পর্দা নেমেছে শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭ এর ৫২তম বার্ষিক সম্মেলনের। ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বেঁ শহরে গত ১৫ জুন শুরু হওয়া সম্মেলনে উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি, ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি বিশ্বে অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের সরবরাহ নিশ্চিতকরণের মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। গতকাল বুধবার সমাপনী দিনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং সামাজিক মাধ্যমের কারণে তৈরি হওয়া নানামুখী নিরাপত্তা ঝুঁকি। প্রযুক্তি খাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা বৃদ্ধির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে জোটভুক্ত দেশগুলো। এবারের সম্মেলন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্ররা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান নতুনভাবে নির্ধারণ করার চেষ্টা করছে।
বছরের পর বছর শুল্কের হুমকি, কূটনৈতিক টানাপড়েন এবং প্রকাশ্য বাদানুবাদের পর অনেক বিশ্বনেতাই এখন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, ট্রাম্প আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় কোনো সাময়িক প্রতিবন্ধকতা নন, বরং এটিই এখন যুক্তরাষ্ট্রের নীতির স্থায়ী চরিত্র। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্মেলনে যোগ দিতে ফ্রান্সে পৌঁছানোর আগে থেকেই মিত্রদেশগুলোর নেতাদের মধ্যে তাকে ‘না’ বলার প্রবল এক মানসিকতা তৈরি হয়েছে। বিশ্বনেতারা শুধু ট্রাম্পকে তোষামোদ করার নীতি বাদ দিয়ে এমন এক ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য অংশীদার থাকবে না এবং ইউরোপও ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত চোখ বন্ধ করে মেনে নেবে না। গতে সোমবার থেকে শুরু হওয়া জি-সেভেন সম্মেলনে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে অর্থনৈতিক অভিঘাতের স্পষ্ট ছায়া রয়েছে। যদিও ট্রাম্প গত রবিবার যুদ্ধ অবসানে চুক্তি সইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন, তবুও এই যুদ্ধ এরই মধ্যে বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে ওলটপালট করে দিয়েছে এবং নতুন করে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে।
সম্মেলনে বিশ্বনেতারা লেবাননে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে বিশ্ববাজারে তেল-গ্যাস সরবরাহের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমানোর অঙ্গীকার করেছেন। এ লক্ষ্যে জ্বালানি সরবরাহের বহুমুখী বিকল্প রুট দ্রুত চালুর বিষয়ে নেতারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছেন। আগামী শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর হতে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিটি মূলত একটি স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে পরবর্তী ৬০ দিন আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করবে। এই যুদ্ধে ইরান ও লেবাননে অন্তত ৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। বুধবার এক বিবৃতিতে জি-সেভেন নেতারা বলেন, ওই আঞ্চল এবং এর বাইরে ইরানের হুমকি মোকাবিলা এবং তেহরান যাতে কখনই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে আরও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। সম্মেলনটি ট্রাম্পের জন্য যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও জাপানের মতো প্রধান মিত্রদের কাছে তার ‘ইরান চুক্তি’ উপস্থাপনের একটি বড় সুযোগ ছিল। কেন না, মিত্রদেশগুলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে একমত হলেও ট্রাম্পের যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেনি।
এদিকে, রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে ইউক্রেনকে আরও বেশি অস্ত্র সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (এয়ার ডিফেন্স) এবং দূরপাল্লার সামরিক সক্ষমতা। একই সঙ্গে রাশিয়ার জ্বালানি খাতের ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য এখন উপযুক্ত সময় এসেছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন সাত শিল্পোন্নত দেশ। গত মঙ্গলবার রাতে জি-৭ এর নেতারা একটি যৌথ বিবৃতিতে ইউক্রেনের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রচেষ্টার প্রতি অটল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। বিবৃতিতে বলা হয় যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেন যে নতুন গতি অর্জন করেছে, তার প্রশংসা করা হচ্ছে এবং গতি ধরে রাখতে আরও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, অতিরিক্ত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক (ইন্টারসেপ্টর) এবং দূরপাল্লার সামরিক সক্ষমতা সরবরাহ করা হবে।
২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় সমর্থন দিয়েছে ইউরোপ। সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, ইউরোপীয় দেশগুলো ইউক্রেনকে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ইউরো সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। এ ছাড়া আরও ৯০ বিলিয়ন ইউরোর ঋণ সহায়তা এ মাস থেকেই প্রদান শুরু হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মোট সহায়তার পরিমাণ প্রায় ১১৫ বিলিয়ন ইউরো। জি-৭ নেতারা আরও বলেন ইউক্রেনের জন্য সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের লাইসেন্স সম্প্রসারণের বিষয়টি বিবেচনা করতে তারা প্রস্তুত। বিশেষ করে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জরুরি প্রয়োজন বলে জানিয়েছে কিয়েভ। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে ‘আমরা রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়াতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’