নীতিমালাই আইন হলো সিজারিয়ানে

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২৩, ০৫:৪৬ এএম

প্রসবিনীর অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার (সিজার) রোধে করার নীতিমালা চূড়ান্ত করে ছয় মাসের মধ্যে কার্যকর করতে বলেছে উচ্চ আদালত। একই সঙ্গে স্বাভাবিক প্রসবে সচেতনতার জন্য ব্যাপক প্রচার চালানোর নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। সন্তান জন্মদানে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার রোধে নির্দেশনা চেয়ে করা রিট আবেদনের ওপর চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলেন, হাইকোর্ট ওই নীতিমালাকে রায়ের অংশ ঘোষণা করেছে। নীতিমালাটি এখন আইনের মর্যাদা পেয়েছে এবং এর আলোকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন যুক্ত করে ২০১৯ সালের জুনে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের পক্ষে সংস্থাটির আইন উপদেষ্টা এসএম রেজাউল করিম হাইকোর্টে রিট আবেদনটি করেন। এতে বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশে গত দুই বছরে শিশু জন্মের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের হার ৫১ শতাংশ বেড়েছে। এতে সন্তান জন্মদানের ব্যয় বেড়েছে। এ ধরনের অস্ত্রোপচারে সন্তান জন্মদানে নানা ঝুঁকি রয়েছে।’ ওই সংস্থার বরাতে আবেদনে আরও বলা হয়, ‘২০১৭ সালে দেশে শিশু জন্মদানের ক্ষেত্রে ৮ লাখ ৬০ হাজার অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার হয়েছে। এ বাবদ বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ হচ্ছে।’

বিভিন্ন ক্লিনিকের অসাধু চিকিৎসকদের কাছে সিজারিয়ান অপারেশন একটি লাভজনক ব্যবসা উল্লেখ করে প্রতিবেদনগুলোতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা প্রভৃতি দেশেও সি-স্যাকশন (সিজারিয়ান অপারেশন) বেড়েছে। তবে এর ফলে যে হারে মাতৃমৃত্যু কমা উচিত, বাংলাদেশে তা হচ্ছে না।

আবেদনে আরও বলা হয়, সন্তান জন্মে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারে প্রসবিনীর মাত্রাতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, নবজাতকের অঙ্গহানি ও বিশেষ করে প্রসবিনীর ইনফেকশন হয়। এ ছাড়া অস্ত্রোপচারের কারণে মায়ের বুকের দুধ পান করাতে মায়ের সঙ্গে নবজাতকের যে শারীরিক নৈকট্য প্রয়োজন, তা দেরিতে ঘটে।

আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে ওই বছর ৩০ জুন সন্তান জন্মদানে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার রোধে নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দেয় হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের নির্দেশসহ রুল দেয় আদালত। রুলে যেসব হাসপাতাল ও ক্লিনিক সন্তান জন্মদানে অপয়োজনীয় অস্ত্রোপচার করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিবাদীদের ব্যর্থতা ও নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ও বেআইনি নয়, তা জানতে চায় হাইকোর্ট। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ সচিব, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) সভাপতি এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে রুলের জবাব দিতে বলা হয়। এর ধারাবাহিকতায় নীতিমালাটি হাইকোর্টে দাখিল করা হয়। এতে সন্তান জন্মদানের পদ্ধতিতে যে দুর্বলতা আছে তার পর্যালোচনা করে পরিবর্তন আনা, অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার ও স্বাভাবিক প্রসবের বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে চিকিৎসকদের নৈতিক মানের উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের আইনি সুরক্ষার কথা বলা হয়।

আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী রাশনা ইমাম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত দাসগুপ্ত। ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম সাংবাদিকদের বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, ‘কোনো দেশে এ ধরনের অস্ত্রোপচার ১০ থেকে ১৫ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু আমাদের দেশে এ হার সরকারিভাবে ৩১ শতাংশ আর বেসরকারিভাবে ৮৩ শতাংশ। এর বড় কারণ বেসরকারি হাসপাতালগুলোর লোভ।’

তিনি বলেন, ‘নীতিমালাকে রায়ের অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। এখন থেকে সংবিধান অনুযায়ী এ নীতিমালা আইনের মর্যাদা পেয়েছে।’

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অমিত দাসগুপ্ত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নীতিমালার আলোকে রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। এ বিষয়ে ছয় মাসের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ও সচেতনতা বাড়াতে বলা হয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত