নির্বাচনী সাজ ছাত্ররাজনীতিতে

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৩, ০৫:৩৭ এএম

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের উত্তাপ ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে দেখা যাচ্ছে। মূল দলগুলোও নিজেদের ছাত্রসংগঠনগুলোকে মাঠে নামতে বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছে।

যদিও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, ছাত্রসংগঠনগুলো স্বতন্ত্র সংগঠন হিসেবে থাকবে। কোনো দলের সহযোগী হওয়া যাবে না। কাগজে-কলমে এটা থাকলেও লেজুড়বৃত্তির সেই পুরনো চর্চার কারণে ছাত্ররাজনীতি এখনো জাতীয় রাজনীতির প্রাণ।

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এক দফা দাবিতে আন্দোলন করছে বিএনপি। অন্যদিকে রাজনীতির মাঠ নিয়ন্ত্রণে রাখতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও নানা কর্মসূচি পালন করছে। এসব কর্মসূচিতে দুটি দলের সমর্থক ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। এ দুটি দলকে ঘিরে জাতীয় রাজনীতির যে উত্তাপ তাতে যোগ হয়েছে তাদের ছাত্রসংগঠনগুলো; বিশেষ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ ও বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল যথাক্রমে নির্বাচন ও আন্দোলনমুখী বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে মাঠের উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া সরকারের পক্ষে-বিপক্ষে ক্যাম্পেইন, জোট গঠনসহ নানাভাবে আলোচনায় থাকছে ছাত্রসংগঠনগুলো।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা ছাত্রসংগঠনের নেতাদের সঙ্গে প্রায়ই বৈঠক করছেন। ছাত্রলীগকে মাঠ ধরে রাখতে ও নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণায় যেমন নেমে যেতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তেমনি ছাত্রদলকেও বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা মাঠে থেকে সর্বোচ্চ আন্দোলন গড়ে তুলতে নির্দেশনা দিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক সব কর্মকা-েই নিজ নিজ দলের ছাত্রসংগঠনগুলো অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচন ঘনিয়ে এলে রাজনৈতিক অঙ্গনের উত্তাপ ছাত্রসংগঠনগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে।

আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছে প্রায় নিয়মিত। সমাবেশ থেকে বিরোধীদলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বক্তব্যও দিতে দেখা যায় সংগঠনটির শীর্ষ নেতাদের। এ ছাড়া তারা তরুণ প্রজন্মকে শেখ হাসিনার পক্ষে রায় দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন নিয়মিত। স্মার্ট বাংলাদেশ, শেখ হাসিনার পক্ষে দেশব্যাপী ক্যাম্পেইন ও ছাত্র সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি। তরুণ প্রজন্মের ব্যালট বিপ্লবের ওপর ভিত্তি করে জাতীয় নির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মহাকাব্যিক বিজয় উপহার দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এরই অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগের মাঠ দখলে রাখার পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ১ সেপ্টেম্বর ঢাকায় কর্মসূচি পালন করার ঘোষণা দিয়েছে ছাত্রলীগ। এই কর্মসূচিতে লাখ লাখ লোকের সমাগম ঘটিয়ে মাঠ দখলে আছে ক্ষমতাসীনদের তার প্রমাণ দেখাতে চায় সংগঠনটি।

সরকার পতন, ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা ও নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠায় এককাট্টা বিএনপির ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলসহ সমমনা প্রায় সব কটি ছাত্রসংগঠন। পুরোপুরি দলীয় এক দফায় মনোনিবেশ করেছে ছাত্রদল। দলীয় নির্দেশনা অনুযায়ী, সরকার পতনের দাবিতে রাজপথে নিয়মিত কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। এ বিষয়ে কঠোর বিএনপির হাইকমান্ডও। দায়িত্ব অবহেলার কারণে পদও হারাতে হচ্ছে ছাত্রদল নেতাদের। কেন্দ্রীয় ইউনিট ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় সব বিশ্বিবদ্যালয়-কলেজ শাখা ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক কর্মসূচি বাদ দিয়ে সরকার পতনের আন্দোলনকেই মূল কর্মসূচি হিসেবে পালন করছে। ভোটাধিকার নিশ্চিত ও সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করে তবেই ঘরে ফেরার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।

নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে গত শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে আত্মপ্রকাশ করেছে ‘ভোটাধিকারের দাবিতে ছাত্র সমাজ’ নামে একটি প্ল্যাটফরম। সারা দেশের শিক্ষার্থীদের নিয়ে এ বিষয়ে জনমত তৈরি করতে চান তারা। এ ছাড়া ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র ঐক্য’ নামে আরেকটি ছাত্রসংগঠনের যাত্রা শুরুর গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এ বিষয়ে ছাত্রদল, ছাত্র অধিকার পরিষদসহ কয়েকটি সংগঠন ঘরোয়া সভায় অংশ নিয়েছে বলে জানা গেছে। শেষ পর্যন্ত এটি আত্মপ্রকাশ করলে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে বৃহৎ ছাত্র আন্দোলনের সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষার্থী হাফেজ রেজাউল হত্যাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ইসলামিক কয়েকটি ছাত্রসংগঠন নিয়ে ‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য’ নামে আরেকটি জোট। গত শুক্রবার রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদ গেটে সমাবেশ করেছে এই জোট। সমাবেশ থেকে এই হত্যার সঙ্গে ছাত্রলীগের জড়িত থাকার অভিযোগ এনে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যথায় বৃহত্তর ছাত্র আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বাধীন এই জোট। ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশ, ইসলামী ছাত্রসমাজ‌, ইসলামী ছাত্র মজলিস, খেলাফত ছাত্র মজলিস‌, ক‌ওমি ছাত্র ফোরামসহ কয়েকটি সংগঠন রয়েছে এই জোটে।

তা ছাড়া সরকারের পদত্যাগসহ ১৩ দফা দাবিতে সমাবেশ করেছে বাম ছাত্রসংগঠনগুলোর গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট। দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া কোনোভাবেই নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন জোটের নেতারা। তাদের দাবি, মানুষ গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছিল, কিন্তু সেটা এখন নেই। এখন ডিজিটাল আইনের পরিবর্তে সাইবার নিরাপত্তা আইন করা হচ্ছে। সংগ্রামের মাধ্যমে জনগণের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়ে গঠিত এই জোটে রয়েছে ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, ছাত্র ফেডারেশন, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলসহ কয়েকটি বাম ঘরানার ছাত্রসংগঠন।

‘ভোটাধিকারের দাবিতে ছাত্র সমাজের’ সংগঠক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী আরমানুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটা রাষ্ট্রে যখন জনগণের ভোটাধিকার থাকে না, তখন সেই শাসন দেশের সব প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে ফেলে। ভোটাধিকার না থাকলে সমাজে গণতান্ত্রিক পরিসর ক্রমাগত সংকুচিত হতে থাকে। আমরা যদি স্থায়ীভাবে জনগণের ভোটাধিকার কায়েম করতে পারি তাহলে দেশে গণতান্ত্রিক পরিসর বৃদ্ধি পাবে।’

গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের সমন্বয়ক ও ছাত্র ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি রাগীব নাঈম বলেন, ‘ছাত্রসমাজ থেকে শুরু করে দেশের সব মানুষ কোনো না কোনোভাবে এই সরকারের অপকর্মের ভুক্তভোগী হচ্ছে। সেই জায়গা থেকে আমরা মনে করি এই সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করা খুবই জরুরি। তাই আমরা এ বিষয়ে ছাত্রদের মাঝে জনমত গড়ার চেষ্টা করছি। একই সঙ্গে আগামীতেও যাতে এসব কাজ না হয়, সেদিকেও আমরা সচেষ্ট আছি।’

ছাত্র অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, ‘আমরা সর্বাত্মকভাবে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে আছি। সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০ জুলাই প্রথম “স্টেপডাউন হাসিনা” কর্মসূচি বাস্তবায়ন করি। হামলা-মামলা-নির্যাতন উপেক্ষা করেই সারা দেশের জেলা-মহানগর, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ নব্বইয়ের অধিক ইউনিট নিয়ে আমরা লড়াই চালিয়ে যাব। নিরাপদ ক্যাম্পাস ও সরকারের পদত্যাগের দাবিতে সব ছাত্রসংগঠনের অংশগ্রহণে আমরা ছাত্র ঐক্য গড়ার চেষ্টা করছি।’

ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের সবচেয়ে বেশি ফোকাসের জায়গা দেশের মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা। অগণতান্ত্রিক স্বৈরাচার সরকারকে রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে সরিয়ে একটি গণতান্ত্রিক সরকার আনা। যার মাধ্যমে দেশের মানুষ নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে এবং তাদের মৌলিক অধিকার ফিরে পায়।’

তিনি বলেন, ‘আগামী জাতীয় নির্বাচনে দেশের সাধারণ জনগণ নির্ভয়ে যেন ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারে তার ব্যবস্থা করার জন্য ছাত্রদল সমন্বয় সেল গঠন করেছে। নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে বাংলাদেশের মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ দিতে হবে। সেই নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ছাত্রদল সম্পৃক্ত আছে। আমরা তৃণমূল নেতাকর্মীদের বার্তা দিয়েছি, প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান করেছি।’

ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘দেশরত্ন শেখ হাসিনার প্রতি তারুণ্যের যে মমত্ববোধ রয়েছে আমরা মনে করি এটি একটি বড় অ্যাডভান্টেজ। সে জায়গা থেকে আমরা আগামী ১ সেপ্টেম্বর স্মরণকালের সর্ববৃহৎ ছাত্র সমাবেশ আয়োজন করেছি।’ তিনি বলেন, এই সমাবেশের মাধ্যমে তারা একদিকে অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রত্যয় ঘোষণা করবে, একই সঙ্গে স্মার্ট বাংলাদেশের পক্ষে আগমনী রায় প্রদান করবে তরুণ প্রজন্ম। তরুণ প্রজন্ম দল-মতনির্বিশেষে শেখ হাসিনার পক্ষে, স্মার্ট বাংলাদেশের পক্ষে রয়েছে, সেটির একটি প্রমাণ তারা দেখতে পাবেন। এ ছাড়া আগামীতে সরাসরি তরুণদের সঙ্গে আলাপনের অনুষ্ঠানসহ তারুণ্যকে সম্পৃক্ত করে তারা বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করবেন।

ছাত্রলীগের এই নেতা বলেন, ‘স্মার্ট বাংলাদেশের পক্ষে ক্যাম্পেইন করে দেশব্যাপী আমরা গণজোয়ার তৈরি করতে চাই। সে সুর আমরা ইতিমধ্যে প্রতিধ্বনিত করে যাচ্ছি। তরুণ প্রজন্মের ব্যালট বিপ্লবের ওপর ভিত্তি করে জাতীয় নির্বাচনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনাকে অসাধারণ, মহাকাব্যিক বিজয় উপহার দেব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত