নিরুত্তাপ নিরুৎসাহের নির্বাচন

আপডেট : ২১ জুন ২০২৩, ০৪:৩১ এএম

গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটের যে আমেজ দেখা গিয়েছিল সেটা খুলনা ও বরিশালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ফিকে হয়ে গেছে। গাজীপুরের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন ভোটারের আস্থা ফেরানোর চেষ্টার আভাস দিলেও বরিশালে বিতর্কিত হয়েছে। ওই নির্বাচনের পর বাকি দুই সিটি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। সেই দুই সিটি সিলেট ও রাজশাহীতে আজ ভোট। ফলে এই দুই সিটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতার যেটুকু সম্ভাবনা ছিল সেটাও আর নেই। এ অবস্থায় সিলেট ও রাজশাহীর নির্বাচন এক প্রকার আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হয়েছে।

রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেয়নি। সে কারণে ভোটে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার কথা সেটা আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল।

তার পরও পাঁচটি সিটিতে ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় পার্টি, বিএনপি পরিবার ও আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী ঘিরে মেয়র পদে লড়াইয়ের আভাস ছিল। কিন্তু আজকের ভোটে রাজশাহী ও সিলেট মেয়র পদে উত্তাপ-উত্তেজনা নেই। যেটুকু উত্তাপ সেটা কাউন্সিলর প্রার্থীদের ঘিরেই। এ কারণে ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, মাঠে শক্ত বিরোধী পক্ষ না থাকায় ভোট প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন হবে। যে কারণে ভোটকেন্দ্রে ভোটার আনাই চ্যালেঞ্জ।

বিশ্লেষকদের মতে, শক্তিশালী দুই পক্ষ জেতার জন্য মরিয়া থাকে। এবার বলার মতো কোনো পক্ষই নেই। রয়েছে ক্ষমতাসীনরা। ‘ডাউট অব বেনিফিট’ তারা পেয়ে আসছে। রাজশাহী ও সিলেটে সেটারও দরকার হবে না।

গত ২৫ মে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হয়েছে।

সেখানে ভোটের দিন উল্লেখযোগ্য সহিংসতার কোনো ঘটনা ঘটেনি। এরপর ১২ জুন হয়েছে বরিশাল ও খুলনা সিটির নির্বাচন। বরিশালে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী সৈয়দ মোহাম্মাদ ফয়জুল করীমের ওপর হামলা হয়। এরপর দলটি বাকি দুই সিটি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ ঘরানার দুই পক্ষের মধ্য ভোটযুদ্ধ হওয়ায় বরিশাল ও খুলনার তুলনায় গাজীপুরের ভোট নিয়ে মানুষের আগ্রহ ছিল তুলনামূলক বেশি। একদিকে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী, অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত সাবেক মেয়রের মা। বিএনপি পরিবারের এক সদস্যও প্রার্থী হয়েছিলেন। ফলে একটা উত্তেজনা ছিল। ওই ভোটে নৌকার প্রার্থীকে হারিয়ে সাবেক মেয়রের মা জায়েদা খাতুন নতুন মেয়র নির্বাচিত হন। গাজীপুরে ভোট পড়েছিল ৪৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

বরিশালেও বিএনপি ঘরানার একজন প্রার্থী ছিলেন। আবার ইসলামী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা চরমোনাই পীরের শক্তিশালী অবস্থান বরিশালেই। সেখানে ভোট পড়েছিল ৫১ দশমিক ৪৬ শতাংশ। খুলনার নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় না থাকলেও ৪৮ শতাংশ ভোট পড়েছিল। অর্থাৎ তিন সিটিতে গড়ে ৫০ শতাংশও ভোট পড়েনি। এ অবস্থায় বাকি থাকা দুটি সিটিতে ভোটের হার নিয়ে খুব একটা আশাবাদী হতে পারছেন না বিশেষজ্ঞরা।

এ ছাড়া ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ধীর গতি, বৈরী আবহাওয়া এবং ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও ভোটার উপস্থিত কম হওয়ার পেছনে কাজ করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বরিশালে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ওপর হামলার ঘটনা নির্বাচনী আমেজ স্নান করে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাজশাহী ও সিলেটে নির্বাচন হচ্ছে। রাজশাহীতে একজন সহকারী রিটার্নিং অফিসার একজন কাউন্সিলরের বাসা গিয়ে উৎকোচ নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে সেখানে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে। সিলেটে ক্ষমতাসীন প্রার্থী একজন প্রবাসী। নির্বাচনে অংশ নিতে কিছু তথ্য দিতে হয়। সেখানে কিছু গরমিল রয়েছে। এ নিয়ে আবার আদালতে রিট হয়েছে। এখন তিনি যদি জয়ী হন, আবার আদালত সেটি বাদ করে দেয় তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে যাবে। সব মিলিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, বৃষ্টি ও ইভিএমে ধীরগতির বিষয়গুলোও সামনে চলে আসবে। ফলে ভোটার উপস্থিতি ও কেমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে সেটি অনুমেয়।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশনের সবচেয়ে বড় আয়োজন ছিল পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচন। ইতিমধ্যে গাজীপুর, বরিশাল ও খুলনা সিটি নির্বাচন শেষ হয়েছে। নির্বাচন কমিশন বলছে, তারা সুষ্ঠু ভোটের জন্য আন্তরিক ছিলেন। সবাই অংশ নেয়নি সেটা ভিন্ন বিষয়। তিনটি সিটি নির্বাচন নিয়ে বড় ধরনের কোনো বিতর্ক ছিল না। সেজন্য বাকি দুই সিটিতেও কমিশন ইমেজ নষ্ট হতে দিতে চায় না। ফলে তারা তৎপর থাকবে।

জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সুষ্ঠু ভোটের জন্য কমিশনের আন্তরিকতার কোনো কমতি নেই। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সিটি নির্বাচনগুলো বড় ধরনের কোনো সহিংসতা ছাড়া হওয়ায় সবাই খুশি। বাকি নির্বাচনগুলোও যাতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, সে ব্যাপারে কমিশন তৎপর।

নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সাধারণ ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানিয়েছেন, তারা মনে করছেন মেয়র পদে নির্বাচন হবে একতরফা। সরকারি দলের প্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী বড় ব্যবধানে জিতে যাবেন। প্রায় এক মাস আগে বর্তমান মেয়র, বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরী যেদিন নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন, সেদিনই মেয়র নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার আমেজ হারিয়ে যায়।

সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ইলেকশন মেন্যুভারিং আর্কিটেকচার (সিমা) নামে ইউরোপভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান দাবি করেছে, তারা সিলেটে জরিপ চালিয়ে দেখেছে এখানে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে জয়ী হবেন। গত রবিবার গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তারা এ তথ্য জানায়।

আনোয়ারুজ্জামানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) নজরুল ইসলাম বাবুল। মেয়র পদে অন্য পাঁচ প্রার্থী হলেন জাকের পার্টির জহিরুল আলম, স্বতন্ত্র আবদুল হানিফ কুটু, শাহজাহান মিয়া, ছালাহ উদ্দিন রিমন ও মোস্তাক আহমেদ রউফ।

এদিকে সিলেটের টানা বৃষ্টি আজ ভোটের আনন্দে বাগড়া দিতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে সিলেটে বৃষ্টি হচ্ছে। কখনো ভারী, কখনো হালকা। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী আজও সিলেটে প্রচুর বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে ভোটার উপস্থিতি কমে যেতে পারে বলে প্রার্থীরা আশঙ্কা করছেন। এ ছাড়া কয়েকটি কেন্দ্রে জলাবদ্ধতার আশঙ্কাও রয়েছে। জলাবদ্ধ ভোটকেন্দ্রের পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও ফায়ার সার্ভিসকেও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

সিলেটে ১৯০টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৩২টি ঝুঁকিপূর্ণ। গতকাল মঙ্গলবার সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার মো. ইলিয়াছ শরিফ সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছেন, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন আয়োজন করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। ভোটে সহিংসতার চেষ্টা করলে কেউই রেহাই পাবে না।

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী জানিয়েছেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মুরশিদ আলম ভোট বর্জন করায় ভোটের প্রচারে ভাটা পড়ে। অবশ্য এককভাবে নৌকার প্রচারে কোনো ঘাটতি ছিল না। নগরীর প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় ব্যাক প্রচার চালান আওয়ামী লীগের দলটির নেতাকর্মীরা। নৌকার প্রার্থী খায়রুজ্জামান লিটন প্রতিদিনই দুবেলা গণসংযোগ করেছেন, শহর জুড়ে হয়েছে মাইকিং, পুরো নগরী ছেয়ে গেছে নৌকার পোস্টার আর ব্যানারে। দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মী নৌকার প্রচারে অংশ নেন। অন্যদিকে, বাকি তিন প্রার্থীর পোস্টার-ব্যানার এখনো সেভাবে চোখে পড়ে না। মাইকিং হয়েছে খুবই সীমিত পরিসরে। যদিও জাতীয় পার্টির প্রার্থী সাইফুল ইসলাম স্বপন এবং জাকের পার্টির লতিফ আনোয়ারের বক্তব্য তারা গণসংযোগকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার চালিয়েছেন। ভোটের মাঠ সম্পর্কে তারা ইতিবাচক। কোনো অভিযোগও নেই তাদের।

আগের দুই মেয়াদের মেয়র আওয়ামী লীগের এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। তিনি বলেছেন, কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে জোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস রয়েছে। এ কারণে ভোটার উপস্থিতিও ভালো হবে।

রাজশাহীতে ১৫৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৪৮টি ঝুঁকিপূর্ণ। রাজশাহী মহানগর পুলিশের কমিশনার আনিসুর রহমান গতকাল রাজশাহী পুলিশ লাইনস মাঠে ভোটের প্রস্তুতি নিয়ে ব্রিফিং করেন। তিনি বলেছেন, ভোটে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে অতীতে যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এবার নির্বাচন হবে মডেল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত