মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রাস্ফীতির চাপ যেভাবে বাড়ল

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২২, ০১:০৫ এএম

বাজারে আগুন লেগেছে। মূল্যবৃদ্ধির আগুন। সব জিনিসের দাম কেবল বাড়ছে। চাল আটা, চিনি, তেল, মাছ, মাংস, ডিম, ডাল, তরকারি, ওষুধ সব কিছুর দাম ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। গত আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে পেট্রোল, অকটেন, ডিজেলসহ জ্বালানি তেলের দাম সাড়ে ৪২ থেকে ৫১ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর আগে কখনোই জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে এতটা বাড়ানো হয়নি। তাই আগস্ট মাসের শুরু থেকেই নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করে। এ ছাড়া যাতায়াত, পোশাক, শিক্ষাসামগ্রীর মতো খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দামও বেড়েছে।

সরকারি হিসাবেই গত আগস্ট মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। সেপ্টেম্বর মাসে তা কিছুটা কমে ৯ দশমিক ১০ শতাংশ হয়েছে। আগস্ট মাসে গত ১১ বছর ৩ মাসের (১৩৫ মাস) মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়েছে। এর আগে ২০১১ সালের মে মাসে সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ২০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছিল। ২০১১ সালের মে মাসের পর মূল্যস্ফীতি আর কখনোই ৯ শতাংশের বেশি হয়নি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে দেশে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি রয়েছে।

মূল্যস্ফীতির বহু কারণ রয়েছে। প্রথমত, দেশি-বিদেশি বাজারে কাঁচামালের আগুন দাম ও অপ্রতুলতা উৎপাদন শিল্পকে বিপাকে ফেলেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশ কাঁচামাল বা অন্তর্বর্তী পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করে থাকে। তার মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে দেশের বাজারে আগুন লেগেছে। জ্বালানি তেল ও গ্যাসের জোগানে ঘাটতি হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। এতে কলকারখানায় উৎপাদন কমেছে। অস্বাভাবিক বেশি দামে গ্যাস ও জ্বালানি তেল আমদানি করায় সেচ ও পরিবহন খরচ বেড়েছে। সারের দামও বেড়েছে। কৃষিজাত পণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ব্যয় বেড়েছে। ডলারের তুলনায় টাকার দামও নিম্নমুখী, রপ্তানির ক্ষেত্রে যা অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়েছে। মূলত জ্বালানি তেলের মাত্রাতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধিই সামগ্রিক মূল্যস্তরকে ঠেলে তুলেছে। ফলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ মানুষের। তার ওপর, বিভিন্ন কারণে ফসল নষ্ট হয়েছে, মজুদদারিও হয়েছে। সব মিলিয়ে সমস্যা বেড়েছে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ত্রুটিও মূল্যবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছে।

দেশে অতিরিক্ত টাকার জোগান তৈরি হলেও জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। এ পরিস্থিতিকে বলা হয় মুদ্রাস্ফীতি। খুব সহজভাবে বললে মূল্যস্ফীতি হচ্ছে কোনো দেশে মোট যে সম্পদ আছে তার মূল্য ওই দেশের বর্তমানের মোট মুদ্রামান (টাকা)-এর সমান। ধরা যাক, বাংলাদেশে সর্বমোট ১৫ টাকা আছে এবং এই দেশের সম্পদ বলতে সাকুল্যে আছে ৫টি কমলা। আর কিছুই নেই। যেহেতু দেশের মোট সম্পদের মূল্য মোট মুদ্রামানের সমান, সেহেতু এই ৫টি কমলার মূল্য ১৫ টাকা। অর্থাৎ, প্রতিটি কমলার মূল্য ৩ টাকা। এখন যদি আরও ৫টি নোট ছাপানো হয়, তাহলে মোট মুদ্রামান হয়ে যাবে ১৫+৫=২০ টাকা। কমলা কিন্তু বাড়েনি। তার মানে এখন নতুন করে ৫ টাকা ছাপানোর পর ৫টি কমলার মোট মূল্য হয়ে গেল ২০ টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি কমলার বর্তমান মূল্য ৪ টাকা।

এই যে সম্পদ না বাড়িয়ে অতিরিক্ত টাকা ছাপানোর ফলে কমলার দাম ৩ টাকা থেকে ৪ টাকা হয়ে গেল, এটাই সহজ ভাষায় মুদ্রাস্ফীতি। একই পণ্য আগের থেকে বেশি দামে ক্রয় করা মানেই মুদ্রাস্ফীতি হয়েছে। অর্থাৎ কোনো দেশের সম্পদের পরিমাণ না বাড়িয়ে টাকা ছাপালে মুদ্রাস্ফীতি হবে।

মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে খেলাপি ঋণের একটা ভূমিকা আছে। দেশে বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণও অনেক বেড়েছে। সহজ ভাষায় খেলাপি ঋণ সম্পর্কে বলা যায়, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করলে সেই ঋণই হচ্ছে খেলাপি ঋণ। আবার সেই ১৫ টাকা এবং ৫ কমলায় ফিরে আসা যাক। কোনো ব্যক্তি এই ১৫ টাকা থেকে ৫ টাকা ঋণ নিল। যতক্ষণ পর্যন্ত ঋণের ৫ টাকা দেশের মধ্যেই থাকছে, ততক্ষণ দেশের মোট মুদ্রামান ১৫ টাকাই থাকে। মানে প্রতিটি কমলার মূল্য ৩ টাকাই থাকে। অর্থাৎ মুদ্রাস্ফীতি এখন পর্যন্ত ঘটেনি।

কিন্তু ধরা যাক, ওই ব্যক্তি ঋণের ৫ টাকা ডলারে কনভার্ট করে বিদেশে গিয়ে খরচ করে ফেলল এবং সে ঋণপরিশোধ করতে অক্ষম। ডলারে কনভার্ট করার মানে হচ্ছে ওই ৫ টাকা এখন আর টাকা নেই [ধরা যাক, ৫ টাকা এখন ১ ডলার হয়ে গেছে]। এখন ওই ১ ডলার কিন্তু আর বাংলাদেশে ব্যবহার করা সম্ভব নয়। যে দেশের মুদ্রা শুধু সে দেশেই ব্যবহার করা যায়। মানে ওই ৫ টাকা বাংলাদেশের মধ্যে আর নেই! অথচ কাগজে-কলমে বাংলাদেশের মোট টাকার মান এখনো ১৫ আছে। প্রকৃতপক্ষে আছে ১০ টাকা। ওই খেলাপি ৫ টাকার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আবার ৫ টাকা অতিরিক্ত ছাপানো হয়। অর্থাৎ খাতা-কলমে মোট মুদ্রামান হয়ে যায় ২০। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে থাকে ১৫ টাকা।

এখানে দুটি ঘটনা ঘটে। যেহেতু নতুন করে টাকা ছাপানো হয়, সেহেতু মুদ্রাস্ফীতি হয়। অর্থাৎ একই কমলার দাম আগে ছিল ৩ টাকা। যা এখন হয়ে যাবে ৪ টাকা। এই সমস্যাও খুব একটা প্রভাব ফেলত না যদি সত্যি সত্যি দেশে ২০ টাকা থাকত। তাহলে পণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও বাড়ত। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। কারণ দেশে তো ২০ টাকা নেই। আছে ১৫ টাকা। ৫ টাকা গায়েবুল হাওয়া হয়ে গেছে। মানে আমাদের কাছে আছে ১৫ টাকা। কিন্তু পণ্য কিনতে হচ্ছে এমন দামে যেন আমাদের ২০ টাকা আছে।

চলতি ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিন মাসে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১১ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা। এতে ব্যাংক খাতে জুন শেষে খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। গত মার্চে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। এর মানে এই খেলাপি ঋণের অনেক টাকাই আমাদের দেশে নেই। অথচ আমাদের পণ্য ক্রয়ের সময় এমন দাম দিতে হচ্ছে যেন ওই ১ লাখ ২৫ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা আমাদের মুদ্রামানে যুক্ত আছে। এইসব হিসাবেই ১২ কেজির গ্যাসের সিলিন্ডার গ্যাসের দাম আজ ১২৫১ টাকা, অথচ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সেই ৭০০ টাকাই আছে। এটা একটা ভয়ংকর ব্যাপার। আমাদের টাকা না দিয়ে বলা হচ্ছে টাকা দিয়েছি, আছে তোমার পকেটে, বেশি দাম দিয়ে চাল, ডাল, তেল কিনবে। না হলে না খেয়ে মরবে। দেশবাসী পড়েছে এক মহা গ্যাঁড়াকলে!

অভিজ্ঞতা বলে মূল্যস্ফীতির চাকা একবার গড়াতে শুরু করলে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন। তবু কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব। প্রথমেই আমদানি ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়াই বর্তমান মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ। অত্যাবশ্যক পণ্যের বাইরে অন্য সব জিনিস আমদানির ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ক্ষেত্রে বিশেষত রেমিট্যান্স আহরণের ওপর প্রণোদনা প্রয়োজনে আরও বাড়াতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। খেলাপি ঋণ আদায়ের সর্বোচ্চ চেষ্টা তো করতেই হবে, সেটা যেন আর না বাড়ে, সেদিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। ঋণ আদায়ে প্রয়োজনে কঠোর হতে হবে। আর্থিক বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখবার দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের। সুদহার বাড়ানো বা কমানো, বাস্তবতা বিবেচনা করে আমদানি পণ্যের ওপর করারোপ ইত্যাদি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে যাতে মজুদদারির কারণে মূল্যস্ফীতি না ঘটে, সেই দিকেও নজর রাখতে হবে।

বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ সম্পদ বা রাজস্ব আয় বাড়ানোটা খুব জরুরি। সেদিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। করের আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি ধনী শ্রেণির করদাতাদের সর্বোচ্চ করহার ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে আগের মতো ৩০ শতাংশ করা উচিত। কর ব্যবস্থা অটোমেশন করতে হবে। প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণের পাশাপাশি প্রকল্পগুলো সময় মতো সম্পন্ন করার ব্যাপারে অঙ্গীকার থাকতে হবে। দুর্নীতি, চুরি, অপচয়, অপব্যয়ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মোট কথা, মূল্যস্ফীতির সমস্যা যেন দেশকে বিধ্বস্ত না করে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্বটি সরকারকেই নিতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নিতে হবে। এই কাজে গাফিলতি চলতে পারে না।

লেখক: লেখক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত