পুলিশের ক্ষমতা যৌক্তিক

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৩, ১২:৩১ এএম

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সরকারি স্থাপনাসমূহের রক্ষণাবেক্ষণ ও জনসাধারণের নিরাপত্তাসহ সর্বোপরি আইনশৃঙ্খলা পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখতেই পুলিশকে বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করা হয়। বলা ভালো, এই ক্ষমতা প্রদান করতে দেশের মানুষই বাধ্য করে। কারণ দেশের সমস্ত নাগরিকের রাজনৈতিক শিক্ষা, বোধ এবং রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা এক নয়। না হওয়ার ফলেই সরকার বাধ্য হয়, উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে আইনি শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে এসে দেশের মানুষকে একটি সভ্য আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার কেন বাধ্য হচ্ছে এমন আইন করতে? আসলে এই বিভক্তিই প্রকটভাবে প্রমাণ করে, গণতান্ত্রিক সরকারের পুলিশের ক্ষেত্রে যে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে তা অত্যন্ত যৌক্তিক।  পৃথিবীর অনেক দেশ আছে, যেখানে পুলিশ রয়েছে কিন্তু তাদের কোনো কাজ নেই। অনেক দেশ রয়েছে, যেখানে আদালতে তেমন কোনো মামলা নেই। অপরাধীশূন্য জেলখানা রয়েছে অনেক দেশে। সেই দেশের জনগণকে শাসন বা আন্দোলন করতে কোনো ধরনের বাধা দেওয়া তো দূরের কথা, আন্দোলনের কোনো প্রয়োজনই পড়ে না। কারণ মানুষের চাহিদা, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সেই দেশের সরকার ভয়ংকরভাবে সচেতন। এই অভ্যাস একদিনে গড়ে ওঠেনি। তাদের শিক্ষাব্যবস্থাই এমন ছাঁচে তৈরি করা হয়েছে, সেখানে একজন নাগরিক খুব সহজেই রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্বশীল। ফলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোনো ধরনের আইন করতে হয় না। কিন্তু আমাদের দেশে প্রয়োজন হচ্ছে, কেন? এই ‘কেন’-এর মধ্যেই লুকিয়ে  রয়েছে আসল কারণ।

প্রথমেই স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানের কথা উল্লেখ করা দরকার। সেখানে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, নাগরিকের অধিকার সম্পর্কে। একইসঙ্গে সেখানে জনগণের দায়বদ্ধতার কথাও বলা আছে। সমাবেশের স্বাধীনতা সম্পর্কে সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে সভা-সমাবেশ করার অধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে তা জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইন দিয়ে আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপেক্ষে। এটি নিরঙ্কুশ নয়। সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুসারে সংবিধান ও আইন মান্য করা, শৃঙ্খলা রক্ষা করা, নাগরিক দায়িত্ব পালন করা, জাতীয় সম্পত্তি রক্ষা করা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য। শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। অর্থাৎ পুলিশের। জনশৃঙ্খলার স্বার্থেই মিছিল-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় বিভিন্ন কারণে। গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় আইনের প্রয়োগ এবং সামরিক নেতৃত্বে দেশ পরিচালিত হওয়ার সময় পরিস্থিতি এক নয়। এখানে ভুল করলে চলবে না। ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং ’৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে দেশের ষড়যন্ত্রমূলক দলীয় বর্তমান পরিস্থিতিকে এক পাল্লায় বিবেচনা করলে, বড় ধরনের ভুল হতে পারে। 

এবার ১৯৭৬ সালের কথা উল্লেখ করা দরকার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার পর, শাসকচক্র বাংলাদেশ পুলিশের আইনে প্রথম পরিবর্তন নিয়ে আসে। সেখানে অধ্যাদেশের ২৯ ও ১০৫ ধারায় পুলিশকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়। বলা হয়, মিছিল-মিটিং করতে পুলিশের কাছে থেকে বিশেষ অনুমতি নিতে হবে। ইংরেজিতে লেখা সেই আইনে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু এখনো সেই আইন বলবৎ রয়েছে। শুধু ইংরেজির পরিবর্তে হয়েছে- বাংলা। কিন্তু এই ২০২৩ সালে, মানে ৪৭ বছর পরও দেখা যাচ্ছে- সেই আইনের প্রয়োজন রয়েছে শতভাগ। কিন্তু প্রেক্ষাপট ভিন্ন। তখন ছিল, গণমানুষের প্রতিবাদের ভয় আর বর্তমানে হচ্ছে- স্বাধীনতাবিরোধী সেই স্বৈরাচারী দোসরদের পরবর্তী প্রজন্মের ধ্বংসলীলার ভয়। অহেতুক সামাজিক বিশৃঙ্খলা এবং নৈরাজ্যের ভয়। রাজনৈতিক বোধহীন এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যই পুলিশের এই আইনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে শতভাগ। এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই যে, সরকার পরিবর্তন হলেই পুলিশের এই আইন তুলে নেওয়া হবে। সেই নতুন সরকারও এই আইনকেই আরও কীভাবে পাকাপোক্ত করা যায়- সেই চেষ্টাই করবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি সেই কথাই বলে।

প্রকৃতপক্ষে আমাদের নিয়ন্ত্রণের জন্য আইন, মিছিল-সমাবেশের জন্য কোনো ধরনের পুলিশি আইনের দরকার হতো না। এই ধরনের আইন মানেই একটি সভ্য দেশের মানুষের নৈতিক পরাজয়। তবু এটা সমর্থন করতে হয় এই কারণে যে- আমরা আজও সভ্য হতে পারিনি। আজও পারিনি দেশকে ভালোবাসতে, মানুষকে ভালোবাসতে। যে কারণে অনিচ্ছা সত্ত্বেও এই ধরনের আইনকে সমর্থন করতে বাধ্য করে বাস্তবতা। যদি আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতাম, দেশের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতাম, মানুষকে ভালোবাসতাম এবং প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারতাম তাহলে এই ধরনের আইনের প্রয়োজন হতো না।

পৃথিবীর এমন অনেক দেশ আছে, যেখানে কোনো চুরি-চামারি নেই। রাতের বেলায় সেই দেশের মানুষ দরজা খুলেই ঘুমায়। বহু দেশে মেয়েরা গভীর রাতে বাসায় ফেরে। কোনো ধরনের সমস্যা হয় না। যা আমাদের দেশে কল্পনাও করা যায় না। আমরা নানাবিধ ক্ষেত্রে পাশবিক, নির্মম ও হিংস্র বলেই আইনের দরকার হয়। এর মাধ্যমেই আমরা নিয়ন্ত্রিত হতে থাকি। এটা সত্যি, বিষয়টি মানবতার পরাজয়। যেহেতু সব কিছু মানুষকে ঘিরেই তৈরি হয়, তাই মানুষের আচরণ এবং প্রকৃতি বিবেচনা করেই আইনের দরকার পড়ে। যদি তাই না হতো, তাহলে মানুষের স্বভাব বা চরিত্রকে নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো আইনের সৃষ্টি হতো না। এটা কোনো সরকারের সমস্যা নয়। সমস্যাটা শতভাগ জনগণের। যেহেতু জনগণের মধ্যে থেকেই উঠে আসে সরকার, সেহেতু এই রাষ্ট্রীয় সমস্যাকে শুধু সরকারের বা বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের ওপর দায় চাপালে হবে না। আগে নিজেকে সংশোধন করতে হবে। প্রকৃত মানবিক শিক্ষায় নিজেকে উন্নীত করতে পারলে, শুধু এটি কেন আরও অনেক ধরনের আইন রয়েছে, যার কোনো প্রয়োজনই হবে না। মানুষের বিকৃত রুচি, লোভ এবং হিংসাত্মক মনোভাবকে নিয়ন্ত্রণের জন্যই দরকার হয় রাষ্ট্রীয় আইনের। তবে এই ধরনের আইনের উপস্থিতিই প্রমাণ করে, আমরা সভ্যতার কোন স্তরে অবস্থান করছি?

কোনো সরকার ব্যবস্থাতেই, সরকারে থাকা একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে পুলিশকে দেওয়া এই ধরনের আইনের পরিবর্তন সম্ভব নয়। শুধু মিছিল-মিটিং নয়, এমন অনেক বিষয় রয়েছে যা সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই পরিবর্তন করতে হবে। যে দলই সরকার গঠন করুক, তারা চাইবে পুলিশ প্রশাসন তাদের নির্দেশমতোই চলুক। যেহেতু ‘পুলিশ’ সরকারি কর্মচারী, সেহেতু সরকারের নির্দেশ মতোই তাকে কাজ করতে হবে। অবশ্য এক্ষেত্রে ‘সময় এবং ‘পরিবেশ’ গুরুত্বপূর্ণ। ভাবতে হবে, কখন কোন সময়ে কোন ধরনের আইনের প্রয়োজন সমাজে। সেই বিবেচনাতেই তৈরি হয় ‘আইন’। এখন তার প্রয়োগ কীভাবে হবে- সেটা একেবারেই নির্ভর করে বাস্তবতার ওপর।

বর্তমানে পুলিশ বাহিনীর অধ্যাদেশে যে আইন রয়েছে মিছিল-সমাবেশ সংক্রান্ত ,তা পরিবর্তনের রাজনৈতিক চাহিদা তৈরি হয়নি। এই আইনের বহুমাত্রিক প্রয়োজন এখনো রয়েছে। যখন দেশের মানুষ অধিকাংশ সভ্য হবেন, দেশকে ভালোবাসবেন, বাঙালি সংস্কৃতিকে ভালোবাসবেন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদকে নিজের বলে ভাববেন- তখন এই ধরনের আইন আপনাতেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। একইসঙ্গে সরকারকেও ভাবতে হবে- সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে কি না? যদি তা না হয়, জনগণকেই তার আচরণের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে-  কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমাবেশে পুলিশি অনুমতির প্রয়োজন নেই। মজার বিষয় হচ্ছে, এখনো যে সমস্ত সভা সমাবেশ হচ্ছে- তা কিন্তু পুলিশের দেওয়া বিভিন্ন শর্ত  মেনে নিয়েই তা করতে হচ্ছে। এই ধরনের শর্ত মেনে নেওয়ার অর্থই হচ্ছে- আগে যা হয়েছে, হয়েছে এখন হবে না। আপনাদের শর্তে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।

আমরা যখন সভ্য হব, তখন এই ধরনের আইন বাস্তবতা বিবর্জিত বলেই গণ্য হবে। কিন্তু তার আগে না। সরকারকে দোষারোপ না করে, নিজেকে সভ্য হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের মূল দায়িত্ব। এই দায়িত্ববোধ কীভাবে জন্ম নেবে, সেটা অবশ্য নির্ভর করে আমাদের পরিবার, শিক্ষাব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক মূল্যবোধের ওপর। শুধু শুধু সরকারের কাঁধে দোষ চাপালে, সমস্যা আরও জটিল হবে, সমাধান তো দুরস্ত!

লেখক: সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত