বর্তমানে ‘নারীর ক্ষমতায়ন’, ‘নারীর উন্নয়ন’ এ প্রপঞ্চগুলো নানা পরিসরে বেশ আলোচিত। ঘরের বাইরের কাজে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ তারই প্রতিফলন। কিন্তু কাঠামোগত সামাজিক, সাংস্কৃতিক বৈষম্য এসব উদ্যোগের ইতিবাচক প্রভাবের পথে প্রধান অন্তরায়। আমরা জানি, বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় একজন নারীকে তার সন্তান এবং পরিবারের প্রতি পুরুষের তুলনায় বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হয়। এসব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে একজন নারী যখন কাজের জন্য বাইরে বের হন তখন তার ‘যাত্রাপথ’ কতটুকু মসৃণ থাকে?
কেবল রাজধানী ঢাকার দিকে দৃষ্টি দিলেই দেখা যায় গণপরিবহন সংকট, গণপরিবহনে নারীকে যৌন নিপীড়নসহ নানা ধরনের নিরাপত্তাজনিত ‘পথের কাঁটা’ সবসময় তীব্রভাবে উপস্থিত। গণপরিবহনের এসব ভোগান্তি নারীদের কর্ম, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ‘নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক’ শীর্ষক ব্র্যাকের এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশে গণপরিবহনে যাতায়াতকালে হয়রানির শিকার হওয়া ৯৪ শতাংশ নারীর ৮১ শতাংশই কোনো প্রতিবাদ করেন না। এই বিষয়গুলো নারীকে গণপরিবহন ব্যবহারে অনুৎসাহিত করে তোলে।
গত ২৫ জুলাই ২০২৩ তারিখে দেশের অন্যতম একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ‘শ্রমশক্তিতে শহরের নারীদের অংশগ্রহণ কেন কমছে’ শীর্ষক একটি উপসম্পাদকীয়তে উঠে এসেছে গণপরিবহনের এসব সংকট শহরের নারীদের ঘরের বাইরের কাজ থেকে পিছু হটতে বাধ্য করছে। এক্ষেত্রে মিরপুর থেকে মহাখালীগামী এক চাকরিজীবী নারীর বক্তব্য উল্লেখ করা যায় ‘রোজ সকালেই বাসার মধ্যে হুলুস্থুল হয়। কোনো রকমে নাস্তা গুছিয়ে নিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হই। আরাম করে বসে নাস্তা করতে গেলেই অফিসের বাসটা মিস হবে। রোজ সকালে এই এক ভয়! অফিসের বাস মিস করলেই লোকাল বাসের পেছনে দৌড়াতে হবে। বাসে মহিলা তো তুলতে চায়ই না, আবার মহিলারা স্টপেজে দাঁড়ালে সেখানে বাস থামাতেও চায় না। অফিসের বাস না পেলে চাকরিটা নিয়েও আরেকবার ভাবতে হতো।’
ঢাকার মতো শহরে গণপরিবহনের তীব্র অপ্রতুলতা ভোগায় নারী-পুরুষ সবাইকেই, আর অফিসে যাওয়া-আসার সময় তা চরমে ওঠে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জন্য বাসে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাদুড় ঝোলা হয়ে যাতায়াত করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। বাসের বিশ টাকার ভাড়ার পথ সিএনজি বা রাইড শেয়ার বাইকে ২০০-২৫০ টাকা। দৈনিক যাতায়াতের এই ব্যয়ভার বহন করা তাদের জন্য কল্পনার অতীত। তবে কর্মস্থলে যাতায়াতের পথটা পুরুষের তুলনায় নারীর জন্য আরও কণ্টকময় হয় যখন বাসগুলো নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দকৃত ৯টি আসন ভরে গেলে বাসে আর কোনো নারী তুলবে না বলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করে। (এমন উদাহরণও কম নেই যেখানে ওই সব সংরক্ষিত আসনও সুস্থ ও প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের দখল করে রাখতে দেখা যায়। প্রতিবাদ ও সিট ছাড়তে বললে উল্টো প্রতিরোধ আসে। সংরক্ষিত এসব আসন নিয়ে বাহাস, বচসার ঘটনার কথাও সবার জানা)।
অন্যদিকে, গণপরিবহনের চরিত্র এমন দাঁড়িয়েছে যে, ধরেই নেওয়া হয় নারীরা দ্রুত ওঠানামা করতে পারবে না, দাঁড়িয়ে যেতে পারবে না এমনকি, পুরুষের তুলনায় তার জায়গা বেশি লাগবে। অবস্থা আরও ভয়াবহ হয়ে যায় যখন কোনো নারী নিজের সঙ্গে সন্তান বহন করেন। সঙ্গে বাচ্চা দেখলে তাকে বাসে উঠতে দেওয়া যাবে না এমন একটা মনোভাব অধিকাংশ বাস সুপারভাইজারের মধ্যে কাজ করে। যেখানে অফিসের সময়ে প্রত্যেকটি বাসে গড়ে ৩০ এর বেশি পুরুষ যাতায়াত করে, সেখানে নারীদের ওই ৯টি আসনে সীমাবদ্ধ করে দিয়ে তার যাত্রাটা আরও দুর্বিষহ করে তোলা হয়। তার ওপরে বাসে নারীদের জন্য বরাদ্দকৃত ৯টি আসনও থাকে চালকের পেছনে, ইঞ্জিনের ওপরে; যেখানে সবসময় প্রচ- তাপ থাকে যা মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নাহিদা (ছদ্মনাম) বলেন, প্রতিদিন সকাল এবং বিকেলে বাসে ওঠার কথা ভাবলে প্রচ- মানসিক চাপ কাজ করে। প্রায় প্রতিদিন অফিসের তাড়াহুড়া মাথায় নিয়ে যখন বাসের জন্য দাঁড়াই, আমার সামনে দিয়ে দুই-তিনটা বাস চলে যায় অথচ আমাকে উঠতে দেওয়া হয় না। তাদের এক কথা ‘মহিলা নেওয়া যাবে না, সিট নাই’।
অথচ একই জায়গা থেকে পুরুষদের ঠিকই তোলা হয়। জোর করে উঠতে গেলে বাসে থাকা পুরুষ এবং বাসের স্টাফরা এমনভাবে প্রত্যাখ্যান করেন যে খুব অপমানিত লাগে। কিন্তু অফিসে তো শুধু পুরুষরা যায় না, দেরি তো আমাদেরও হয়, তাই না? এজন্য প্রতিদিনই সময়ের আগে বাসা থেকে বের হয়ে আসি। প্রতিদিন এই বাসে ওঠাটা একটা যুদ্ধের মতো লাগে, খুবই ডিমোরালাইজড হয়ে যাই মাঝে মাঝে।
এই অভিজ্ঞতা শুধু নাহিদার নয়, চাকরিজীবী অসংখ্য নারীর নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতা যে কত অস্বস্তিকর, তা ভুক্তভোগী নারীর চেয়ে ভালো আর কে জানে? নিজেদের একটা অভিজ্ঞতা বলি একদিন সকালে মিরপুর থেকে বাড্ডাগামী বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরে বাস স্টপেজে আসতেই যেই উঠতে যাব তখন হেলপার একরকম হাত দিয়ে দরজা আটকে বলল ‘পরের বাসে আসেন, উইঠেন না। মহিলা সিট নাই’। হেলপারকে জিজ্ঞেস করলাম ‘মহিলা তুলবেন না কেন? মহিলারা স্কুল-কলেজে, অফিসে যাবে না?’ হেলপারের স্পষ্ট জবাব ‘এক মহিলার জায়গায় ৪ জন পুরুষ নিতে পারুম। তাইলে মহিলা নেওয়া আমার ক্ষতি না?’
এই লাভক্ষতির হিসাবের চক্করে গণপরিবহন খাত যে একটি সেবামূলক খাত সেটা বাংলাদেশের সবাই ভুলতে বসেছে। এখন তা পরিণত হয়েছে গণভোগান্তি হিসেবে, বিশেষ করে নারীদের জন্য। প্রতিদিন সকালে বিভিন্ন বাস স্টপেজে দাঁড়ালেই এসব ভয়াবহ চিত্র দেখতে পাওয়া যায়। এটি গণপরিসর থেকে নারীদের দূরে ঠেলে দেওয়ার যে প্রক্রিয়া, তারই একটি অংশ।
যদিও ঢাকা শহরের গণপরিবহনের সমস্যা শুধু নারীকে নয় সব লিঙ্গের মানুষকেই যথেষ্ট ভোগায়। যেহেতু পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল শহরের একটি হচ্ছে ঢাকা, তাই এখানে গণপরিবহন বাড়ানো এই সমস্যা সমাধানের পথে অন্যতম উদ্যোগ হতে পারে। এছাড়া বর্তমানে বিদ্যমান বৈষম্য কমাতে সরকারি উদ্যোগে নারীদের জন্য সব রুটে নারীবান্ধব গণপরিবহন চালু করা যেতে পারে, যার উদ্যোগ আগে নেওয়া হলেও কার্যত তা অকার্যকর হয়ে আছে। সরকারি উদ্যোগে নারীদের জন্য পৃথক ডাবল ডেকার বাসের আয়োজন আছে বলা হলেও প্রকৃত অর্থে তা প্রায় দৃশ্যমান নয় বলেই ভুক্তভোগীরা জানান।
ঢাকা সিটি করপোরেশন তথ্য ও বিআরটিএ হিসাব অনুযায়ী, মোট ১ হাজার ৫২৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ঢাকায় ২ হাজার ৫৫০ বর্গকিলোমিটার সড়কে ১৬৮টি রুটে চলাচলকারী বাসের সংখ্যা ৫ হাজার ৪০৭টি। এর মধ্যে মিনিবাস ৩ হাজার ১২৬টি। গত কয়েক বছরে সরকারি উদ্যোগে নারীদের জন্য কিছু বাস নামানো হলেও বেসরকারি উদ্যোগে তেমন কোনো বাস সার্ভিস শুরু হয়নি। বেসরকারিভাবেও নারীদের জন্য পরিবহন নামালে আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া যেতে পারে। এ ধরনের কাঠামোগত উদ্যোগের পাশাপাশি
সাংস্কৃতিকভাবে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক মনোভাবের পরিবর্তনও জরুরি। আগেও এই বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা হলেও কার্যকরী কোনো উদ্যোগ না থাকায় এবং ঢাকার নিয়ত বর্ধমান জনসংখ্যার দরুন সংকটটি বেড়েই চলেছে। সুতরাং এ বিষয়ে বারবার আওয়াজ তোলার প্রয়োজনীয়তাও থেকেই যায়।
লেখক: লেখকদ্বয় ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-এর গবেষক
