সফর মোদির আলোচনায় বাংলাদেশ

আপডেট : ২১ জুন ২০২৩, ০৪:৩৪ এএম

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তিন দিনের সফরে আজ যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন। মোদির এ সফরকে ল্যান্ডমার্ক হিসেবে বর্ণনা করছে ভারতীয় গণমাধ্যম। কারণ এই প্রথমবারের মতো বাইডেন সরকার ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিচ্ছে। যা এর আগে অন্য কাউকে দেওয়া হয়নি বলে কূটনীতিক সূত্রে বরাত দিয়ে গণমাধ্যম জানাচ্ছে। মোদির এ সফর ঘিরে এশিয়ার অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেরও আগ্রহ রয়েছে।

এর কারণ নির্বাচন কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের নিরন্তর চাপ শুধু বাংলাদেশকেই নয়, ভারতকেও খানিকটা অস্বস্তির মধ্যে ফেলেছে। গত ২৪ মে ঘোষণা করা যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসানীতির মধ্য দিয়ে নির্বাচন নিয়ে দেশটির চাপের প্রতিফলন ঘটেছে। ওই নীতির রূপায়ণ, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে তার সম্ভাব্য প্রভাব এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন ভারতের অস্বস্তি ও চিন্তার কারণ।

এর আগে ২০২১ সালে র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরও বাংলাদেশ এ বিষয়ে ভারতকে নিজের পাশে চেয়েছিল। এখন আবার যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসানীতি নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক মহল পরস্পরের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছে। বাংলাদেশকে এ বিষয়ে আশ্বস্তও করা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র সফরে এ নিয়ে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি অবশ্যই মতবিনিময় করবেন।

সম্প্রতি ভারতের উত্তর প্রদেশের বারানসিতে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন। সেখানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে তার একান্ত বৈঠক হয়। নির্বাচন, নতুন ভিসানীতি, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘চাপ’ নিয়ে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে বিস্তারিত কথা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভানের সঙ্গে গত সপ্তাহে নয়াদিল্লিতে বৈঠক করেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল। ওই বৈঠকে তাকে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া ঠিক হবে না, যাতে ভারতের স্বার্থ বিনষ্ট হয় ও আঞ্চলিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। ভারতের এ স্পষ্ট অভিমত বাংলাদেশকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দুই দেশের কূটনৈতিক মহলের খবর। এরও আগে জয়শঙ্করের সঙ্গে দিল্লিতে বৈঠক করেছিলেন ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মুস্তাফিজুর রহমান। সেই বৈঠকেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নতুন ভিসানীতি এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। নতুন ভিসানীতি ঘোষণার পর বাংলাদেশকে ভারতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহল বারবার আশ্বস্ত করে বলেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র সফর চলাকালে প্রধানমন্ত্রী মোদি সর্বোচ্চ স্তরে অবশ্যই বিষয়টি উত্থাপন করবেন।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ উদ্ভূত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এশীয় অঞ্চল এবং ভারত অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র বড় একটি মিত্রবলয় গড়ে তুলতে চায়। তাই ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এবার কদর বেশি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মোদির এ সফর শুধু এশিয়া নয়, এটা বিশ্বরাজনীতিতে নতুন মেরূকরণেরও একটা বার্তা হতে পারে। বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসানীতি ঘোষণা, শ্রমিক অধিকার ও কর্মপরিবেশ এবং বাংলাদেশের শ্রম আইনের সংস্কারসহ বিভিন্ন ইস্যু যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতায় কিছুটা চাপে রয়েছে সরকার।

নির্বাচন ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের এ তৎপরতা এবং নতুন ভিসানীতির বিষয়টি সমাধানে ভারতকে পাশে চায় ঢাকা। মোদির যুক্তরাষ্ট্র সফরে ঢাকা-ওয়াশিংটনের মধ্যকার টানাপড়েনের ইতিবাচক সমাধানের দিকে তাকিয়ে আছে বাংলাদেশ।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে পাশে চায়। সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক বাংলাদেশের এ পররাষ্ট্রনীতির প্রভাব ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের রূপরেখায় রয়েছে।

তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক রয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভ্রাতৃত্বের। ভূরাজনৈতিক বিবেচনায় বাংলাদেশও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া ও মানবাধিকার ইস্যুতে গত দুই বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র এই আওয়ামী লীগ সরকারকে চাপে রেখেছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থানকে সমর্থন জানিয়েছে চীন। পরদিন ভারতের একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশকে সমর্থন দেওয়ার দৌড়ে ভারতের চেয়ে এগিয়ে গেল চীন।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মোদির যুক্তরাষ্ট্র সফরে বাংলাদেশের বিষয়টি আলোচনায় আসবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র বা চীন কিংবা অন্য যেকোনো দেশ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পরামর্শ দেবে বা নাক গলাবে আর ভারত তা শুধুই দেখবে বা শুনবে, তা তো হতে পারে না।

জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র সফরে কাল বৃহস্পতিবার (২২ জুন) মোদি মার্কিন কংগ্রেসে ভাষণ দেবেন। যা ভারতের কোনো প্রধানমন্ত্রীর জন্য এটা দ্বিতীয়। প্রথমও ছিল নরেন্দ্র মোদির জন্যই। এদিন মোদির সম্মানে নৈশভোজে থাকবেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ফার্স্টলেডি জিল বাইডেন। পরদিন শুক্রবার ওয়াশিংটনের রোনাল্ড রিগ্যান ভবন ও ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সেন্টারে স্থানীয় ভারতীয়দের উদ্দেশে ভাষণ দেবেন মোদি। এ ছাড়া মোদি ও বাইডেনের মধ্যে একান্ত বৈঠক হবে। ওই বৈঠকেই বাংলাদেশের বিষয় এবং অন্যান্য আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হাসান বলেন, মোদি ও বাইডেনের বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় ইস্যুর পাশাপাশি বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। ভারত চাইবে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র চাপ দেওয়া বা বেশি পরামর্শ দেওয়া থেকে বিরত থাকুক। কারণ যেভাবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে দুই চিরশত্রু ভারত ও চীনের স্বার্থ অনেকটাই একরকম। ঠিক বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনসহ বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোতে দুই দেশের স্বার্থ রয়েছে।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ওয়ালি উর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, মোদির যুক্তরাষ্ট্র সফরের আগে আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন সফরকে ঘিরেই তো নতুন মেরূকরণের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এ অঞ্চল ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র একটা মিত্রবলয় গড়ে তুলতে চায়। ভারতের সঙ্গে মিত্রতা থাকলেও আবার পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের মিত্রতা রয়েছে। সেখানে দেখা গেছে ভারত পাকিস্তান চিরশত্রু। আবার চীন ও ভারতের সম্পর্ক একেবারেই বিরোধপূর্ণ। এদিকে রয়েছে মিয়ানমার যা চীনের নিয়ন্ত্রণে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে পাশে চায়। ভারতও চাইবে না যুক্তরাষ্ট্র তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু দেশ বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে অন্য কেউ বেশি কর্তৃত্ব করুক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত