খাঁটি খুঁটির চক্করে নির্বাচন আন্দোলন

আপডেট : ২২ মে ২০২৩, ১১:২৭ পিএম

সরকারকে যারা নড়বড়ে ভাবছেন, তারা ভুলের ঘোরে ঘুরছেন। বক্তব্যটি ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের। বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে তার এ বক্তব্য। দলটির নেতাদের গত ক’দিনের কড়া কথার জবাবে তার এ চড়া জবাব। আর শান্তি সমাবেশ না করে উচিত শিক্ষা দেওয়া শুরু করবেন বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। বিএনপির আন্দোলনের মরা গাঙে আর জোয়ার আসবে না এ কথা আগেই বলে রেখেছেন ওবায়দুল কাদের।

এর বিপরীতে হাতে আর তেমন সময় নেই, সময় থাকতে মানে মানে সরকারকে দ্রুত সেফ এক্সিট নেওয়ার আহ্বানের কাজটি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত ক’দিন অবিরাম বলছেন। নইলে আন্দোলন যেভাবে ‘তীব্র থেকে তীব্রতর’ হচ্ছে এর তাপে-চাপে সরকার পালানোর পথ পাবে না বলে সতর্কবার্তাও দিচ্ছেন। বাকপটু ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাসহ দলটির কয়েক নেতার আওয়াজ আরও গরম। তারা বলে বেড়াচ্ছেন, সরকারের সময় শেষ। এ সরকার ক্ষমতায় আছে আর মাত্র দুতিন মাস।

মারাত্মক প্রশ্ন এবং খটকা এখানে। নির্বাচন ছাড়া দুতিন মাসে কীভাবে সরকার হটবে? তারপরই না বিএনপির গদিনশীন হওয়া। ক্ষমতায় জাতীয় নির্বাচন কি দু’তিন মাস পরই, যে নির্বাচনে হেরে ক্ষমতাহীন হয়ে যাবে আওয়ামী লীগ? নির্বাচন ছাড়া তা কীভাবে সম্ভব? আন্দোলনের তোড়ে? বিএনপির চলমান আন্দোলন কি দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুলের ভাষায় ‘তীব্র থেকে এতই তীব্রতর’ যার তাপে-চাপে সরকার ক্ষমতা ছেড়ে পালাবে? আর নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার খেদানোর সময় গুনলে বাকি আছে আরও ৭-৮ মাস। নির্বাচন আগাম হলেও তা কি দুতিন মাসের মধ্যে সম্ভব? তাহলে কোন শক্তি-লক্ষ্য-উপলক্ষকে ভরসা করে দু’তিন মাসে সরকার পতনের  ঢেঁকুর তুলছে বিএনপি? ভেতরে-ভেতরে কি তবে আন্দোলন-নির্বাচনের বাইরে অন্য কোনো কায়কারবার আছে? বা চলছে?

আগামী নির্বাচনের ধরন এখন পর্যন্ত অজানা। ২০১৪ বা ২০১৮ সালের মতো নির্বাচন হলে বিএনপির নসিবে কী জুটবে, তা দলটির নেতাকর্মীরাও ভালো করে জানেন। এ ছাড়া, নির্বাচনের রকমফের রয়েছে। কুমিল্লার মাতৃভাণ্ডারের রসমালাই বা মুক্তাগাছার মণ্ডার মতো অবস্থা নির্বাচনের। খাঁটি মাতৃভাণ্ডার, পিউর মাতৃভাণ্ডার, আদি মাতৃভাণ্ডার, আসল মাতৃভাণ্ডার, অরিজিনাল মাতৃভাণ্ডার ইত্যাদি শব্দযোগে কত মাতৃভাণ্ডারে বাজার সয়লাব। বাজারে চলছে সব মাতৃভাণ্ডারই। মুক্তাগাছার মণ্ডা বা নাটোরের কাঁচাগোল্লার অবস্থাও অনেকটা তাই। রাজনীতির ময়দানে ‘নির্বাচন’ শব্দটির দশাও তাই। একতরফা নির্বাচন, নিশি নির্বাচন, সুষ্ঠু নির্বাচন, অবাধ নির্বাচন, নিরপেক্ষ নির্বাচন, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন এ ধরনের বিশেষায়িত শব্দ যোগ করতে করতে এখন উচ্চারিত হচ্ছে ‘বিশ্বমানের  নির্বাচন’। বাস্তবতা ও আকাক্সক্ষার জেরে শুধু নির্বাচন বললে এখন আর চলে না। সঙ্গে সঙ্গে কথার খই ফোটার মতো প্রশ্নে চলে আসে কীসের নির্বাচন কেমন নির্বাচন? কোন মডেলের নির্বাচন? ১৪ না ১৮ স্টাইল? দিনে না রাতে? ভোটে না বিনা ভোটে? ব্রাহ্মণবাড়িয়া না গাইবান্ধা স্টাইলে? নাকি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি স্টাইলে?

এ ধরনের খাঁটি নির্বাচনে অংশ নিলে কী হয়, না নিলেই বা কী ছিদ্দতে হয় দুই অভিজ্ঞতাই হয়েছে বিএনপির। ২০১৪ সালে দলটি নির্বাচনে না গিয়ে দেখেছে। আর ২০১৮ সালে দেখেছে নির্বাচনে অংশ নিয়ে। তাদের কাছে মেসেজ পরিষ্কার। আর সরকারের ঠেকা লাগেনি খাঁটি নিরপেক্ষ নির্বাচন দিয়ে বিএনপিকে ওই নির্বাচনে জেতানোর ব্যবস্থা করে নিজের বিষ খাওয়ার দশা করার। আবার সরকারও জানে ২০১৪ বা ১৮ সালের মতো নির্বাচন করতে না পারলে কী অবস্থা হবে তাদের! একতরফা, অতিরিক্ত, বাড়তি কিছুই ভালো ফল দেয় না, এর বহু প্রমাণ আমাদের সামনে। নিজের বুঝ ষোলোআনা বুঝতে গিয়েই মূলত এ অবস্থা। এসব বেশি বেশি করলে বোবারও এক সময় মুখ খুলে যায়। এর ছোট্ট উদাহরণ ঢাকায় কূটনীতিকদের বেঁকে বসা। বিশ্বমিডিয়ায় নেতিবাচক ধারণা বাংলাদেশের অতিথি নিরাপত্তা নিয়ে। অন্যান্য বাঙালি ইস্যুর মতো বিদেশি কূটনীতিকদের ইস্যুর ফয়সালা এত সহজ নয়।

তার ওপর এক এক সময় এক এক কথা বলে ভেজাল আরও পাকানো হয়েছে। সমস্যাটা তো ‘বাড়তি’ আর ‘মনে করা’ নিয়েই। প্রয়োজনে মনে হয়েছে বাড়তি সমাদর করা দরকার। আবার দরকার শেষে ছুড়ে ফেলা। প্রয়োজন আর বাড়তির বাড়াবাড়ি। আড়াল করার কোনো উপায় নেই যে, যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক আগের মতো ভালো যাচ্ছে না। তা নির্বাচন, গণতন্ত্রায়ণ, বাক-স্বাধীনতা প্রশ্নে। দীর্ঘ সময় এ দেশগুলোই সরকারকে কেবল সমর্থন নয়, সহযোগিতাও দিয়েছে। ২০১৪-১৮ সালের প্রশ্নযুক্ত নির্বাচনকেও বৈধতা দিয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে চিত্র ভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। আরও ভিন্ন হওয়ার লক্ষণ স্পষ্ট। সুষ্ঠু নির্বাচনের তাগিদ দিচ্ছে মাত্রা ছাড়িয়ে। স্বাভাবিকভাবেই সরকারের জন্য এটি বিব্রতকার। আর সরকারের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির জন্য পরমানন্দের। নির্বাচন প্রশ্নে সরকারের মনোভাব একদম খোলাসা। বিএনপির মনমতো কারও হাতে ক্ষমতা দিয়ে সরে পড়া বা সংবিধানের বাইরে গিয়ে তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন দেওয়ার মতো কাজ না করার সিদ্ধান্তে অটল সরকার। প্রধানমন্ত্রী পরিষ্কারভাবে এ বার্তা জানিয়েছেন দেশ-বিদেশে সব জায়গায়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপানের মতো সুপার পাওয়ার দেশ সফরের সময় তা বলে এসেছেন। দেশে ফিরে প্রথাগত সংবাদ সম্মেলনেও তার অবস্থান আরও পরিষ্কার করেছেন।

টানা ১৫ বছর বিএনপি ক্ষমতাহীন। ক্ষমতার ময়ুর সিংহাসনের ধারেকাছে যাওয়ার অবস্থাও তৈরি করতে পারেনি। ক্ষমতায় জন্ম নেওয়া এবং ক্ষমতামুখী কোনো দলের জন্য এমন অবিরাম ক্ষমতাহীনতা বড় কষ্টের। তা দলের মধ্যে উতলা-অসহিষ্ণুতা তৈরি করা স্বাভাবিক। তাদের জন্য ক্ষমতার আশায় আশায় এত দিন চলে যাওয়া এক ধরনের হতাশারও। গেল বছরে ‘১০ ডিসেম্বরের পর আর শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকবেন না’ হুমকির কামানের মতো হয়ে থাকলে বিএনপির এবারের ‘দু’তিন মাসের’ ঢেঁকুরও স্রেফ একটি হাঁচি-কাশির মতোই কোনো প্রাকৃতিক কাণ্ড। কর্মীদের চাঙ্গা করার উদ্দেশ্যে ঝেড়ে কাশি দেওয়ার মেঠোকথা হয়ে থাকলেও নির্বাচন ছাড়া কারও ক্ষমতাচ্যুতি বা ক্ষমতারোহণের মানসিকতা গণতন্ত্রের জন্য কুলক্ষণ। সরকার এ বিষয়ে কেবল সতর্ক নয়, দেশের সীমানার বাইরের ক্ষমতার ফ্যাক্টরগুলোর দিকে চোখ-কান খাড়া রাখছে। মনে মনে না রেখে তা প্রকাশ্যে জানান দিতেও ইস্পাত কঠিন মানসিকতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। ‘যে দেশ স্যাংশন দেবে তাদের কাছ থেকে বাংলাদেশ কিছু কিনবে না’ বলে সাফ জানিয়ে তিনি নিজেকে আরেকটি উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

বিভিন্ন সময় বরাদ্দ প্রত্যাহার করলেও একমাত্র আওয়ামী লীগ সরকারই বিশ্বব্যাংককে চ্যালেঞ্জ করেছে সেই কঠিন সত্যও উল্লেখ করেছেন। এরপরও বিএনপির তর্জন-গর্জন। এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। হরেক মত, পথ, বাহন, গন্তব্য, মন্তব্যের গোলমালের ভেতরও সরকারকে নানা ভাষায় আক্রমণের প্রতিযোগিতা দলটির মধ্যে। মারাত্মক হুমকি-ধমকিতে সরকারকে কড়াকথা বলে ভাইরাল হওয়ার একটা চেষ্টা লক্ষণীয়। এর আগে বছর কয়েক লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের যুক্তিগ্রাহ্য দাবিটিও বরবাদ হয়েছে তাদের অতিকথনের কচলানিতে। দলটিকেই লেভেল হওয়ার দশা করে ছেড়েছেন তারা। এ অবস্থার মধ্যেও গত মাস কয়েকে মাঠের রাজনীতিতে কিছুটা উৎরেছে বিএনপি। এর মধ্যে বিএনপি যে নতুন করে আন্দোলনে একটি টেম্পু তোলার চেষ্টা করছে তা গোপন রাখছে দলটি। তাদের দেশি-বিদেশি কিছু খুঁটি পাওয়ার ঘটনা অনেকটা ওপেন সিক্রেট। সুদিনের আশায় বছরের পর বছর শেষে সোয়া যুগ পার হতে চলেছে বিএনপির। ক্লান্ত হতে হতে নিরাশ হলেও হাল ছাড়ছে না। আবার সরকার সংবিধানের আওতায় ক্ষমতায় থেকে নির্বাচনের যে ছক ও প্রস্তুতিতে এগোচ্ছে তা থেকে বাঁচার দৃশ্যত কোনো দিশা নেই বিএনপির। হয় তাদের এ নির্বাচনে যেতে হবে, নয় বয়কট করতে হবে। নির্বাচনটি হতে না দেওয়া, বানচাল করার সামর্থ্য এখনো হয়নি বিএনপির।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত