ভিন্ন কৌশলে আর্জেন্টিনা

আপডেট : ২২ জুন ২০২৬, ০৮:০০ এএম

‘আমি সব ম্যাচ দেখছি। আর্জেন্টিনা যেভাবে বিশ্বকাপ শুরু করেছে, তাতেই বোঝা যায় তারা সত্যি সত্যিই তাদের শিরোপা ধরে রাখতে চায়। কোনো খেলাই সহজ নয়, কিন্তু আর্জেন্টিনা এটাকে একদম সহজ বানিয়ে ছেড়েছে।’

বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের মাঠের পারফরম্যান্স দেখে এভাবেই নিজের মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন নেদারল্যান্ডস জাতীয় দলের অধিনায়ক ও তারকা ডিফেন্ডার ভার্জিল ফন ডাইক। ডাচ অধিনায়কের এই একটি মন্তব্যই প্রমাণ করে, ২০২৬ বিশ্বকাপে কতটা খুনে মেজাজে যাত্রা শুরু করেছে আলবিসেলেস্তেরা। উদ্বোধনী ম্যাচে আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার মিশন রাজকীয়ভাবে শুরু করেছে লিওনেল স্কালোনির দল।

তবে বিশ্বজয়ের মুকুট ধরে রাখার মিশনে এবার আর্জেন্টিনার সামনে সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘরানার এক চ্যালেঞ্জ। টেক্সাসের ডালাস স্টেডিয়ামে গ্রুপ ‘জে’-এর ম্যাচে তাদের মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের অন্যতম সুশৃঙ্খল ও লড়াকু দল অস্ট্রিয়া। দুই দলই নিজেদের প্রথম ম্যাচে পূর্ণ পয়েন্ট পাওয়ায়, এই ম্যাচের জয়ী দলের শেষ ৩২ (রাউন্ড অব থার্টি-টু) এর টিকিট নিশ্চিত হয়ে যাবে।

জার্মান ট্যাকটিশিয়ান রালফ রাংনিকের অধীনে অস্ট্রিয়া বর্তমান ফুটবল বিশ্বের অন্যতম কৌশলী দল। তারা রক্ষণভাগে ‘বাস পার্কিং’ করে আলবিসেলেস্তেদের আটকানোর চেষ্টা করবে না, তা প্রায় নিশ্চিত। অস্ট্রিয়ার প্রধান শক্তি হলো তাদের আগ্রাসী এবং সুসংগঠিত ‘হাই-প্রেসিং’ ফুটবল। ম্যাচের শুরু থেকেই তারা প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে মাঠের ওপরের দিকেই বল কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে।

অস্ট্রিয়ার এই হাই-প্রেসিং দেয়াল ভাঙতে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ট্রাম্পকার্ড হতে পারেন ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেস। রক্ষণভাগ থেকে আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে লিসান্দ্রোর নিখুঁত ও দ্রুত ‘ফার্স্ট পাস’ বা প্রথম পাসটিই হবে এই ম্যাচের গতিপথ নির্ধারণের মূল চাবিকাঠি। আর্জেন্টিনার সহকারী কোচ পাবলো আইমারও প্রতিপক্ষকে সমীহ করে বলেছেন, ‘অস্ট্রিয়া শারীরিক শক্তিতে বেশ এগিয়ে এবং তারা আলজেরিয়ার চেয়ে অনেক কঠিন প্রতিপক্ষ হতে যাচ্ছে।’

প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে নিজের অতিমানবীয় ফর্ম ধরে রেখেছেন ৩৮ বছর বয়সী মহাতারকা লিওনেল মেসি। অস্ট্রিয়া অধিনায়ক ডেভিড আলাবাও অকপটে স্বীকার করেছেন মেসির এই ধার, ‘মেসি প্রথম ম্যাচেই হ্যাটট্রিক দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করেছে, এটা এক কথায় পাগল করা পারফরম্যান্স! আশা করি আমাদের বিপক্ষে সে এমনটা করতে পারবে না।’

তবে কোচ লিওনেল স্কালোনির মাথায় ঘুরছে ভিন্ন ভাবনা। তিনি চান না প্রতি ম্যাচেই মেসিকে একা ‘সুপারহিরো’র ভূমিকা পালন করতে হোক। প্রথম ম্যাচে আর্জেন্টিনার পুরো আক্রমণভাগ বড্ড বেশি মেসিনির্ভর হয়ে পড়েছিল। এই নির্ভরতা কমাতে এবং মাঝমাঠে বলের গতি বাড়াতে কিছু কৌশলগত পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে ।

এনজো-ম্যাক অ্যালিস্টারকে মুক্ত করা : গত বিশ্বকাপে এনজো ফার্নান্দেজ এবং আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার কেবল মাঝমাঠ সামলাননি, বক্সের ভেতর ঢুকে গোলও করেছিলেন। আলজেরিয়া ম্যাচে তারা একটু নিচে নেমে খেলায় সৃষ্টির পুরো দায় মেসির কাঁধে পড়েছিল। স্কালোনি এবার মাঝমাঠে একজন খাঁটি হোল্ডিং মিডফিল্ডার (যেমন লিয়ান্দ্রো পারেদেস বা এসেকিয়েল পালাসিওস) নামাতে পারেন, যাতে এনজো ও ম্যাক অ্যালিস্টার ওপরে উঠে খেলার স্বাধীনতা পান এবং মেসির সঙ্গে পাসিং কম্বিনেশন তৈরি করতে পারেন।

থিয়াগো আলমাদার জায়গায় উইংয়ে গতি বাড়াতে নিকোলাস গঞ্জালেসকে দেখা যেতে পারে। এছাড়া হুলিয়ান আলভারেজ, গিলিয়ানো সিমেওনে কিংবা নিকো পাজের মতো প্রতিভাদের ব্যবহার করে মেসিকে আরও নিখুঁত বল জোগানোর পরিকল্পনা রয়েছে কোচের। ডান পায়ের পেশির (কোয়াড্রিসিপস) চোটের কারণে এই ম্যাচে থাকছেন না রাইট-ব্যাক গঞ্জালো মনতিয়েল। তার জায়গায় রক্ষণভাগে খেলতে পারেন নাহুয়েল মোলিনা। আর প্রথম ম্যাচে বিশ্রামে থাকা নিকোলাস তাগলিয়াফিকো এই ম্যাচে একাদশে ফিরতে পারেন।

বিশ্বকাপের মঞ্চে এটিই আর্জেন্টিনা ও অস্ট্রিয়ার প্রথম আনুষ্ঠানিক দেখা। এর আগে দুটি প্রীতি ম্যাচের একটিতে আর্জেন্টিনা জিতেছিল (ম্যারাডোনার হ্যাটট্রিকে ৫-০ গোলে, ১৯৮০ এবং অন্যটি ড্র হয়েছিল (১-১, ১৯৯০)।

টানা ৮ ম্যাচ জয়ের দুর্দান্ত এক ধারাবাহিকতায় রয়েছে বিশ্বর‌্যাংকিংয়ের এক নম্বর দলটি। বিশ্বকাপে নিজেদের শেষ ৩টি ম্যাচেই তারা ঠিক ৩টি করে গোল করেছে। রাংনিকের দলও রয়েছে দুর্দান্ত ফর্মে (শেষ ১২ ম্যাচের ১০টিতেই জয়)। তবে লাতিন আমেরিকার দলগুলোর বিপক্ষে তাদের অতীত ইতিহাস বেশ নড়বড়ে শেষ ১০ ম্যাচে দক্ষিণ আমেরিকান দলগুলোর বিপক্ষে মাত্র ১টি জয় পেয়েছে ইউরোপের এই দলটি।

আর মাত্র একটি গোল করলেই জার্মানির মিরোসøাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড ভেঙে এককভাবে বিশ্বকাপের ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হবেন মেসি। একই সঙ্গে টানা ৬ বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার অনন্য কীর্তি গড়বেন তিনি।

স্কালোনি সবসময়ই প্রতিপক্ষের দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে চমক দেখাতে ভালোবাসেন। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে ডি মারিয়াকে বাম উইংয়ে খেলানোর সেই বিখ্যাত মাস্টারস্ট্রোকের মতো, আজ ডালাসের মাঠে অস্ট্রিয়ার প্রেসিং রুখতেও স্কালোনির ডায়েরি থেকে নতুন কোনো ট্যাকটিক্যাল ধামাকা দেখার অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত