অর্থ পাচারের অর্থনীতি

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২২, ১০:১৫ পিএম

মানিলন্ডারিং বা অর্থ পাচার প্রত্যেক দেশের জন্যই একটি ক্ষরণজাতীয় জটিল সমস্যা। বিশেষ করে যেসব দেশ বৈদেশিক মুদ্রা ও বিনিয়োগের সংকটে ভোগে তাদের জন্য মানিলন্ডারিং উভয় সংকট ও বহুমুখী মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করে। যে দেশে বিনিয়োগযোগ্য পুঁজির অভাব সেসব অর্থনীতি মানিলন্ডারিংয়ের কারণে বেশি সমস্যায় পতিত হয়। কারণ পুঁজি সংকটগ্রস্ত দেশ থেকে টাকা যদি বিদেশে চলে যায় তাহলে নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়। বোঝা যায় ওই দেশ পুঁজি ধরে রাখতে পারছে। পুঁজি ধরে রাখতে না পারার কারণে তাদের সব সময়ই প্রয়োজনীয় পুঁজির জন্য পরমুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হচ্ছে। পুঁজি-স্বল্পতার দেশ থেকে মানিলন্ডারিং বা পুঁজি পাচার অর্থই হচ্ছে অর্থনীতির জন্য ইন্টারনাল হ্যামারেজ বা অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ। জাপান বা আমেরিকার মতো বড় অর্থনীতির একটি দেশ থেকে মুদ্রা পাচার বা মানিলন্ডারিং হলে তাদের হয়তো খুব একটা ক্ষতি হয় না। কারণ এই ক্ষতি তারা পুষিয়ে নিতে পারে। তাদের উদ্বৃত্ত পুঁজি আছে। তথাপি সেসব দেশে মানিলন্ডারিংকে কঠোর পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হয়। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশ থেকে পুঁজি পাচার বা মানিলন্ডারিং হলে সেই ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব হয় না। কষ্টার্জিত কিংবা দুর্নীতিজাত যে অর্থ নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যবহৃত হতে পারত, সেই অর্থ বিদেশে বিনিয়োগে ব্যবহৃত হতে দেওয়াটাই আত্মঘাতী ।

অর্থ পাচারের মতো ঘটনা কখন ঘটে? যখন কোনো দেশে অবৈধ বা অস্বচ্ছভাবে অর্থ উপার্জনের সুযোগ থাকে কিন্তু অভ্যন্তরীণভাবে সেই টাকা ব্যবহারের অবাধ সুযোগ নেই, তখনই ব্যাপকভাবে  অর্থ পাচার হয়। কোনো দেশের অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনকারীরা যদি তাদের অর্থ অভ্যন্তরীণভাবে বিনিয়োগ বা ব্যবহারের সুযোগ পায় তাহলে পাচার বা মানিলন্ডারিং হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। যে দেশ পরিবেশ বা পরিস্থিতিতে অবৈধ অর্থ অর্জনের সুযোগ কম এবং পাচারের ও বিদেশে  বিনিয়োগের সুযোগ কম, সেই দেশ থেকে সাধারণত অর্থ পাচার হয় না। যেহেতু অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ কর দপ্তরের কাছে ঘোষণা দেওয়ায় কর পরিশোধের সমস্যা, যেহেতু সামাজিকভাবে তা প্রকাশ ও গ্রহণযোগ্য নয়,  যারা অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করেন তারা সেই অর্থ ব্যবহারের জন্য বিদেশে পাচার করে। আবার এমন দেশ আছে যেখানে বিদেশ থেকে অর্থ আহরণকে (তাদের ভাষায় ফরেন ইনভেস্টমেন্ট) অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেখানে মূল দেশে সেই অর্থ বৈধ কি অবৈধ তা নিয়ে তারা ভাবে না। মানিলন্ডারিং এবং অর্থ পাচার ঠেকাতে হলে বিশে^র সবগুলো দেশকে একযোগে উদ্যোগ নিতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে কোনো একক দেশের পক্ষে অর্থ পাচার ঠেকানো সম্ভব নয়।

দেশ অভ্যন্তরে বিনিয়োগের পরিবেশ যদি ভালো থাকে তাহলে অর্থ পাচার সচরাচর কম হয়। মূলত এবং মুখ্যত বাংলাদেশের মতো দেশে অবৈধ অর্থ উপার্জনের সুযোগ অবারিত থাকা এবং বিনিয়োগের অনুকূল ও কার্যকর পরিবেশ না থাকার কারণেই সাধারণত অর্থ পাচার হয়। অর্থনীতিতে পর্যাপ্ত পরিমাণ  অবৈধভাবে অর্জিত টাকা আছে কিন্তু সংগত কারণে সেই টাকা বিনিয়োগ করা হয় না বা যায় না। ফলে মানিলন্ডারিং বাড়ছেই। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের উপায় উৎসমুখে বন্ধ না হলে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ অর্থবহ হবে না।

মানিলন্ডারিং কোনো একক দেশের সমস্যা নয়। এটা বিশ^ব্যাপী অধিকাংশ দেশেরই সমস্যা। কাজেই কোনো একটি দেশ চেষ্টা করলেই মানিলন্ডারিং এবং মুদ্রা পাচার বন্ধ হবে না। সব দেশকে মিলেই এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কোনো দেশ থেকে যাতে মুদ্রা পাচার এবং মানিলন্ডারিং হতে না পারে তার ব্যবস্থা যেমন করতে হবে, তেমনি যে দেশে মুদ্রা পাচার হয়ে যাবে সেই দেশেরও উচিত হবে পাচার হয়ে যাওয়া টাকা তাদের অর্থনীতিতে প্রবেশ ও ব্যবহার হতে না দেওয়া। কোনোভাবে মানিলন্ডারিংয়ের মাধ্যমে টাকা চলে গেলেও সংশ্লিষ্ট দেশেও সেই টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা। এক দেশ মানিলন্ডারিং ঠেকানোর ব্যবস্থা করল কিন্তু অন্য দেশে পাচার করা টাকা ব্যবহারের অবাধ সুযোগ থাকলে তো মানিলন্ডারিং কখনোই বন্ধ হবে না। কাজেই যে দেশ থেকে মানিলন্ডারিংয়ের মাধ্যমে মুদ্রা পাচার হয় এবং পাচার করা মুদ্রা যে দেশে যায় উভয় দেশকেই এটা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকতে হবে। এ ধরনের একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনা (গ্লোবাল প্রোগ্রাম এগিনেস্ট মানিলন্ডারিং) আছে, বাংলাদেশও ইউএনর সে ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংযুক্ত সদস্য দেশ।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থ পাচার পরিমাণ ও প্রকারে বেড়ে যাওয়ায় দেশের সমাজ ও অর্থনীতিতে আয়বৈষম্য বেড়ে যাওয়ার চিত্র ও চরিত্র যেমন ফুটে উঠছে, তেমনি করোনা ও রাশিয়া ইউক্রেনের যুদ্ধেও প্রভাব মোকাবিলায় সামাজিক শক্তির তথা সহনক্ষমতা (রেজিলিয়েন্ট পাওয়ার) অবক্ষয়, নৈতিক মূল্যবোধের বেহাল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। করোনার কারণে যেমন সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে, তেমনি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রায় সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু তা-ই নয় বিদ্যমান কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রগুলোও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন অনেক প্রতিষ্ঠানই ব্যাপকভাবে কর্মী ছাঁটাই করেছে। ব্যয় সংকোচনের লক্ষ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম সীমিত করেছে। ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কিন্তু করোনার কারণে ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে অথবা তাদের কার্যক্রম সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে। ফলে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সীমিত হয়েছে যদিও প্রতিনিয়তই দেশে বেকার মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। আগামীতে দেশে বেকারত্বের হার অনেকটাই বেড়ে যাবে। বিদেশ থেকে অনেকেই কর্মচ্যুত  হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। তারাও বেকার সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছেন। বেকার সমস্যা বেড়ে গেলে দারিদ্র্যের হারও বৃদ্ধি পাবে। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা দেশে ফিরে আসার ফলে দুই ধরনের ক্ষতি হচ্ছে অর্থনীতিতে। প্রথমত, তারা দেশে ফিরে আসার কারণে বেকার সমস্যা আরও তীব্রতর হবে। একই সঙ্গে তারা যে রেমিট্যান্স প্রেরণ করতেন তা বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে আগামীতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়বে। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে যে উন্নয়নের ধারা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছিল তার পেছনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রেরিত অর্থ একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করত। আগামীতে এটা অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়বে। করোনার কারণে মানুষের হাতে অর্থ কমে যাওয়ার কারণে তারা এখন সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থার মধ্যে রয়েছেন। অভ্যন্তরীণভাবে দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্যে বর্তমানে একটি বিপর্যয়কর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যত অপারগতা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধকে বৈশি^ক সমস্যা হিসেবে দেখিয়ে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির অজুহাত নির্মাণ চলছে। দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ফলে হাতে জমানো অর্থ ব্যয় করে পরিবারের ভরণ-পোষণ করতে হচ্ছে। আর্থিক সামর্থ্যও কমে গেছে। তাই তারা চাইলেও আগের মতো পরিবারের পেছনে ব্যয় করতে পারবেন না। সবচেয়ে অসুবিধায় রয়েছেন যারা শহর ও গ্রামে  বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট দোকান দিয়ে তার আয় থেকে সংসার চালাতেন তারা। তারা ক্রমেই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। একসময় ছোট ছোট ব্যবসায়ের মাধ্যমে তাদের সংসার চালাতেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও তাদের অনেকেই আর আগের ব্যবসায় ফিরে আসতে পারবেন না। কারণ তারা এরই মধ্যে সংসারের ব্যয় নির্বাহের জন্য সঞ্চিত ব্যবসায়ের পুঁজি খুইয়ে বসেছেন। তাদের যদি প্রয়োজনীয় পুঁজি সরবরাহ করা না যায় তাহলে তাদের পক্ষে আর পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে না। কিন্তু তারা কোথা থেকে প্রয়োজনীয় পুঁজি পাবেন সেটাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুঁজি বিদেশে পাচার হয়েছে বা হচ্ছে নানা পন্থায়। অপ্রাতিষ্ঠানিক সেক্টরের সঙ্গে পরোক্ষভাবে যারা যুক্ত ছিলেন তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যারা বিভিন্নভাবে যুক্ত ছিলেন তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কারণ বড় প্রতিষ্ঠানের কাজ কমে গেলে সম্পৃক্ত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা একটি সিস্টেমের মধ্যে ছিলেন। আর্থসামাজিক সিস্টেম ভেঙে যাচ্ছে ।

বাংলাদেশে করোনার ক্ষতিকর প্রভাব আলোচনায় প্রধানত অর্থনৈতিক ক্ষতির দিকটিই আলোচিত হচ্ছে। কিন্তু করোনার কারণে আমাদের দেশের প্রচলিত সামাজিক সম্প্রীতি কীভাবে বা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা তেমন একটা আলোচনা হচ্ছে না। আমাদের দেশের প্রচলিত সমাজব্যবস্থার অবস্থা অত্যন্ত মানবিক এবং সহানুভূতি সম্পন্ন। একজনের বিপদে আর একজন এগিয়ে আসবেন এটাই চলে আসছে যুগের পর যুগ ধরে। একজনের আনন্দে অন্যজন আনন্দিত হন। কিন্তু করোনার কারণে আমাদের সেই হাজার বছরের প্রচলিত সামাজিক এবং পারিবারিক বন্ধন অনেকটাই শিথিল হয়ে গেছে। পরস্পর দেখা-সাক্ষাৎ কার্যত সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেছে। একজনের বিপদে আর একজন এগিয়ে আসতে পারেননি।  ইউরোপীয় উন্নত দেশগুলোর সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং বন্ধন এক রকম। আর আমাদের দেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশ সম্পূর্ণ অন্য রকম। আমাদের সামাজিক-সংস্কৃতি মানবতাবাদী এবং পরস্পর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ^াসী। ইউরোপীয় সংস্কৃতি হচ্ছে একক পরিবার প্রথায় বিশ^াসী। আর আমাদের দেশের সামাজিক প্রথা হচ্ছে যৌথ পরিবারে বিশ^াসী। পরিবারের একজনের কষ্টে অন্যজন এগিয়ে আসেন। কিন্তু উন্নত দেশগুলোতে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ এতটাই প্রবল যে সেখানে কেউ কারও খবর রাখার প্রয়োজন বোধ করেন না। করোনা আমাদের প্রচলিত সামাজিক ব্যবস্থায় এবং ধারণায় প্রচন্ডভাবে আঘাত হেনেছে। আমাদের পারিবারিক ব্যবস্থা হচ্ছে একান্নবর্তী পরিবারব্যবস্থা। ফলে পরিবারের মধ্যে মমত্ববোধ বেশি থাকে, যা উন্নত দেশগুলোতে কল্পনাও করা যায় না। করোনার কারণে আমাদের দেশের সামাজিক ব্যবস্থার এই দিকটি সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সিন্ডিকেট ও নিয়ন্ত্রকের প্রশ্রয়ে অবৈধ অর্থ উপার্জনের উদগ্র প্রবণতায়, অর্থ পাচারের মতো আত্মঘাতী দুরারোগ্যে ব্যাধি সেই ক্ষয়িষ্ণু সামাজিক শক্তিকে আরও বেশি দুর্বল করে দিচ্ছে। দ্রব্য ও সেবা মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদ ও দাবি তোলার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে একত্র হতে বাধা দিচ্ছে  সিন্ডিকেটেড শক্তি, পরিবহন মালিকরা বাস চলাচল বন্ধ রেখে। এটাই বিশ্লেষণযোগ্য যে পরিস্থিতি কতটা অসহায়ত্বের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত