দেশের জন্য অস্ত্র ধরেছিলেন নুর ইসলাম। দেশ স্বাধীন করেছেন। তবে এ গৌরব নিয়ে বসে থাকেননি তিনি। মন দিয়েছিলেন সামাজিক, সাংগঠনিক নানা কাজে। অকস্মাৎ তার কর্মযজ্ঞে ভাটা পড়ে। এক সকালে ফজরের নামাজ পড়ে বাসায় ফেরার পথে এক দানবীয় বাহন রক্তাক্ত করে তাকে। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে তার ওপর রুক্ষতা এঁটে দিয়েছে দেশের বেসরকারি চিকিৎসাব্যবস্থা। হয়তো অনেক অভিযোগ নিয়ে অনন্তযাত্রা হয়েছে এ মুক্তিযোদ্ধার।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবারের সদস্যরা দেশ রূপান্তরকে জানান, নুর ইসলাম (৭০) গত ৭ আগস্ট ফজরের নামাজ শেষে ফেরার পথে যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন। ঘটনাস্থলে থাকা কয়েকজন যুবক মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে নিয়ে যান স্থানীয় স্পেশালাইজড মেডিকেল কেয়ার হাসপাতালে। সেখানে তাকে ৪০ মিনিটের বেশি সময় রাখা হলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। পরে এক আত্মীয় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন। পথেই তার মৃত্যু হয়।
মুক্তিযোদ্ধা নুর ইসলামের মতো সারা দেশে অসংখ্য মানুষের প্রাণ নিভছে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর দায়িত্বহীন কান্ডে। ‘পুলিশ কেস’, ‘আইনি ঝামেলা আছে’ প্রভৃতি কথা বলে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে মুমূর্ষু রোগীদের। সর্বোচ্চ আদালতের আদেশের পরও বদলায়নি তারা। নানা অজুহাতে দুর্ঘটনায় আহত বা অপরাধীদের আক্রমণে মারাত্মক আহত রোগীদেরও ফিরিয়ে দিচ্ছে তারা দ্বিধা ছাড়াই।
মুক্তিযোদ্ধা নুর ইসলামের চিকিৎসাবিষয়ক কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে পারেনি স্পেশালাইজড মেডিকেল কেয়ার হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ। তবে একাধিকবার চেষ্টার পর কথা হয় মার্কেটিং ম্যানেজার মো. শরীফের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা তাকে ফিরিয়ে দিইনি। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। পরিবারের ইচ্ছায় তাকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়।’
ওই হাসপাতালের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনায় আহত রোগীরা এখানেই চিকিৎসার জন্য আসেন। কম আহত রোগীদের এখানে চিকিৎসা দেওয়া হয়। গুরুতর আহত রোগীকে দেওয়া হয় না, বরং তাকে অন্য হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।’ ওই ঘটনায় হাসপাতালটির বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছে নুর ইসলামের পরিবার।
বেসরকারি সব হাসপাতালের এক চিত্র আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে বেসরকারি হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়টি যাচাই করা হয়। দেখা যায়, প্রায় সব হাসপাতালেই রোগীকে ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীতে ৫২০টি বৈধ জেনারেল হাসপাতাল আছে। সবটিতেই আহত রোগীকে চিকিৎসা করার প্রাথমিক সক্ষমতা আছে। কিন্তু চিকিৎসা পায় না গুরুতর আহতরা।
রাজধানীর হাতিরঝিলে গত ১৩ জুলাই ভিক্টর পরিবহনের বাসের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন কলেজ শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান (২৪)। তাকে নেওয়া হয় পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে। তাকে চিকিৎসা না দিয়ে ঢামেক হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। ততক্ষণে তিনি মারা যান। জাহিদ চীনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএসসি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং দ্বিতীয় বর্ষে অনলাইনে ক্লাস করতেন। ২৫ আগস্টের আগেই চীনে যাওয়ার কথা ছিল তার। তাকে এবং দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা না দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন জেনারেল ম্যানেজার নুরুল ইসলাম তুহিন। তিনি বলেন, ‘প্রচুর ডেঙ্গু রোগী আসছে। আমরা অন্যদের জায়গা দিতে পারছি না। সমস্যায় না পড়লে আমরা সাধারণত রোগী ফিরিয়ে দিই না।’
১৭ জুলাই রাতে খিলক্ষেত ৩০০ ফিট এলাকায় মোটরসাইকেলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আহত হয় দুই কিশোর। দুজনের একজন গুরুতর আহত হয়। পাশের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। আরও একটি বেসরকারি হাসপাতাল ঘুরে তাদের যেতে হয় ঢামেক হাসপাতালে। তবে যথাসময়ে চিকিৎসার অভাবে সেখানে যাওয়ার আগেই মারা যায় রাতুল কাজী।
হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দুর্ঘটনায় আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসার বিষয়টি তারা বিবেচনা করেন। গুরুতর আহতদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে নানা জটিলতায় পড়তে হয় তাদের। গুরুতর আহত রোগী মারা গেলে পরিবারের সদস্যরা অনেক ক্ষেত্রে ভুল বুঝে হাসপাতাল ভাঙচুর করে। টাকা পরিশোধ করতে চায় না। এসব ঘটনায় মামলা হলে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। কখনো চিকিৎসা দিতে পুলিশের অনুমতি নিতে হয়। ফলে জটিলতা এড়াতে চিকিৎসাদানে মালিকপক্ষ কড়াকড়ি আরোপ করে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গুরুতর আহত রোগীদের পাঠানো হয় ঢামেক হাসপাতালে। যানজটের কারণে হাসপাতালে যাওয়ার আগেই অসংখ্য প্রাণ নিভছে। ঢামেক হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, আহত রোগীদের অধিকাংশই স্থানীয় বেসরকারি হাসপাতালে যায়নি চিকিৎসা পাবে না বলে। যারা গিয়েছে তাদের বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার চিকিৎসা সরকারি হাসপাতালে ভালো হয়। তাদের কাছে আহত রোগীর চিকিৎসা নেই।
ঢামেকে রাজধানী ও আশপাশের জেলা ছাড়াও দূরবর্তী জেলার রোগীরা রয়েছে। ওইসব এলাকার বেসরকারি হাসপাতালগুলোও তাদের একই কথা বলেছে। গত সপ্তাহে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া এলাকায় ছিনতাইকারীর ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হন স্থানীয় ব্যবসায়ী দিল মোহাম্মদ। ওই এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে পুলিশ কেস বলে ঢামেকে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। তিনি ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
চিকিৎসা দিতে সমস্যা কোথায়?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রথমত পুলিশে কেস হতে পারে বা পুলিশ কেস হয় সেসব রোগীর বিষয় সাধারণত দীর্ঘকাল ধরে চলে। বেসরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যারা কর্মরত থাকেন তাদের এতবার নানা জায়গায় হাজিরা দিতে হয়, যা তাদের জন্য ঝামেলাপূর্ণ। দেখা যায়, কোনো মামলা ১৫ বছরেও গড়িয়েছে; ডাক্তার এ সময়ে অন্য কোনো বা দূরের কোনো হাসপাতালে যোগ দিয়েছে। কোর্টে হাজিরা দেওয়া তার জন্য কঠিন হয়ে যায়। আবার হাজিরার খরচও তাকে দেওয়া হয় না। এ কারণে তারা আহত রোগীর চিকিৎসায় আগ্রহী হয় না। দ্বিতীয়ত যাদের দ্বারা দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, যদি তারা রাজনৈতিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে বা পেশিশক্তিতে বলীয়ান থাকে তাহলে নানা চাপ তৈরি হয়। এসব কারণে বেসরকারি হাসপাতালে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়। তবে মুমূর্ষু কাউকে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত নয়; তার চিকিৎসা করা দরকার। চিকিৎসকরা হয়রানির মুখোমুখি না হলে এ প্রবণতা কমে যাবে।’
ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনা, অপরাধীর আক্রমণ বা সংঘর্ষের ঘটনায় মামলা বা জিডিতে বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য গ্রহণ করে না পুলিশ। ফলে বাধ্য হয়ে সরকারি হাসপাতালে যেতে হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র মো. ফারুক হোসেন বলেন, ‘দুর্ঘটনায় শিকার কেউ অভিযোগ করতে চাইলে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার তথ্য দিতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী আমরা সরকারি হাসপাতালের তথ্য চেয়ে থাকি।’
আইনও নেই আহতের পাশে
সারা দেশে আগের তুলনায় সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে বেপরোয়া পরিবহন, যান্ত্রিক ত্রুটি প্রভৃতি কারণে। ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে দ্রুত কাছের হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দিতে বলা হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে হাসপাতালের প্রতি কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। এর আগে একই বছর দুর্ঘটনায় আহতের চিকিৎসার নীতিমালার গেজেট প্রকাশের নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। তবে এখনো কার্যকরী হয়নি সে নির্দেশ।
দুর্ঘটনাস্থলের কাছের থানা এবং ক্ষেত্রমত ফায়ার সার্ভিস, চিকিৎসা সেবাকেন্দ্র বা হাসপাতালকে জানাতে বলা হয়েছে ওই আইনে। আহতের চিকিৎসা না করালে তা আইনের লঙ্ঘন হবে এবং এজন্য অনধিক এক মাসের কারাদ- বা অনধিক ২০ (বিশ) হাজার টাকা অর্থদ- বা উভয় দ- হবে এবং চালকের ১ পয়েন্ট কাটা যাবে।
২০১৬ সালে গুরুতর আহত ব্যক্তির জরুরি চিকিৎসাসেবা দিতে সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালকে নির্দেশ দিয়ে রুল জারি করেছিল হাইকোর্ট। ২০১৮ সালের আগস্টে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তির জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ও সহায়তাকারীর সুরক্ষায় প্রণীত নীতিমালার দুটি অংশে আদালতের পর্যবেক্ষণ যুক্ত করে গেজেট প্রকাশ করতে বলে হাইকোর্ট। নতুন আইন না হওয়া পর্যন্ত এটাই আইন গণ্য হবে।
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) সিনিয়র অ্যাডভোকেসি অফিসার আয়েশা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে নীতিমালাটা যথাযথভাবে এসেছে। রায়ের অনুলিপি পাওয়ার দুই মাসের মধ্যে স্বাস্থ্য সচিবকে গেজেট প্রকাশ করতে বলা হয়। এটার গুরুত্ব চিকিৎসকরাও বুঝতে পারবে যখন তাদের গাইডলাইনে এটা যুক্ত হবে। সরকার যখন এটাকে গেজেট আকারে প্রকাশ করবে তখন তারা বুঝতে পারবে যে এটা করতে হবে। গেজেট না হওয়ায় নীতিমালার উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে না।’
সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগে যোগাযোগ করে এ বিষয়ে জানার চেষ্টা করা হলেও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
