ভারত ভাগের পৌনে এক শতাব্দী বিভক্ত ভারত

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১:০০ পিএম

পাকিস্তান ডমিনিয়ন উদ্বোধন করতে ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ লর্ড মাউন্টব্যাটেন করাচি গেলেন। তিনি পরদিন ফিরে এলেন এবং ১৫ আগস্ট মধ্যরাতেরাত বারোটায় ভারত ডমিনিয়নের জন্ম হলো।

দেশ মুক্ত হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতা ও বিজয়ের আনন্দ অনুধাবন করার আগেই জনগণ জেগে উঠে দেখল স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশাল এক ট্র্যাজেডি। আমরাও বুঝতে পারলাম স্বাধীনতার ফল উপভোগ করে একটু আয়েশ করতে হলে আমাদের একটি দীর্ঘ ও কঠিন সফরের মুখোমুখি হতে হবে।

কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয়েই ভারত ভাগ কবুল করে নিয়েছে। যেহেতু কংগ্রেস সমগ্র ভারতের প্রতিনিধিত্ব করে এবং মুসলিম লীগের প্রতি মুসলমানদের বৃহৎ অংশের সমর্থন রয়েছে, স্বাভাবিকভাবে এ বিভাবজন মানে সমস্ত দেশ তা মেনে নিয়েছে।

বাস্তব অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমরা যখন বিভাজনের আগের ও পরের দেশের দিকে তাকাইদেখতে পাই এ সম্মতির ব্যাপারটি ঘটেছে শুধু কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির কার্যবিবরণীর সিদ্ধান্তে এবং মুসলিম লীগের রেজিস্টারে। কিন্তু ভারতের জনগণ দেশ ভাগ মেনে নেয়নি। প্রকৃতপক্ষে তাদের হৃদয় ও আত্মা খন্ীকরণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। হিন্দু ও শিখেরা এক হয়ে দেশ ভাগের বিরোধিতা করেছে। এই পরিকল্পনা কংগ্রেসের মেনে নেওয়ার পরও কংগ্রেস-বিরোধীরা ক্রোধ কমিয়ে আনেনি। কিন্তু যখন ভারত ভাগ বাস্তবতায় পরিণত হলো, এমনকি মুসলিম লীগের অনুসারী মুসলমানরাও ভারত ভাগের ফলাফল দেখে আতঙ্কিত হয়ে উঠল এবং প্রকাশ্যে বলতে শুরু করল ভাগ বলতে তারা এমনটা বোঝাননি।

দশ বছর পর তখনকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করি, ঘটনাপ্রবাহ দেখে নিশ্চিত হই আমি যা বলেছিলাম তারই দৃঢ়ীকরণ হলো। আরও স্পষ্ট হলো কংগ্রেস নেতারা মুক্ত ও খোলামনে ভারত ভাগকে গ্রহণ করেননি। কেউ তীব্র ঘৃণা ও বিদ্বেষ থেকে গ্রহণ করেছেন, কেউ করেছেন হতাশা থেকে। মানুষ যখন আতঙ্কিত ও রুষ্ট থাকে তখন তর পক্ষে বস্তুনিষ্ঠ বিচার করা সম্ভব হয় না। যারা আবেগাক্রান্ত হয়ে দেশ ভাগের ওকালতি করেছেন, তারা এর পরিণতি কেমন করে বুঝবেন? কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে ভারত ভাগের সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিলেন সর্দার প্যাটেল। কিন্তু তিনিও বিশ্বাস করতেন না যে ভারতীয় সমস্যা সমাধানের সর্বোত্তম সমাধান হচ্ছে দেশ ভাগ। বিরক্তি এবং জখমপ্রাপ্ত ইজ্জতের দোহাই তাকে ভারত ভাগের সমর্থক বানিয়েছিল। তার সব পদক্ষেপে সব প্রস্তাবে অর্থমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের ভেটো তাকে হতাশ করে তোলে। ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন যে ভারত ভাগ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। সেটাই হোক।

তিনি এটাও বিশ্বাস করতেন পাকিস্তান টিকে থাকার মতো কোনো রাষ্ট্র হতে পারে না, সুতরাং ভেঙে যাবে। তিনি ধরে নিয়েছিলেন মুসলিম লীগের পাকিস্তান মেনে নেওয়া তাদের তিক্ত শিক্ষা দিয়ে ছাড়বে। অচিরে পাকিস্তান ধসে পড়বে এবং যেসব প্রদেশ ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পাকিস্তানে যোগ দিয়েছিল, সেগুলো অবর্ণনীয় সংকট ও আর্থিক কষ্টে পড়বে। সর্দার প্যাটেল সম্ভবত ভেবেছিলেন তারা আবার ভারতের কাছে ফিরে আসতে বাধ্য হবে। আমাকে এটাও স্বীকার করতে হবে তিনি মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে এতটাই বিদ্বেষী হয়ে উঠেছিলেন যে তাদের নেতৃত্ব মেনে নেওয়া মুসলমানদের যদি ভোগান্তি হতো তাহলে হয়তো তিনি খুশিই হতেন।

১৪ আগস্ট যখন স্বাধীন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলো ভারত ভাগের প্রতি জনগণের কী ধারণা তা পরীক্ষা করার আসল সুযোগ এলো। যদি ভারতের জনগণ স্বেচ্ছায় দেশ ভাগ মেনে নিত তাহলে পাঞ্জাব, সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধু ও বাংলার হিন্দু ও শিখরাও একই অঞ্চলের মুসলমানদের মতো আনন্দ-উৎসব করত। এসব প্রদেশ থেকে যে খবর এসেছে তা-ই প্রমাণ করে কংগ্রেসের ভারত ভাগ মেনে নেওয়ার দাবি কতটা ফাঁপা, তাদের মেনে নেওয়ার মানে ভারতের জনগণের মেনে নেওয়া ছিল না।

১৪ আগস্ট ছিল পাকিস্তানের মুসলমানদের জন্য আনন্দ-ফুর্তির দিন, কিন্তু হিন্দু ও শিখদের জন্য তা ছিল শোকের দিন। এই অনুভূতি শুধু জনগণের নয়, কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদেরও। আচার্য কৃপালনি তখন কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি সিন্ধু প্রদেশের মানুষ।

১৪ আগস্ট ১৯৪৭ তিনি একটি বিবৃতি জারি করেন, তাতে উল্লেখ করেন, এ দিনটি বেদনার দিন, ভারতের ধ্বংসের দিন। গোটা পাকিস্তানে হিন্দু ও শিখরা তাদের এই অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। এটা ছিল অদ্ভুত এক পরিস্থিতি। আমাদের জাতীয় সংস্থা কংগ্রেস ভারত ভাগের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিন্তু ভারতবর্ষ এই খ-ীকরণ নিয়ে শোকগ্রস্ত। স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন এসে যায়যদি ভারত ভাগ এমন ক্রোধ ও দুঃখের অনুভূতি সৃষ্টি করে থাকে তাহলে ভারতের জনগণ তা মেনে নিল কেন? কেন ব্যাপকভাবে এর বিরুদ্ধাচরণ করল না? যখন সবাই জানছে সিদ্ধান্তটি ভুল হচ্ছে তখন এত তাড়াহুড়ো করে মেনে নেওয়ার কী দরকার ছিল? ১৫ আগস্টের মধ্যে ভারত-সমস্যার সঠিক সমাধান নাই মিলত, সে ক্ষেত্রে ভুল সমাধানটিকে গ্রহণ করে এ নিয়ে মাতম করার কী দরকার ছিল? আমি বারবার বলেছি সঠিক সমাধান না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উত্তম। আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমার বন্ধু ও সহকর্মীরা আমাকে সমর্থন করেননি। সত্যের প্রতি তাদের এই অদ্ভুত অন্ধত্বের একটি কারণই আমি খুঁজে পাইক্রোধ ও হতাশা তাদের দৃষ্টিকে মেঘাবৃত করে রেখেছিল। সম্ভবত ১৫ আগস্টকে ভারতের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে নির্ধারণ করতে লর্ড মাউন্টব্যাটেনের যেকোনো কথা তাদের জাদুমুগ্ধ ও সম্মোহিত করে রেখেছিল।

এই পরিস্থিতি ছিল ট্র্যাজেডি ও কমেডির অবর্ণনীয় মিশ্রণ। ভারত ভাগের পর মুসলিম লীগের যেসব নেতা ভারতে রয়ে গেলেন তাদের জন্য সবচেয়ে হাস্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। জিন্নাহ করাচির উদ্দেশে ভারত ছেড়ে চলে গেলেন আর তার অনুসারীদের জন্য রেখে গেলেন একটি বার্তা : যেহেতু দেশ ভাগ হয়েছে, তাদের হতে ভারতের অনুগত নাগরিক।

জিন্নাহর এই বিদায়ী বার্তা তাদের মধ্যে অদ্ভুত এক শক্তিহীনতা ও মোহভঙ্গের অনুভূতি সৃষ্টি করল। ১৪ আগস্টের পর তাদের অনেক নেতা আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলেন। তাদের মর্মবেদনা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। গভীর বেদনা ও ক্ষোভের সঙ্গে তাদের প্রত্যেকেই জানালেন যে জিন্নাহ তাদের সবার সঙ্গে প্রতারণা করেছেন এবং তাদের বিপদাপন্ন অবস্থায় পরিত্যাগ করেছেন। জিন্নাহ তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন এ কথার মানে প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি। তিনি তো প্রকাশ্যেই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলো নিয়ে আলাদা হতে চেয়েছেন। এখন ভারত ভাগ তো পশ্চিম এবং পূর্ব উভয় অংশেরই বাস্তবতা। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের এলাকা নিয়েই পাকিস্তান গঠিত হয়েছে, তাহলে মুসলিম লীগের এসব মুখপাত্র কেন প্রতারিত হওয়ার কথা বলছেন?

তাদের সঙ্গে কথা বলে আমার বোধোদয় হয়েছে তারা যে দেশ ভাগের কল্পনা করেছিলেন তার সঙ্গে বাস্তবের দেশ ভাঙার কোনো সংগতি নেই। পাকিস্তান সৃষ্টির পরিণতি তাদের জন্য কী হবে তারা তা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। যদি মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল পৃথক হয়ে পাকিস্তান গঠিত হয় তাহলে এটা তো স্পষ্ট যেসব প্রদেশে মুসলমান সংখ্যালঘু সেগুলো মিলে ভারত সৃষ্টি হবে। উত্তর প্রদেশে এবং বিহারে মুসলমানরা সংখ্যালঘু ছিল এবং দেশ ভাগের পর সংখ্যালঘুই থেকে যাবে। বিষয়টি অদ্ভুত মনে হলেও সত্যটি হচ্ছে মুসলিম লীগাররা মুসলমানদের বুঝিয়েছেন তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশের হোন বা সংখ্যালঘু প্রদেশের, তাতে কিছু এসে যায় না, তারা ভিন্ন জাতি হিসেবে বিবেচিত হবেন এবং তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষমতা তাদের থাকবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যখন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল ভারত থেকে বেরিয়ে গেল এবং এমনকি পাঞ্জাব ও বাংলাও ভাগ হলো এবং জিন্নাহ করাচি চলে গেলেন এই আহম্মকরা বুঝতে পারলেন তাদের কিছুই জুটেনি ভারত ভাগের কারণে তারা সবই হারিয়েছেন। জিন্নাহর বিদায়ী বার্তাই হচ্ছে সেই বোঝা, যা তাদের কোমর ভেঙে দিয়েছে। তাদের কাছে এটা ততক্ষণে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ভারত ভাগের কারণে সংখ্যালঘু হিসেবে তাদের অবস্থা আগের চেয়েও অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। অধিকন্তু তারা তাদের বোকামি কর্মকা-ের মাধ্যমে হিন্দুদের মনে আরও ক্রোধ ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করিয়েছে।

ভারতীয় অংশে মুসলিম লীগের সদস্যরা বারবার বলতে শুরু করলেন এখন তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের দয়ার ওপর নির্ভর করছেন। এটা তো স্পষ্টই যে তাদের দুঃখ ও যাতনা, এতসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের জন্য সহানুভূতি ও করুণার সঞ্চার করল না। ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনার সময় আমি কি বলেছিলাম তাদের স্মরণ করিয়ে দিলাম। ১৯৪৬-এর ১৫ এপ্রিল আমার বিবৃতিতে আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে ভারতীয় মুসলমানদের সতর্ক করে দিয়েছিলাম। আমি বলেছিলাম, ভারত ভাগ যদি কখনো বাস্তবে পরিণত হয়, এক দিন জেগে উঠে তারা দেখবেন সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান পাকিস্তানে চলে গেছেন আর তারা ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ সংখ্যালঘু হিসেবে ভারতে রয়ে যাবেন।

টীকা :

মওলানা আবুল কালাম আজাদ (১৮৮৮-১৯৫৮) : দুবার কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী, আমৃত্যু এ পদেই ছিলেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম। তিনি ধর্মীয় সূত্র ধরে ভারত ভাগের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করেন। তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক।

সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল (১৮৭৫-১৯৫০) : জাতীয়তাবাদী নেতা, প্রকাশ্যে ও গোপনে জওয়াহেরলাল নেহরুর প্রতিদ্বন্দ্বী। ১৯৪৭ থেকে আমৃত্যু ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপ-প্রধানমন্ত্রী। তার নামেই ভারতের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছে।

জওয়াহেরলাল নেহরু (১৮৯৯-১৯৬৪) : ব্রিটিশ ভারতের সবচেয়ে সফল রাজনৈতিক নেতা। স্বাধীনতার লগ্ন থেকে ১৯৬৪, আমৃত্যু ভারতের প্রধানমন্ত্রী। তার কালের শ্রেষ্ঠ স্টেটসম্যানদের একজন। তিনি জন্মসূত্রে কাশ্মীরি প-িত হলেও বাস্তব জীবনে পান্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। তার কন্যা ইন্দিরা ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ (১৮৭৬-১৯৪৮) : জন্ম গুজরাটে, পাকিস্তান আন্দোলনের অগ্রনায়ক এবং স্বাধীন পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল। মেধাবী আইনজীবী, দ্বি-জাতিতত্ত্বের প্রবক্তা।

অনুবাদ  আন্দালিব রাশদী কথাসাহিত্যিক ও লেখক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত