আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি হলে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংলাপে বসার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে বিএনপি। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্ততপক্ষে দুটি বিষয়ে সরকার নমনীয় হলে সংলাপ বা আলোচনার ব্যাপারে আন্তরিকতা দেখাবেন তারা। এ দুটি বিষয় হচ্ছে ‘নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার’ ও ‘চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ নেতাকর্মীদের মুক্তি’।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার অনুমতি দিয়ে বিদেশে পাঠানোর সুযোগ তৈরির মাধ্যমে সেই আলোচনা শুরু হতে পারে বলে মনে করেন তারা। সম্প্রতি বিদেশি দেশগুলোর প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে বিএনপির নেতারা এ মনোভাব পোষণ করেছেন। তবে যেহেতু ২০১৪ ও ’১৮ সালের সংলাপ নিয়ে তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাই বর্তমান রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে ‘সতর্ক’ভাবে পা ফেলতে চাইছে দলটি। কেননা, তারা এবার সরকারের কৌশলের কাছে ধরাশায়ী হতে চায় না।
বিএনপিদলীয় সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে বরাবরই বিদেশি শক্তিগুলো পরামর্শ দিয়ে থাকে। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখেও একই প্রক্রিয়া চলমান। পর্দার অন্তরালে রাজনৈতিক কয়েকটি পক্ষের সঙ্গে কূটনীতিকদের আলাপ ও আলোচনা নিয়মিত চলছে। বিদেশি প্রতিনিধিদের সঙ্গে হওয়া বৈঠকে বিএনপি নেতারা আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পক্ষে মত দিচ্ছেন। তারা মনে করছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে প্রেরণের সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে পরিস্থিতি নতুনভাবে তৈরি হতে পারে। প্রতিশ্রুতি কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া ছাড়া সংলাপ বা আলোচনা অনিশ্চিত। ফলে তাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে নিয়মিত আন্দোলনের প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবেন তারা।
গত বৃহস্পতিবারও ঢাকায় দুটি দেশের কূটনৈতিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছে রাজপথে এক দফার আন্দোলনে থাকা বিএনপি।
দুপুরে গুলশানের আমেরিকান ক্লাবে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাসের সঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দেখা হয়। সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা কথা বলেন তারা। ওই সময় মির্জা ফখরুলের সঙ্গে দলের কেউ না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের ডেপুটি কাউন্সিলর (পলিটিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক) আরতুরো হাইন্স অংশ নেন।
বৈঠক সম্পর্কে বিএনপির পক্ষ থেকে অস্বীকার করা হলেও সূত্র বলছে, পিটার হাসের আমন্ত্রণে পরে বিএনপি মহাসচিব দূতাবাসে যান এবং প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থান করেন। এ সময় বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আগামী নির্বাচন এবং নতুন মার্কিন ভিসানীতি নিয়ে তারা আলোচনা করেছেন। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিএনপির অবস্থান আবারও পরিষ্কার করেছেন তিনি।
সূত্রমতে, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে বিএনপি। মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে মির্জা ফখরুল বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে বিএনপি কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না। মার্কিন ভিসানীতি বাংলাদেশের জন্য লজ্জাজনক হলেও বর্তমানে দেশের পরিস্থিতিতে মানুষ এ ভিসানীতিকে স্বাগত জানিয়েছে বলেও জানানো হয় বৈঠকে।
এ ছাড়া ঢাকায় নিযুক্ত সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত রেতো রেংগলির বারিধারার বাসভবনে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন বিএনপি নেতারা। সুইজারল্যান্ডের দূতের আমন্ত্রণে এ মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক কমিটির প্রধান আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিএনপি সাংগঠনিক সম্পাদক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক কমিটির সদস্য শামা ওবায়েদ ও তাবিথ আউয়াল।
মধ্যাহ্নভোজ শেষে গণমাধ্যমে শামা ওবায়েদ জানান, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
সম্প্রতি দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের সাধারণ সম্পাদক ও মহাসচিব পর্যায়ের বক্তব্যের পর ‘সংলাপ’ বা ‘আলোচনার’ বিষয়টি আবারও রাজনীতিক অঙ্গনের আলোচনায় উঠে আসে। গত সোমবার রাজধানীর বনানীর শেরাটন হোটেলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক-নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দলের বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘তারা (যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক-নির্বাচনী পর্যবেক্ষক) কোনো প্রস্তাব দেয়নি, আলোচনায় উঠে এসেছে বিএনপির দাবি। তারা কথায় কথায় বলেছেন, আপনাদের মধ্যে এখানে কোনো কম্প্রোমাইজের পথ খোলা আছে কি না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার অ্যাডজাস্টমেন্টের কোনো সমাধান খুঁজে পাওয়া যায় কি না? আমরা বলেছি, সেই পথ বিএনপি ব্লক (বন্ধ) করে রেখেছে।’
তার এ বক্তব্যের জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত বুধবার গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ‘এটা বাজে কথা, এটা কত বড় মিথ্যা কথা আপনারা ভালো করেই জানেন। আমরা বরাবরই বলেছি, নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে আলোচনা হতে পারে।’
আলোচনার সুযোগ রয়েছে কি না, এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গত বৃহস্পতিবার বিএনপি মহাসচিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বরাবরই বলে এসেছি, আমরা আলোচনার পক্ষে। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা কী, সেটা দেশবাসীসহ সবাই জানে। তাই নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারসহ কয়েকটি এজেন্ডা ছাড়া আলোচনা অর্থবহ হবে না।’
বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৪ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে এবং ২০১৮ সালের সরাসরি নিজেরা সংলাপে বসার তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে তাদের। সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে দলটির হাইকমান্ড। ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে দাবি আদায় সহজ নয় জেনেও রাজপথে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন কর্মসূচি পালন করছে। এ দাবিতে গত এক বছর ধরে রাজপথের এ কর্মসূচিতে জনগণও অংশ নিচ্ছি। এ পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচনে বাধা দেওয়া ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ভিসা না দেওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তটিও বিএনপির অনুকূলে গেছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন প্রাক-নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দলসহ বিদেশি যারাই বাংলাদেশ সফর করছেন, তারাও এ বিষয়ে সরকারকে নানা কৌশলে জিজ্ঞেস করছেন; যা সরকারের জন্য বাড়তি চাপ হয়ে দেখা দিচ্ছে। তাই দলটির নেতাদের ধারণা, ছাড় দিয়ে ক্ষমতাসীনরা সংলাপের প্রস্তাব নিয়ে আসতেও পারেন। তবে এর আগে দেশ-বিদেশের নানা চাপে থাকা আওয়ামী লীগ সংলাপের নামে জনগণকে বিভ্রান্ত করার কৌশল নিয়ে এগোবে। ফলে পাল্টা কৌশলের অংশ হিসেবে সতর্কভাবে ‘এজেন্ডা’কে সামনে নিয়ে এসেছে বিএনপি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটি ও যুগ্ম মহাসচিব পর্যায়ের অন্তত তিন নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পর্দার সামনে বা পেছনে যাই হোক, প্রস্তাব পেলে তারা সংলাপের বিষয়টি ভেবে দেখবেন। সেই প্রস্তাবে দুটি বিষয়ের ব্যাপারে পরিষ্কার বক্তব্য থাকতে হবে। সম্প্রতি সংলাপ নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে সরাসরি আলোচনার সূত্রপাত হয়নি বলেও দাবি তাদের।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তাদের (আওয়ামী লীগ নেতাদের) সুর নরম হচ্ছে। আরও নরম হবে। তারা ডাকলেই যে আমরা সংলাপে যাব, এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। এজেন্ডার বাইরে সংলাপে নেই বিএনপি।’
দলের যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘২০১৮ সালের আমরা সংলাপে বসেছিলাম। প্রতিদানে কী পেয়েছি তা জনগণ দেখেছে। জেনেশুনে কেউ দ্বিতীয়বার বেলতলায় যায় না। জনগণকে বোঝানোর জন্য আমরা গিয়েছিলাম। এবার কোন যুক্তিতে তাদের সঙ্গে সংলাপে বসতে হবে? তারপরও সরকার ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দিয়ে আলোচনা শুরু করলে, জনগণের দাবি মেনে সংলাপ বা আলোচনা হতে পারে।’
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ বলেন, ‘প্রত্যেকটি বৈঠকেই নির্বাচনের প্রসঙ্গ আছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিএনপির পরিকল্পনা কী, সেটা বিদেশিরা জানতে চায়। আমরা প্রতিবারই আমাদের যুক্তি তুলে ধরি।’
