রাজধানীর ডেমরার সড়কে দাঁড়িয়েছিল অছিম পরিবহনের একটি বাস। তাতে ঘুমাচ্ছিলেন চালকের দুই সহকারী নাইম ও রবিউল। সেই বাসে দেওয়া আগুনে ঘুমন্ত অবস্থায় পুড়ে মৃত্যু হয় নাইমের। হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন রবিউল। ২২ বছরের নাইমের কাঁধেই ছিল পরিবারের দায়িত্ব। পরিবারটি এখন পথহারা। গত শনিবার রাতের নির্মম ঘটনার তদন্ত করছে পুলিশ। তাদের ধারণা, হরতাল সমর্থকরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে।
রাজনৈতিক আন্দোলনে সভা-সমাবেশ, মানববন্ধনের মতো বিভিন্ন কর্মসূচি থাকে। তবে এসব আয়োজনে বিভিন্ন পরিবহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। গত দুদিনে বাসসহ বিভিন্ন পরিবহনে ৪৫টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছে ২০১৩-১৪ সালের অগ্নিসন্ত্রাসের কথা। তখন থেকেই এমন ঘটনায় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের অভিযুক্ত করা হচ্ছে। যদিও তারা এ অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে।
তাদের অস্বীকারের পেছনে সন্দেহ ঘনীভূত হয়েছে শনিবারে একটি বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ওইদিন বিএনপির সমাবেশ ঘিরে ঢাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার পর কাকরাইল এলাকায় একটি বাসে আগুন দেয় গোয়েন্দা পুলিশের জ্যাকেট পরা দুই ব্যক্তি। ঢাকা-কুমিল্লা রুটের এশিয়া পরিবহনের ওই বাসের চালক মনির হোসেন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বাসটি ডিবি পুলিশ রিকুইজিশন করেছিল। বাসটিতে করে ডিবি পুলিশ সদস্যরা কাকরাইলে এসে নেমে যান। এরপর দুজন ডিবি পুলিশ লেখা জ্যাকেট পরে বাসে ঢুকে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে মোটরসাইকেল করে পালিয়ে যায়। পুলিশ বলছে, ঘটনা ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টায় পুলিশের পোশাক পরে বাসে আগুন দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, ১৯৭১ সালে জামায়াত পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মিলে অগ্নিসন্ত্রাস চালিয়েছে। জামায়াতের সঙ্গেই বিএনপির রাজনীতির যোগসাজশ। সেখান থেকেই এ দলটি রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে অগ্নিসন্ত্রাসের কর্মযজ্ঞ চালিয়ে আসছে।
মাহবুবউল আলম হানিফ আরও বলেন, বিএনপির রাজনীতিতে যতক্ষণ পর্যন্ত জনসম্পৃক্ততা না আসবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের মধ্যে এমন সংস্কৃতি চলতে থাকবে।
এ বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বাসে আগুন দিয়ে বিএনপিকে আগুনসন্ত্রাসী বানানোর অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কাকরাইলে ডিবি পুলিশের সদস্যরা বাসে আগুন দিয়েছে এটাই তার প্রমাণ। তারা এভাবে বছরের পর বছর ধরে আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে যড়যন্ত্র করে আসছে। ক্যাডার বাহিনীকে দিয়ে তাদের ক্রমাগত অন্যায় সাধারণ জনগণ মেনে নেবে না।’
মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা সন্দেহ রয়েছে, এ ধরনের অগ্নিসংযোগের ঘটনা সরকারের কোনো সংস্থার হতে পারে। সন্দেহটা আরও তীব্র হয়েছে সম্প্রতি কাকরাইলে বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। সেখানে পুলিশের উপস্থিতিতে ডিবির পোশাকধারীরা ওই বাসে আগুন দিয়েছে বলে চালক অভিযোগ করেছে।
নূর খান লিটন বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা ঘটলেই বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর দোষ চাপানো হয়। এটা একটা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। আমাদের এর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ঘটনা ঘটলেই তাদের বিরুদ্ধে মামলা নেওয়া যাবে না। যাচাই করে তারপর ব্যবস্থা নিতে হবে।’
এদিকে গত দুদিনে রাজধানীসহ সারা দেশে ১২টি বাসে আগুন দেওয়া হয়েছে। প্রায় ১০০ বাস ভাঙচুর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘ডেমরায় অছিম পরিবহনের একটি বাসে আগুন দিয়েছে সন্ত্রাসীরা। সে বাসে হেলপার ঘুমানো ছিল। তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হলো। আমরা এ ঘটনায় যারা জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।’
ওই ঘটনায় তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ডেমরা থানার সাব-ইন্সপেক্টর সাইদুর রহমান গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ঘটনায় বাসমালিক মামলা করার প্রস্তুতি নিয়েছেন। এখনো কাউকে শনাক্ত করা যায়নি। আমাদের একাধিক দল কাজ করছে। তারা সিসিটিভি ফুটেজসহ অন্য আলামত বিশ্লেষণ করছে।’
অন্যদিকে ডিবির পোশাকে বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনায় কাউকে শনাক্তের কথা জানাতে পারেনি পুলিশ। এ বিষয়ে গতকাল সন্ধ্যায় একাধিক কর্মকর্তাকে ফোন করে সাড়া পাওয়া যায়নি। এর আগে পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ বলেন, ‘তদন্ত চলছে। যারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পোশাক পরে আগুন লাগিয়েছে তাদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। যারা সংঘর্ষের জের ধরে পুলিশ হাসপাতালসহ বিভিন্ন জায়গায় গাড়ি পুড়িয়েছে সে চক্রটিই বাস পুড়িয়েছে।’
