দেশ ও অর্থনীতির অর্ধশতবর্ষ পূর্তির এই প্রান্তিক পর্যায়ে এসেও রাজস্ব আয় অর্জনে আমরা যে এখনো একটা পুশ ফ্যাক্টরের ভেতরে আছি তা বুঝতে কষ্ট হয় না। অর্থাৎ রাজস্ব আহরণকে কাক্সিক্ষত পরিমাণে উন্নীত করার জোর চেষ্টা চলছে তো চলছেই। বিপুল সংখ্যক করদাতা এখনো করজালের আওতায় আসতে পারেননি, আনা যায়নি। অন্যদিকে সঠিক পরিমাণে কর ও শুল‹ায়নযোগ্য যে খাতগুলো বাদ পড়ে গেছে বা বাইরে আছে সেগুলোকে শুল্ক ও করের আওতায় আনার চেষ্টা অব্যাহত আছে। তবে উভয় ক্ষেত্রেই পরিশীলিত, সংস্কারকৃত কর্মপরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হয়ে একটা করদাতাবান্ধব ও স্বয়ংক্রিয় প্রণোদনামূলক পদ্ধতি গড়ে তোলা বা প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে। অর্থাৎ কর যারা দেয় না তাদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি কর প্রদানে যারা ফাঁকি দিচ্ছে বা এড়িয়ে যাচ্ছে তাদের প্রতি কঠোর ও কঠিন মনোভাব পোষণ এবং সর্বোপরি কর প্রদান ও আহরণের সংস্কৃতিকে জাতীয় দায়িত্ব বোধের চেতনায় উত্তরণ ঘটানোর কাজে ক্লান্তিকর প্রহর যেন শেষ হচ্ছে না।
কর দান ও আহরণের ক্ষেত্রে যে সমস্ত প্রতিবন্ধকতা বা জটিলতাসহ স্পর্শকাতরতা রয়েছে তা দূর করে কার্যকর অবস্থায় নিয়ে আসতে সেই ৯০-এর দশক থেকেই চেষ্টা চলছে। ৯০ দশক পর্যন্ত আমদানি বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতির সময়ে নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থা তেমন ছিল না বলে তখন আমদানি শুল্ক ব্যতিরেকে কর ও ভ্যাট রাজস্ব আহরণের আবশ্যকতা দেখা দেয়নি। ৯০-এর দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন ট্রেডিং নির্ভরতা থেকে ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের দিকে অগ্রসরসমান হয় তখন থেকেই শুল্কের চেয়ে করের কলেবর বৃদ্ধি পেতে থাকে। রেমিট্যান্সের পাশাপাশি পোশাক শিল্পের হাত ধরে আমাদের রপ্তানি আয় ও উন্নয়ন বেড়ে গেলে এবং আমদানি ব্যয় হ্রাস পেতে থাকলে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহ সংক্রান্ত বিষয়াদি নতুন করে জাতীয় ভাব-ভাবনার চৌহদ্দিতে চলে আসে। অন্যদিকে ৯০ দশকের শুরুতেই রুশ ফেডারেশনের পতনে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়। তখন উন্নয়নশীল দেশগুলোর আগের মতো বিদেশি ঋণ অনুদানপ্রাপ্তির সুযোগ এবং সম্ভাবনা হ্রাস পায়। ফলে অনেকটা বাধ্য হয়েই বাংলাদেশের মতো অনুন্নত অথচ উন্নয়নআগ্রহী দেশে নিজস্ব রাজস্ব আহরণের গুরুত্ব বেড়ে যায়।
এতদসত্ত্বেও, রাজস্ব আহরণের প্রয়াস প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেও কর-জিডিপির অনুপাত কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছাতে এখনো মনে হচ্ছে অনেক পথ বাকি। বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি র্যাশিও বরাবরই নিম্ন পর্যায়ের আশপাশেই ঘুরছে, যদিও সব সময় কর-রাজস্ব আহরণের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ছিল বা আছে অনেক বেশি। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রা বেশি ধরা হলেও তা পূরণে সফলতার গতি গজেন্দ্রগামী। এক্ষেত্রে পদ্ধতিগত, অবকাঠামোগত এবং বিবিধ সব ধরনের ত্র“টি দূর করে উপযুক্ত করদাতাদের মধ্যে থেকে যত বেশি জনকে করের আওতায় আনা যায় সে চেষ্টাই যেন শুধু চলছে। পাশাপাশি যেসব নিত্যনতুন আর্থিক খাত তৈরি হচ্ছে সেগুলোকেও চটজলদি করের আওতায় আনার প্রয়াস চলছে। কিন্তু কর্মক্ষমতায় ও কর্মদক্ষতায় সে প্রয়াস কাক্সিক্ষত ফলাফল আনতে যথেষ্ট সময় নিচ্ছে। রাজস্ব আহরণ দপ্তরে দক্ষ জনবলের অভাব এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির প্রসার প্রতিপত্তির প্রেক্ষাপটে রাজস্ব আহরণ পদ্ধতি প্রক্রিয়ার অনলাইন রূপান্তরের কাজ, সংস্কারের কাজ কেমন যেন শেষ হয়েও হচ্ছে না, সময়ের অবসরে প্রযুক্তির প্রভূত পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ঢিমেতালে চলা উদ্যোগে বাধা আসছে ঘরে-বাইরে থেকেও। বাধার বিন্ধ্যাচল পেরুনো কঠিন মনে হচ্ছে।
প্রযোজ্য সবার করদানে সচেতন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য যখন এবং যেখানে উদ্বুুদ্ধকরণ ও প্রণোদনামূলক পন্থা-পদ্ধতি প্রয়োগের কথা, সেখানে কর আহরণ পরিবেশ পরিস্থিতিকে স্বয়ম্ভর ও অভিজ্ঞ মনে করে কঠিন কঠিন পদ্ধতি প্রয়োগের পরাকাষ্ঠা যদি দেখানো হয় বা অহেতুক চাপ সৃষ্টি করা হয় তাহলে করদাতারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন না। দেখতে হবে আইনকানুন সংস্কারের পাশাপাশি রীতি-পদ্ধতিকে করদাতা বান্ধবকরণের নামে পরিবেশ পরিস্থিতিকে আরো কঠিন ও কর্কশ করা হচ্ছে কি না। কর আহরণ পদ্ধতি-প্রক্রিয়া এমনতর জটিল, কমপার্টমেন্টালাইজড ও কঠিন হলে যারা এখনো করের আওতায় আসেনি তারা করদাতা হতে ভয় পেতে পারেন। পাশাপাশি যারা কর দিচ্ছেন তারাও সঠিকভাবে কর দিতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলতে পারেন।
করদাতারা তাদের অভিযোগ ও সমস্যার সমাধান পেতে পারতেন কর ন্যায়পালের কাছে। শতাধিক দেশে কর ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠান কার্যকর থাকলেও বাংলাদেশে প্রবর্তিত কর ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠানকে বাল্যবয়সেই বিদায় করে দেওয়া হয়েছে। কর ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠানের কার্যকরকরণে যে সব সমস্যা সীমাবদ্ধতার যুক্তিতে তাকে অপাঙ্ক্তেয় ভাবা হয়েছিল আইনে সেগুলো সংশোধন সংযোজন করে প্রতিষ্ঠানটির পুনর্জন্ম কর-সংস্কৃতির সার্বিক উন্নয়নের জন্য বিবেচনার অবকাশ রয়েছে। যে স্টেজে যে অ্যাটিচুড বা মনোভঙ্গি (মাইন্ডসেট) বা উপলব্ধি থাকার কথা সেটায় না থেকে আমরা যদি ভাবি বা ধরে নিই যে, উন্নত অর্থনীতির মতো আমাদের সব করদাতা শিক্ষিত, করদানে দায়িত্বসচেতন এবং তারা আইনকানুন সব বোঝেন-জানেন, তাহলে কর-দৃষ্টিভঙ্গি (মাইন্ডসেট) ভিন্ন আঙ্গিকে নির্মিত হতে বাধ্য। এমনতর অবস্থায় রাজস্ব আহরণ পরিবেশ পরিস্থিতি ‘প্রোগ্রেসিভ’ না হয়ে ‘রিগ্রেসিভ’ হতে পারে। নতুন করদাতা আসতে যেহেতু চাচ্ছে না, বা তাদের আনা যাচ্ছে না, সেহেতু তাদের স্থলে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ বেড়ে গেলে তারাও পথ খুঁজতে পারেন কীভাবে কর দেওয়া থেকে ফাঁকি দিয়ে পরিত্রাণ মিলতে পারে।
প্রতি বছর যে অর্থবিধি জারি করা হয় সেখানে বিদ্যমান তিনটা রাজস্ব আহরণ আইনেরই সংশোধন ও সংযোজন পরিমার্জনে গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমরা জানি ইতিমধ্যে ১৯৯১ সালের ভ্যাট আইনের স্থলাভিষিক্ত একটা নতুন কর আইন ২০১২ সালে জারি হলেও ২০১৯ সালের আগে তার পূর্ণ প্রবর্তন করা যায়নি। এদিকে ১৯৬৯ সালের কাস্টমস আইনের সংস্কার ও আধুনিকীকরণের চেষ্টাও চলছে। পাশাপাশি ইনকাম ট্যাক্সের ১৯৮৪ সালের অধ্যাদেশটির নবায়ন বহুদিন বা সবসময় ফাইনাল স্টেইজে আছে। এসবের পাশাপাশি এবং এসব সত্ত্বেও ইদানীং দেখা যাচ্ছে অর্থবিধিতে বিস্তর রিভিশনের প্রস্তাব করা হচ্ছে। বছর বছর ট্যাক্স রেট, কর রেয়াতের মাত্রা, অবকাশের হার ও ক্ষেত্রে নিত্যনতুন সংশোধন, সংস্কার প্রস্তাবনা প্রতি বছর যেন বেড়েই চলেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, শুধু আয়করের ক্ষেত্রেই গড়ে ৭০টির মতো সংস্কার প্রস্তাব আসে অর্থবিধিতে। এক্ষেত্রে খেয়াল করতে হবে প্রতি বছরের অর্থবিলে যদি এক একটা আইনের ধারা-উপধারা অতি পরিবর্তন-পরিবর্ধন ও সংশোধনের হিড়িক পড়ে তখন সংশ্লিষ্ট সবার পক্ষে ঐ সমস্ত পরিবর্তন ফলো করা কঠিন তো হয়ই, এসব প্রয়োগে জটিলতা আরও বাড়ে বৈ কমে না। ব্যবসা-বাণিজ্য বিনিয়োগে সিদ্ধান্ত নিতে বেশ দুশ্চিন্তায় পড়তে হয় করদাতাদের।
আইনের সংশোধন সংক্রান্ত এসআরও’র প্রয়োগ ন্যূনতম ৩ বছর বা তার বেশি হলে ঐ এসআরও’র কার্যকারিতা অনুসরণ অনুধাবন যুক্তিযুক্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। এদিকে আয়কর পরিপত্র-১ জারিতে বিলম্ব করেও তাতে কিছু কিছু বিষয়ে অস্পষ্টতা নিরসনে ব্যাখ্যার অবকাশ থেকে যায়। এসবই সঠিক পরিমাণে ন্যায্য কর আদায়ের ক্ষেত্রে বিলম্ব সৃষ্টি বা অন্তরায় হিসেবে কাজ করতে পারে। পরিপত্রে স্পষ্টকরণ করতে গিয়ে যে দীর্ঘসূত্রতা তা থেকে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব না হলে প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রতিবেশগত নানা প্রভাব পুরো বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রেই উপযুক্ত কর আদায়ের জন্য অপারগ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশের অর্থবছরে শুরু থেকেই ঝড়বৃষ্টি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি আরও নানান উপলক্ষের সমস্যা থাকে, এর সুযোগ নিয়ে আয়কর দেওয়ার সময় বাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করে সবাই। এই অবস্থা থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে আসতেই এবার আইনের মধ্যেই সময় নির্ধারণ করা হয়েছে অর্থবছর শেষ হওয়ার ৩ মাসের স্থলে ৫ মাস পর্যন্ত অর্থাৎ নভেম্বর মাস পর্যন্ত ব্যক্তি আয়কর দেওয়া যাবে। যেহেতু সবাই অপেক্ষা করে পরিপত্র জারির, তাই সেই কাক্সিক্ষত ব্যাখ্যার জন্য অপেক্ষায় কিংবা পরিপত্র জারির দেরি হওয়াকে হয়তো নভেম্বর নির্ধারণে প্রেরণা হিসেবে কাজ করে থাকতে পারে। কিন্তু আমরা যদি সবাইকে করের আওতায় আনতে চাই তাহলে অর্থবছর শেষ হওয়ার পর পাঁচ মাস পর্যন্ত অপেক্ষার অবকাশ অর্থাৎ সময়ক্ষেপণের এ ধরনের অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে সবার জন্য যথাসময়ে কর দেওয়ার সহজ সুযোগ সৃষ্টি শ্রেয়তর বিবেচিত হতে পারে।
বাজেটে নতুন হারে করারোপের পর অর্থবছরের শুরু থেকেই কর কীভাবে দিতে হবে, কোন কোন পরিস্থিতিতে কী করণীয় সেটা নিশ্চিত না করা গেলে সমস্যা সৃষ্টি হবে এটাই স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে আয়করে নভেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়িয়ে নেওয়াতে মূল সমস্যা যেটা হয়েছে সেটা হলো কর প্রদান ও প্রাপ্তিতে দীর্ঘসূত্রতা বেড়েছে। এক্ষেত্রে আগের তুলনায় দুই মাস পর কর আদায় হওয়ায় সামষ্টিক আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বিড়ম্বনা ও ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে। কেননা অর্থবছরের শুরু থেকে সরকারি অর্থব্যয় অব্যাহত থাকে, কিন্তু রাজস্ব আয় কত আসবে সেটার অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে বেশ কিছুটা সময়। ফলে ব্যাংক বরোয়িং বাড়তে থাকে। অনেক সময় কাক্সিক্ষত কর নাও আসতে পারে। একবারে ৩ থেকে ৫ মাস সময় বেড়ে যাওয়াতে সবাই যাতে যার যার মতো গা-ছাড়া ভাব বা বিলম্ব করার প্রবণতায় অর্জিতব্য রাজস্বের উপযোগিতা যাতে হ্রাস না পায় সেদিকে সচেতন দৃষ্টিক্ষেপ প্রয়োজন হবে।
রাজস্ব আহরণ কার্যক্রমে ও পদ্ধতি-প্রক্রিয়ায় আইনসংগত স্বচ্ছতার আলোকে গতিশীলকরণের স্বার্থে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে আইন ও প্রক্রিয়ার যৌক্তিকতা যথা বিশ্লেষণ হওয়া উচিত। বিশেষ করে কর আহরণ প্রক্রিয়ার যেসব আইনি জটিলতা সেটা ঠিক মতো সংস্কারের মাধ্যমে স্পষ্ট করা না গেলে সমস্যা থেকেই যাবে। অন্তত এই অবস্থায় রেখে ব্যাপক কর আদায়ের যে কথা চিন্তা করা হচ্ছে তা অর্জন স্বতস্ফূর্তভাবে সম্ভব হবে না। এক্ষেত্রে আইনের আর্থ-প্রশাসনিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে যদি আরও কিছু অসম্পূর্ণতা ও ফাঁকফোকর থেকে থাকে তা সংশোধন করা না গেলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এনবিআর কর্তৃপক্ষের নেতৃত্ব দেওয়া কঠিন হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।
লেখক: রাজস্ব নীতি বিশ্লেষক