ফেনীর জননেতা খাজা আহমদ

আপডেট : ২৮ মে ২০২২, ১১:১৯ পিএম

ফেনীর জননেতা খাজা আহমদের আজ মৃত্যুদিবস। ১৯৭৬ সালের এই দিনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার পিতা আসলাম মিয়া মোক্তার। খাজা আহমদ ১৯২০ সালের ২৬ মার্চ ফেনীর রামপুর সওদাগর বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ফেনী মডেল ও ফেনী হাইস্কুলে শিক্ষালাভ করেন। বাল্যজীবন থেকে সমাজসেবামূলক কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

খাজা আহমদ স্কুল জীবনে স্বদেশি আন্দোলনে যোগদান করেন। ১৯৪০/৪২ সালের দিকে ফেনীর বারাইপুরে বিমানবন্দর এবং সড়ক নির্মাণ কাজে শ্রমিকদের উপযুক্ত বেতন না দেওয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়। খাজা আহমদ নেতৃত্ব দিয়ে সেই আন্দোলনে শ্রমিকদের বেতন আদায় করেন। তখন থেকেই খাজা আহমদ লেখাপড়া বাদ দিয়ে দেশের বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন ও জেলে যান।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে খাজা আহমদ ফেনীতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। সভা, মিছিল ইত্যাদি নিয়ে রাতদিন কাজ করে ফেনীতে সফলভাবে এই দাবির পক্ষে ব্যাপক সাড়া ফেলেন। তখন রাজনৈতিক সভা হতো ফেনীর খদ্দর পট্টিতে। তখন খাজা আহমদ সম্পাদিত সাপ্তাহিক সংগ্রাম পত্রিকা প্রকাশিত হতো। ওই পত্রিকায় বিখ্যাত সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা এবিএম মূসাও কাজ করতেন। এসময় সামরিক আইনের বিরোধিতা করে ‘পাকিস্তানের চৌকিদার আজকের প্রেসিডেন্ট’ শিরোনামে সংগ্রামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সাপ্তাহিক সংগ্রাম বন্ধ করে দেয় পাকিস্তান সরকার। ভাষা আন্দোলনের অনেক সাহসী খবর এতে প্রকাশিত হতো। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতের বিলোনিয়া থেকে খাজা আহমদের সম্পাদিত ‘আমার দেশ’ পত্রিকা প্রকাশিত হতো। বিলোনিয়া থেকে প্রকাশিত এই পত্রিকা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রচার করে মুক্তিপাগল জনতাকে উৎসাহ ও সাহস প্রদান করা হতো।

১৯৫৪ সালে খাজা আহমদ যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এমএলএ নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালে ফেনী মহকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতি থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের এমএনএ নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলদেশের প্রথম জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।

‘ফেনীর রাজা’ খ্যাত বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম খাজা আহমদের নির্লোভ জীবনে ছিল না সম্পদের মোহ। তিনি ছিলেন আপসহীন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে ১৯৬৪ সালের ১ মার্চ আওয়ামী লীগে যোগ দেন। সে-সময় তিনি তার ‘গণতন্ত্রী দল’ বিলুপ্ত করে নিজ সহকর্মীদের ভেড়ান আওয়ামী লীগে। সৈয়দ আহমদ, সুজাত আলী, রমজান আলি, এমন অনেক নেতা সেদিন খাজা আহমদের সঙ্গে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৯৬৪ সালে নোয়াখালীতে দলে যোগ দিয়েই তিনি ফেনী মহকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছিলেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধে একজন শক্তিশালী সংগঠকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন খাজা আহমদ। ফেনীতে প্রথম সম্মুখ সমরে জয়ী হয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। এতেও প্রধান ভূমিকায় ছিলেন খাজা আহমদ। এ প্রসঙ্গে দৈনিক ফেনীতে প্রকাশিত একটি সংবাদ তুলে ধরা হয় : ফেনীর প্রথম সম্মুখযুদ্ধ হয় সিও অফিসে। জয়ী হয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। যুদ্ধে মূলত অংশ নেন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক ও ইপিআর সদস্য। এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিল ছাত্র-জনতা। সমগ্র পরিকল্পনায় ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা খাজা আহমদ । মূলত তার অসীম সাহস আর বুদ্ধিমত্তায় প্রথম যুদ্ধেই আমরা জয়লাভ করি। এ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ইপিআরের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু আহাম্মদ, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ২৩ নম্বর আসামি ফ্লাইট সার্জেন্ট শামছুল হক, অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন আবদুর রউফ, শামছু ব্যাটালিয়ন উল্লেখযোগ্য। তৎকালীন ফেনী থানার একাধিক কর্মকর্তাও যুদ্ধে অংশ নেন এবং অস্ত্রাগার খাজা আহমদকে উন্মুক্ত করে দেন। খাজা আহমদের তৃপ্তি হোটেল থেকে যুদ্ধরতদের জন্য খাবার পরিবেশন করা হয়। খাবার নিয়ে বারাহীপুর এয়ারপোর্ট সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় পাকিস্তানিরা সিও অফিস ভবন থেকে গাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে। ক্যাম্পে না থাকলেও সিও অফিসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নেয়।

২৬ মার্চ চট্টগ্রামের পথে পাকিস্তানি আর্মিদের পথ রুদ্ধ করতে সিদ্ধান্ত দেন খাজা আহমদ। এটিই ছিল মুক্তিযুদ্ধে ফেনীতে প্রথম প্রতিরোধ। ২৬ মার্চ যুদ্ধ শুরুর আগেই ফেনী-ভারত সীমান্ত থেকে কিছু সীমান্তরক্ষী সদস্যকে তুলে এনে সিও অফিসে স্থানান্তর করা হয়। তথ্য ছিল পাকিস্তানি আর্মির একটি দল কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে চট্টগ্রাম যাবে। সন্ধ্যা থেকে ছাত্র-জনতা পুরাতন ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কে ছাগলনাইয়ার চাঁনপুর কাঠের সেতুর পাটাতন খুলে ফেলে। তৎকালীন ফেনী মহকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও এ অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের শক্তিশালী সংগঠক খাজা আহমদের নির্দেশে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

খাজা আহমদের নির্দেশে আরও আগ থেকেই অবরোধ চলছিল। সেদিন রাস্তায় গাছ ফেলে আর্মিদের চলাচলে অবরোধ তৈরির চেষ্টা করা হয়। চাঁনপুর সেতুর পাটাতন খুলে নিলেও পাকিস্তানি আর্মিরা বিশেষ নেট ব্যবহার করে পোল পার হয়ে চট্টগ্রাম উদ্দেশ্যে রওনা হয়। পাকিস্তানি আর্মি সেদিন চলার পথে চৌদ্দগ্রাম থেকে বিভিন্ন লোকালয়ে আগুন দেয় এবং নির্বিচার গুলিবর্ষণ করে। এতে ফেনী অঞ্চলেও হতাহতের ঘটনা ঘটে। বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম এবিএম তালেব আলী নিজের একটি লেখায় ফেনীতে প্রথম যুদ্ধ প্রসঙ্গে কিছু স্মৃতিকথা উল্লেখ করেন। পাকিস্তানি আর্মিদের ঘেরাও আক্রমণ প্রসঙ্গে তিনি মরহুম খাজা আহমদের অসীম সাহসিকতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, খাজা আহমদ বলেন, জনতাকে সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের আক্রমণ করতে হবে। নিজেদের সামর্থ্যরে কথা মনে করিয়ে দিলে খাজা আহমদ বলেন, কথায় যুক্তি আছে। আমাদের বাঁচার কোনো উপকরণ নেই। হারি বা জিতি আক্রমণ চালাতেই হবে।

রাজনীতির পাশাপাশি একজন বিদ্যানুরাগী হিসেবে মরহুম খাজা সাহেব দীলপুর খাজা আহমদ উচ্চ বিদ্যালয় ও রামপুর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। খাজা আহমদ ১৯৭২ সালে ফেনী প্রেস ক্লাবের সভাপতি নির্বাচিত হন। এ সময় তিনি প্রেস ক্লাবকে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেন।

লেখক : মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক, ফেনী জেলা আওয়ামী লীগ। সভাপতি, খাজা আহমদ পরিষদ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত