ভৌত অবকাঠামো ও সংস্কৃতিতে বিনিয়োগ

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২২, ১১:৩৭ পিএম

পদ্মা সেতুর জন্য আমাদের ভালোবাসা হৃদয়ের গভীরে। হিন্দু পুরাণে পদ্মার সংস্কৃত অর্থ ‘পদ্ম’ ফুল, যা লক্ষ্মীদেবীর আরেক উপনাম। অন্যদিকে পদ্মার অস্থির বিচরণ ও সর্বনাশা ভাঙনের কারণে তার পুরনো নাম কীর্তিনাশা। আমাদের বিশ্বাস এ প্রমত্তা নদীকে পোষ মানিয়ে যে সেতু নির্মাণ করা হয়েছে, তা কীর্তিনাশার দুর্ভাগ্যকে বিসর্জন দিয়ে বয়ে আনবে লক্ষ্মীর আবাহন; খুলে দেবে দেশের অমিত সম্ভাবনার দ্বার।

পদ্মা সেতুর পশ্চাৎভূমিতে অন্যদের মধ্যে পর্যটনশিল্প বিকাশের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। পর্যটনের সুবিধা হলো এটা একটা শ্রম-ঘন শিল্প; আয়ের সুষম বণ্টনে এ শিল্পের জুড়ি পাওয়া ভার। দেশের ক্রমবর্ধমান আয়-বৈষম্যের লাগাম টেনে ধরতে এই শিল্প হতে পারে একটি অন্যতম দাওয়াই। কিন্তু এখনো দেশের মানুষের নানা সামাজিক অভ্যাস এবং বেপরোয়া মানসিকতা ও সংস্কৃতি এ শিল্প বিকাশের অন্যতম অন্তরায়। এ দেশের মানুষ যেমন অতিথি সেবায় আনন্দ পায়, তেমনি আবার তারা উচ্ছৃঙ্খলতা এবং ঠকবাজির আশ্রয় নিয়েও পায় পরমানন্দ। শুধু পর্যটক কেন, কোনো মানুষই যে উচ্ছৃঙ্খলতা ও ঠকবাজি পছন্দ করে না, তার প্রমাণ তো আমাদের জ্ঞানগর্ভ প্রবচন ‘নেড়ে একবারই বেলতলায় যায়।’ কেউ কোনো দেশ বা অঞ্চলের মানুষের ভালো ও বিনয়ী আচরণের কথা যদি একজনের কাছে বলে, তো প্রতারিত ও নির্যাতিত হওয়ার কথা বলে দশজনের কাছে। ফলে বেলতলা বিরান ভূমিতে পরিণত হয়। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানুষের মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির অনুকূল পরিবর্তন না আনতে পারলে শুধু ইট ও কংক্রিট দিয়ে অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটিয়ে তা ফলপ্রসূ ও টেকসই করা যাবে না। অথচ এ অবস্থার যে অনুকূল পরিবর্তন আনা সম্ভব তার প্রমাণ দেশেই রয়েছে; চাঁপাইনবাবগঞ্জে গাছ থেকে আম হাতের নাগালে দোল খায়, অথচ কেউ সেটা ছিঁড়ে পকেটে ভরে না। উন্নয়নকে ত্বরান্বিত ও টেকসই করতে শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের মূল্যবোধ, মনস্তত্ত্ব, দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে কর্মসূচি প্রবর্তন করা জরুরি।

দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ভৌত অবকাঠামোর যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে; মেগা প্রকল্পগুলো শেষ হলে এ উন্নতির কলেবর আরও বেড়ে যাবে। কিন্তু ব্যবস্থাপনার অবয়ব ও দক্ষতা বাড়েনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে কমে গেছে। সরকারি মালিকানাধীন কলকারখানা ও সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক লোকসান, অপচয় ও অব্যবস্থাপনা এত দিন তার একটা ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল। কিন্তু উদ্বোধনের পর পদ্মা সেতুতে যে অব্যবস্থাপনার নমুনা দেখা গেল, তা যেন সেতুর সুশোভিত ললাটে কলঙ্ক-তিলক। স্বপ্নের এই সেতু উদ্বোধনের আগেই উচ্চপর্যায় থেকে সতর্ক করে বলা হচ্ছিল যে, নাশকতার আশঙ্কা এখানে অত্যন্ত প্রবল। এ আশঙ্কার সংগত কারণও ছিল; অনেকেই এই স্বপ্নের মসৃণ রূপায়ণ পছন্দ করেনি, তাদের দ্বারা অনিষ্টের আশঙ্কা তো ছিলই। এই পটভূমিতে প্রথম দিন যে অব্যবস্থাপনা দেখা গেল এবং এর ফলে যেসব অঘটন ঘটল, তার বিবরণ সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশের মানুষ দেখেছে। শেষ পর্যন্ত এই বেসামরিক কাজে শৃঙ্খলা ফেরাতে সামরিক বাহিনীর লোকজনকে নিয়োজিত করতে হয়েছে। কিন্তু এটা তো সেনাবাহিনীর কোনো কাজ নয়, এটা তো বেমক্কা কোনো কাজও নয়; এটা পূর্বনির্ধারিত ও পূর্বক্ষণে সতর্ক করা একটা কাজ। এ কাজে গাফিলতি বেসামরিক ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার পরিচায়ক।

দেশে যেসব মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে বঙ্গবন্ধু কৃত্রিম উপগ্রহ-১ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। পদ্মা সেতু প্রকল্প সম্প্রতি সমাপ্ত হলো। বঙ্গবন্ধু সুড়ঙ্গ বা কর্ণফুলী সুড়ঙ্গ ও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প সমাপ্তির পথে। আরও অনেক মেগা প্রকল্প হয়তো কয়েক বছরের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। এরপর এসব উচ্চ প্রযুক্তির সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলো একসময় নিজেদের ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করতে হবে। এর জন্য প্রযুক্তিগত ও কারিগরি দক্ষতা যেমন জরুরি, তেমনি অপরিহার্য ব্যবস্থাপনার চমৎকারিত্ব। কিন্তু এদিকে দেশের সক্ষমতার মাত্রা কি ভৌতিক উন্নতির সমানুপাতিক বা সে সামর্থ্য অর্জনের জন্য গৃহীত পদক্ষেপ কি পর্যাপ্ত? এখন পরিস্থিতি কেমন জানি না, তবে আমার কর্মজীবনে এসবের বড় ঘাটতি লক্ষ করেছি।

খাদ্য বিভাগের পাঁচ-ছয়টি কংক্রিটের গুদাম অর্থাৎ সাইলো রয়েছে। এসব সাইলোতে স্বয়ংক্রিয় ওজন ব্যবস্থাপনার জন্য সফটওয়্যার রয়েছে। পরে আশির দশকে এগুলো সংস্কারও করা হয়। শুরু থেকেই এসব সফটওয়্যারে কোনো গোলমাল দেখা দিলে উড়োজাহাজে করে সরবরাহকারী কোম্পানির এক্সপার্ট নিয়ে এসে পর্যাপ্ত অর্থব্যয়ে ট্রাবল শ্যুটিং করতে হতো; এ কাজে সংস্থার নিজস্ব লোকবলের সক্ষমতা গড়ার কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। আবার খাদ্যশস্যে অনুপুষ্টির ঘাটতি মেটাতে দেশে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির সহযোগিতায় আটা ও চালে প্রয়োজনীয় গুণাগুণের প্রিমিক্স মিশিয়ে প্রায় এক দশক ধরে খাদ্যশস্যের পুষ্টিসমৃদ্ধকরণ চলছে। কিন্তু এসব স্পর্শকাতর প্রিমিক্সে গুণাগুণের মাত্রা পরীক্ষার জন্য নমুনা পাঠাতে হয় সিঙ্গাপুর বা ভারতে; কারণ দেশে দু-একটা গবেষণাগারে এটা পরিমাপের জন্য যন্ত্রপাতি আমদানি করা হলেও দক্ষ লোকবল নেই। এভাবে কাজ করা মানে ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়া, অর্থাৎ ঘুরে-ফিরে একই কথাব্যবস্থাপনার সংকট।

গত ১ জুলাই ২০২২ তারিখ থেকে পদ্মা পাড়ি দিতে অগ্রপশ্চাৎ অন্যসব সেতুর টোল তুলে নিয়ে শুধু পদ্মা সেতু ও তার দুই পাড়ের এক্সপ্রেস সড়কের টোল আদায়ের এন্তেজাম করা হয়েছে। কাকতালীয়ভাবে আমরা কয়েকজন প্রত্যুষ ভ্রমণকারী দিনে ও রাতে পদ্মা সেতুর রূপ দেখতে ওইদিনই মাইক্রোবাসে টুঙ্গিপাড়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। সকাল সাড়ে সাতটায় ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে বেলা সাড়ে এগারোটায় গোপালগঞ্জ পৌঁছি, আবার ফিরতি পথে রাত নয়টায় গোপালগঞ্জ থেকে যাত্রা শুরু করে রাত দেড়টায় ঢাকায় ফিরি। ভাগ্যিস সেতুতে মোটরসাইকেল চলাচল আগেই বন্ধ করা ছিল; রাস্তায় দুই চাকার ওই যান থাকলে ভোরের আগে ঢাকায় ফেরা ছিল কল্পনাতীত। যা হোক, পথের মধ্যে তিনটি টোলপ্লাজায় প্রায় দুই ঘণ্টা সময় অপচয় না হলে আমাদের ধারণা এই ভ্রমণে একপথে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা সময় লাগত এবং সেটা হতো আমাদের জন্য পদ্মা সেতু থেকে আনন্দপ্রাপ্তির প্রথম ঘটনা। কিন্তু আমাদের হয়েছে হরষে বিষাদ। টোল সৃষ্ট গোল (আসলে গণ্ডগোল) ছিল এই ভোগান্তির মূল; এটা ছিল ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনার এক জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত।

পদ্মা সেতুর জটিল অবকাঠামোর সঙ্গে মিল রেখে এর টোল আদায় পদ্ধতিটাও কেন যে অকারণে অস্বচ্ছ ও জটিল করে রাখা হলো, তা বোধগম্য নয়। ডিজিটাল বাংলাদেশে আধুনিক এই স্থাপনায় স্বয়ংক্রিয় টোল আদায় প্রযুক্তি অনুপস্থিত। সেটা থাকলে মানুষ ও যানবাহন যেমন বিনা বাধায় সেতু ও এক্সপ্রেস সড়কের সুবিধা ভোগ করতে পারত, তেমনি টোলের আদায় করা অর্থ সরকারি কোষাগারে জমাদান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যেত। এর জন্য শুধু প্রয়োজন হতো আগে থেকে মানুষকে উদ্বুদ্ধকরণ ও প্রযুক্তির লভ্যতা নিশ্চিতকরণ। কিন্তু দেশে ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এই দূরদৃষ্টির বড়ই আকাল। এক্সপ্রেস সড়কের একদিকের টোল ৯০ টাকা, অন্যদিকের জন্য তা ১৩০ টাকা। এটা উভয় প্রান্তে ১০০ টাকা করে করলে বাকি ২০ টাকার জন্য কি মহাভারত অশুদ্ধ হতো? তাতে খুচরা পাওনা ফেরত দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত সময় ব্যয় হতো না। অথবা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা প্রবর্তনের আগ পর্যন্ত একটি পয়েন্টে তিনটা টোল আদায় করার ব্যবস্থা নেওয়া যেত এবং তারপর যার যার হিস্যা বণ্টন করলে হিসাব চুকে যেত। তাতে একটি পয়েন্টে তিনটি প্রতিষ্ঠানের জোরালো তত্ত্বাবধানের সুবিধাও হতো। টোল পয়েন্টগুলোতে আরেকটি অব্যবস্থাপনা চোখে পড়ার মতো ছিল। সেটা হলো যানবাহনগুলোর লেন পরিবর্তনের মহোৎসব। কার, মাইক্রোবাস, বাস, ট্রাকগুলো যেভাবে টোলপ্লাজায় ঢুকে ইচ্ছামতো লেন পরিবর্তন করার সুযোগ পাচ্ছে, তাতে মনে হয় বিশৃঙ্খলাকেই যেন পৃষ্ঠপোষকতা করা হচ্ছে। অথচ উন্নয়নের উঁচুস্তরে যেতে শৃঙ্খলার প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি।

আসলে ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন সহজে দৃশ্যমান এবং অপেক্ষাকৃত স্বল্প সময়ে অর্জনযোগ্য। সেজন্য এই দৃশ্যমান উন্নতির দিকে অধিকাংশ মানুষের বিশেষ পক্ষপাতিত্ব দেখা যায়। কিন্তু দেশ যাতে উন্নত অবকাঠামোর সুবিধা কাজে লাগাতে পারে, তার জন্য প্রয়োজন মানুষের শিক্ষা-দীক্ষা, দক্ষতা-যোগ্যতা, ধ্যান-ধারণা, আচার-আচরণ, কৃষ্টি-দৃষ্টিভঙ্গি, শৃঙ্খলা-কর্মনিষ্ঠা ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, অর্থাৎ সামষ্টিক, মানবিক ও সামাজিক উন্নয়নে সমমাত্রিক বিনিয়োগ। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে বিনিয়োগের ফলাফল সাদা চোখে বড় একটা দৃশ্যমান হয়ে দেখা দেয় না। ফলে এসব ক্ষেত্রে বিনিয়োগে খরা চলেই আসছে। পরিণতিতে অবকাঠামো উন্নয়নের পূর্ণ সুফল মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। এখন বিনিয়োগের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার সময় এসে গেছে। আশা করি সরকার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং ব্যবস্থাপনাগত উন্নয়নে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নিশ্চিত করবেন।

লেখক: খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত