণার আশ্রয় নাও। (প্যারি বাবু, সে কী আর বলতে। ওটা তাদের রক্তের মধ্যেই আছে, হিতোপদেশ দিয়েছেন বেশ, একটুও ভাববেন না,  আপনার জাতি ষোলো আনা বাস্তবায়ন করে চলেছেন।) মিছে কাল কর গত, মদ্যপানে হও রত। (মন্দ বলেননি গুরু, বোতলের দামটা একটু বেশি এই যা।) সুখ পাবে বিধিমতো, বেশ্যাসক্ত হও। (প্যারিমোহন সেন এসব বলে লজ্জা দিচ্ছেন বাবু!) হাস খেল অনিবার, ত্যাজ পুত্র পরিবার। (সে কী আর বলতে!)

বাবু বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও (১৮৩৮-১৮৯৪) বাঙালি বাবুদের ভালোই চিনেছিলেন : ‘যাঁহার যতœ কেবল পরিচ্ছদে, তৎপরতা কেবল উমেদারিতে, ভক্তি কেবল গৃহিণী কিংবা উপগৃহিণীতে এবং রাগ কেবল সদগ্রন্থের উপর, নিঃসন্দেহে তিনিই বাবু।’

বাঙালি বাবুদের সম্পর্কে বুঝেশুনেই তিনি আরও লিখেছেন :

‘যাঁহার বুদ্ধি বাল্যে পুস্তকমধ্যে, যৌবনে বোতলমধ্যে, বার্ধক্যে গৃহিণীর অঞ্চলে, তিনিই বাবু।’ ‘যাঁহার ইস্ট দেবতা ইংরাজ, গুরু ব্রাহ্মধর্ম্মবেত্তা, বেদ দেশী সম্বাদপত্র এবং তীর্থ ন্যাশনাল থিয়েটার, তিনিই বাবু।’

‘যিনি মিশনারির নিকট খ্রীষ্টিয়ান, কেশবচন্দ্রের নিকট ব্রাহ্ম, পিতার নিকট হিন্দু এবং ভিক্ষুকব্রাহ্মণের নিকট নাস্তিক, তিনিই বাবু।’ ‘যিনি নিজ গৃহে জল খান, বন্ধু গৃহে মদ খান, বেশ্যা গৃহে গালি খান এবং মুনিব সাহেবের গৃহে গলাধাক্কা খান, তিনিই বাবু।’ ‘যাঁহার স্নানকালে তৈলে ঘৃণা, আহারকালে আপন অঙ্গুলিকে ঘৃণা এবং কথোপকথনকালে মাতৃভাষাকে ঘৃণা, তিনিই বাবু।’

হুতোম প্যাঁচার নকশায় কালীপ্রসন্ন সিংহের (১৮৪১-১৮৭০) দেওয়া বাবু পরিচিতি : ‘বনেদী বড় মানুষ হতে গেলে বাঙালী সমাজে যে সব ভাষাগুলি আবশ্যক, আমাদের বাবুদের তা সমস্তই সংগ্রহ করা হয়েছে। বাবুদের নিজেদের একটি দল আছে, কতকগুলি ব্রাহ্মণপন্ডিত, কুলীনের ছেলে বংশজ ক্ষত্রিয়, কায়স্থ, বৈদ্য, তেলী, গন্ধবেসে, কাঁসারী ও ঢাকাই কামার নিতান্ত অনুগত বাড়ীতে ক্রিয়াকর্ম্ম ফাঁক যায় না, বাৎসরিক কর্র্ম্মেও দলস্থ ব্রাহ্মণদের বিলক্ষণ প্রাপ্তি আছে। আর ভদ্রাসনে এক বিগ্রহ, শালগ্রামশিলে ও আকবরী মোহর পোরা লক্ষ্মীর খুঁচির নিত্যসেবা হয়ে থাকে।’

উনিশ শতকের শুরু থেকে উদ্ভূত হয় নববাবু শ্রেণি। তাদের নিয়েই ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৭৮৪-১৮৪৮) লিখেন ‘নববাবু বিলাস’ ও ‘নববিবি বিলাস’। নববাবু বিলাসের প্রকাশকাল ১৮২৫। শ্রী শ্যামাচরণ সান্যাল ১২৭০ বঙ্গাব্দে কলিকাতার শীল অ্যান্ড ব্রাদার্স থেকে ‘হদ্দ মজার রবিবার’ প্রকাশ করলেন। বাবুদের পরম প্রত্যাশার দিন রবিবার। মদ্যপান করার পর শ্যামাচরণের একটি চরিত্র মস্তরামের মনে যখন উল্লাস সঞ্চারিত হলো, পরনের বসন মাথায় বেঁধে নাচতে নাচতে বলতে লাগল : ‘হায়রে মজার রবিবার। ছেড়ে বুড়ো মাগি মদ্দ লুটতে হদ্দ মজা তার মদ্যপানে মত্ত হয়ে, বাবুরা বিবি লয়ে, ক্রমে ক্রমে যাচ্ছেন বোয়ে, বিবর্ণ সুবর্ণাকার। পরিবারে দিয়ে ফাঁকি, বাস্তুভিটে বাঁধা রাখি। প্রেমদা প্রেমের পাখি, হচ্ছে যত কুলাঙ্গার।’

‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গ সমাজ’, শিবনাথ শাস্ত্রীর (১৮৪৭-১৯১৯) লেখা বইটি সে সময়ের সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত ও বিশ্বস্ত দলিল। এ বইয়ে বহুবার ‘বাবু’ প্রসঙ্গ এসেছে। এমন একটি অধ্যায় থেকে উদ্ধৃতি : “এই সময়ে সহরের সম্পন্ন মধ্যবিত্ত ভদ্র গৃহস্থদিগের গ্রহে ‘বাবু’ নামে এক শ্রেণীর মানুষ দেখা দিয়াছিল। তাহারা পারসী ও স্বল্প ইংরাজী শিক্ষার প্রভাবে প্রাচীন ধর্ম্মে আস্থাহীন হইয়া ভোগসুখেই দিন কাটাইত। ইহাদের বহিরাকৃতি কি কিঞ্চিৎ বর্ণনা করিব? মুখে, ভ্রুপাশে ও নেত্রকোণে নৈশ অত্যাচারের চিহ্নস্বরূপ কালিমা রেখা, শিরে তরঙ্গায়িত বাউরি চুল, দাঁতে মিশি, পরিধানে ফিনফিনে কালাপেড়ে ধুতি, অঙ্গে উৎকৃষ্ট মসলিন বা কেমরিকের বেনিয়ান, গলদেশে উত্তমরূপে চুনট করা উড়ানী ও পায়ে পুরু বগলস সমন্বিত চিনের বাড়ীর জুতা। এই বাবুরা দিনে ঘুমাইয়া, ঘুড়ি উড়াইয়া, বুলবুলির লড়াই দেখিয়া, সেতার এসরাজ বীণা প্রভৃতি বাজাইয়া, কবি, হাপ আকড়াই, পাঁচালি প্রভৃতি শুনিয়া, রাত্রে বারাঙ্গনাদিগের আলয়ে আলয়ে গীতবাদ্য ও আমোদ করিয়া কাল কাটাইত; এবং গড়দহের মেলা ও মহেশের স্নানযাত্রা প্রভৃতির সময়ে কলিকাতা হইতে বারাঙ্গনাদিগকে লইয়া দলে দলে নৌকাযোগে আমোদ করিয়া যাইত।’’

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্বব্যাখ্যাত ‘বাবু’র আংশিক উদ্ধৃতি না দিলে এ উদ্ধৃতিবহুল নিবন্ধটি প্রতিবন্ধী হয়ে পড়বে : ‘‘জনমেজয় কহিলেন, ‘হে মহর্ষে! আপনি কহিলেন যে কলিযুগে বাবু নামে এক প্রকার মনুষ্যেরা পৃথিবীতে আবির্ভূত হইবেন। তাহারা কি প্রকার মনুষ্য হইবেন এবং পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়া কি কার্য্য করিবেন তাহা শুনিতে বড় কৌতূহল জন্মিতেছে। আপনি অনুগ্রহ করিয়া সবিস্তারে বর্ণন করুন।’’

বৈশম্পায়নের জবাব বেশ দীর্ঘ, বাবুর প্রতিটি বৈশিষ্ট্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবু কাটছাঁট করে কেবল ক’টি বৈশিষ্ট্য সংক্ষেপে তুলে ধরছি :

১. বাবুরা চশমা-অলঙ্কৃত, উদরচরিত্র, বহুভাষী, সন্দেশপ্রিয়।

২. বাবুরা চিত্রাসমাবৃত, বেত্রহস্ত, রঞ্জিত কুন্তল।

৩. বাবুরা বাক্যে অজেয়, পরভাষা পারদর্শী, মাতৃভাষা বিরোধী।

৪. পা শুষ্ককাষ্ঠের ন্যায় হলেও পলায়নে সক্ষম, হাত দুর্বল হলেও কলম ধরতে ও বেতন গ্রহণে পটু।

৫. বিনা উদ্দেশ্যে সঞ্চয় করেন, সঞ্চয়ের জন্য উপার্জন করেন। উপার্জনের জন্য বিদ্যা অধ্যয়ন করেন, বিদ্যা অধ্যয়নের জন্য চুরি করেন।

৬. চুরুট ও তামাকের মাধ্যমে তাদের মুখে অগ্নি লেগেই থাকবে।

৭. সূর্য তাদের দেখতে পায় না, তারা দিনে ঘুমান রাতে জাগেন।

৮. কাব্যের কিছুই বোঝেন না, কিন্তু কাব্যপাঠেও সমালোচনায় প্রবৃত্ত।

৯. বাবু উৎসবে দুর্গাপূজা, স্ত্রীর ইচ্ছেতে লক্ষ্মীপূজা, উপপতœীর ইচ্ছেতে সরস্বতী পূজা এবং পাটার লোভে গঙ্গাপূজা করেন।

১০. যার বাক্য মনের ভেতর এক, বলতে গেলে দশ, লিখতে গেলে শত, কলহে সহস্র, তিনিই বাবু।

এমন আরও কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, স্থানাভাবে উল্লেখ করা গেল না। বাবুরা যে দলদাসও হয়ে থাকেন বঙ্কিমচন্দ্রের আমলে তা প্রকট হয়ে ওঠেনি।

দ্বারকানাথ ঠাকুর তার লিবারেল দৃষ্টিভঙ্গিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে ঢাকঢোল পিটিয়ে গোমাংস ভক্ষণ করতেন, ফিরিঙ্গি ইয়ার-বক্সিদের নিজ বাড়িতে ডেকে এনে তাদের সঙ্গে মদ্যপান করতেন, তিনি বাইজিসঙ্গ ভালোবাসতেন, তার বাগানবাড়িতে রাতের আসরে বাইজিনৃত্য সেকালের এলিটদের অনেকেই উপভোগ করতেন। ধর্ম ছিল অন্দরমহলে, তা পরম নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতেন দ্বারকানাথের স্ত্রী দিগম্বরী দেবী। উত্তরাধিকারসূত্রে বাবুগিরি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত পৌঁছেছিল। রবীন্দ্রনাথ অবশ্য বাবু সংস্কৃতিতে আত্মসমর্পণ করেননি। শুরুতে তার নামের আগে কখনো বাবু, কখনো শ্রী বসিয়েছেন, যাদের সন্দেহ আছে ঊনবিংশ শতকের ভারতী ও বালক পত্রিকার পাতা উল্টে দেখতে পারেন।

দুই বাবু : রামমোহন ও দ্বারকানাথ

‘একদিন এক ধনিক সম্ভ্রান্ত বাঙালিবাবুর বাড়ি ভোজসভায় আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলাম। বাবুর নাম রামমোহন রায়। বেশ বড় চৌহদ্দির মধ্যে তাঁর বাড়ি, ভোজের দিন নানা বর্ণের আলো দিয়ে সাজানো হয়েছিল। চমৎকার আতশবাজির খেলাও হয়েছিল সেদিন। আলোয় আলোকিত হয়েছিল তাঁর বাড়ি। বাড়িতে বড় বড় ঘর ছিল এবং একাধিক ঘরে বাইজি ও নর্তকীদের নাচগান হচ্ছিল। বাইজিদের পরনে ছিল ঘাঘরা, সাদা ও রঙিন মসলিনের ফ্রিল দেওয়া, তার উপর সোনারূপার জরির কাজ করা। শাটিনের ঢিলে পায়জামা পা পর্যন্ত ঢাকা। দেখতে অপূর্ব সুন্দরী, পোশাকে ও আলোয় আরও সুন্দর দেখাচ্ছিল। গায়েতে অলঙ্কার ছিল নানা রকমের। তারা নাচছিল দল বেঁধে বৃত্তাকারে, পায়ের নূপুরের ঝুম ঝুম শব্দের তালে তালে। নাচের সময় মুখের, গ্রীবার ও চোখের ভাব প্রকাশের তির্যক ভঙ্গিমা এত মাদকতাপূর্ণ মনে হচ্ছিল যে তা বর্ণনা করতে পারব না। নর্তকীদের সঙ্গে একদল বাজিয়ে ছিল, সারেঙ্গী মৃদঙ্গ তবলা ইত্যাদি নানারকম বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছিল তারা।

গানের সুর ও ভঙ্গি সম্পূর্ণ অন্যরকম, আমরা শুনিনি কখনও। মধ্যে মধ্যে মনে হয়, সুর কণ্ঠ থেকে নির্গত না হয়ে নাসিকার গহ্বর থেকে তরঙ্গায়িত হয়ে আসছে। কোনও কোনও সুর এত সূক্ষ্ম ও মিহি যে কণ্ঠের কেরামতির কথা ভেবে অবাক হয়ে যেতে হয়। বাইজিদের একজনের নাম নিকি, শুনেছি সারা প্রাচ্যের বাইজিদের মহারানী সে, তার নাচগান শুনতে পাওয়া ভাগ্যের কথা। বাইজিদের নাচ গান শোনার পর রাতের খাওয়া-দাওয়াও শেষ হলো। তারপর এদেশের ভেলকিবাজ জাগলারদের ক্রীড়াকৌশল আরম্ভ হলো।’... (অনুবাদ বিনয় ঘোষ। সুতানুটি সমাচার, কলকাতা শহরের ইতিবৃত্ত, কলকাতা, ১৯৭৫)

১৮৪০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি ‘সমাচার দর্পণ’ লিখছে : ‘গত বুধবারে শ্রীযুক্ত বাবু দ্বারকানাথ ঠাকুর বেলগাছিয়ায় স্বীয়োদ্যান বাটীতে এতদ্দেশস্থ অনেক ইউরোপীয় সাহেবেরদিগকে মহা ভোজন করাইলেন তৎসময়ে তিনি চারি শত ভোক্তা একত্র হইয়াছিলেন এবং শ্রীযুক্ত বাবুর শিষ্টাচারে ও বিশিষ্ট শ্রদ্ধাতে সমাগত সকলেরই সন্তোষ জন্মিল।... এবং গত রবিবারে শ্রীযুক্ত বাবু ঐ উদ্যানে স্বদেশীয় স্বজনগণকে লইয়া মহা ভোজ আমোদ প্রমোদাদি করিলেন এবং তদুপলক্ষে বায়ীর নাচ হইয়াছিল তাহাতে কলিকাতার মধ্যে প্রাপ্য সর্ব্বপেক্ষা যে প্রধান নর্ত্তকী ও প্রধান বাদ্যকর তাহাদের নৃত্যগীত বাদ্যাদির দ্বারা আমোদ জম্মাইলেন এতদ্ভিন্ন উৎকৃষ্ট আতস বাজির রোসনাইও হইয়াছিল।’

যেসব বাবু চার ‘প’ (পাশা, পায়রা, পরদার, পোশাক) পূর্ণ করেন, তারা হাফ বাবু। এর সঙ্গে যারা চার ‘খ’ (খুশি, খানকি, খানা, খয়রাত) পূর্ণ করেন তারা ফুল বাবু। কিন্তু কথাটি কার? নিশ্চয়ই তিনি তাদের হাড়ে হাড়ে চেনেন।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত