আফ্রিকার দেশগুলোতে একের পর এক সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটছে। এর বদলে উত্থান হচ্ছে নতুন নতুন সেনাশাসকের। ২০২০ সাল থেকে আফ্রিকায় ১০টি অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটেছে। এসব অভ্যুত্থানের বেশিরভাগই হয়েছে মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোতে। কিন্তু সামরিক অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিয়ে বরং গণতন্ত্রের এ পতনে উল্লাস করতে দেখা গেছে এসব দেশের মানুষকে। রাজপথে অভ্যুত্থানকারীদের পক্ষ নিয়ে স্লোগান দিয়েছেন তারা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আফ্রিকার এই রাজনৈতিক অবস্থার পেছনের কারণটি পশ্চিমাবিরোধী মনোভাব। আর গণতন্ত্রের ওপর আস্থাহীনতায়। কারণ অঞ্চলচির বেশিরভাগ দেশে মানুষের কথা ভেবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পরিচালিত হয় না, এটা হয় মুষ্টিমেয় মানুষের স্বার্থে। ফলে বহু বছর সেখানে সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নতিই হয়নি।
লন্ডনভিত্তিক থিংকট্যাংক চ্যাথাম হাউজের আফ্রিকাবিষয়ক কর্মসূচির ফেলো লিনা কোফি হফম্যানের এমন ধারণার প্রমাণও পাওয়া গেছে গেল সপ্তাহেই। গত বুধবার সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন ২০০৯ সাল থেকে মধ্য আফ্রিকার দেশ গ্যাবনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আলি বাঙ্গো। অভ্যুত্থানের পরপরই প্রকাশিত সংক্ষিপ্ত একটি ভিডিও চিত্রে তিনি তার পক্ষে ‘আওয়াজ তোলার জন্য’ দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। অবশ্য ক্ষমতাচ্যুত শাসকের আহ্বান যে সাধারণের মনে কোনো প্রতিক্রিয়া তৈরি করেনি, তার প্রমাণ দেখা গেল গ্যাবনের রাজপথে। রাজধানী লিব্রেভিলসহ বিভিন্ন শহরে উল্লাস করছে সাধারণ জনতা। অনেকে সেনাদের সঙ্গে ছবি তুলছেন। ১৯৬৭ সালে বঙ্গোর বাবা ওমর আলির রাষ্ট্রক্ষমতায় বসার মধ্য দিয়ে পরিবারটির যে আধিপত্য চলছিল দেশটিতে, দৃশ্যত তার অবসান ঘটায় সেনাদের বাহবা দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। ২০২০ সাল থেকে আফ্রিকায় যে ১০টি অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটেছে সেসব জায়গায় দেখা গেছে, অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিয়ে বরং গণতন্ত্রের এ পতনে উল্লাস করতে দেখা গেছে এসব দেশের মানুষকে। রাজপথে অভ্যুত্থানকারীদের পক্ষ নিয়ে সেøাগান দিয়েছেন তারা।
আলজাজিরা বলছে, গ্যাবনের আগে আফ্রিকায় সর্বশেষ অভ্যুত্থানটি হয়েছে গত ২৬ জুলাই, নাইজারে। অভ্যুত্থানের পর দেশটির জেনারেলরা রাষ্ট্রক্ষমতার দখল নেন। সেই সামরিক সরকারের সমর্থনে স্টেডিয়ামগুলো ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। এরও আগে ২০২১ সালে অভ্যুত্থান হয় গিনিতে। জনগণের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও ক্ষমতা আঁকড়ে রেখেছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আলফা কোন্দে। অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতা থেকে অপসারিত করে সামরিক বাহিনী। গিনির সেই অভ্যুত্থানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল দেশটির জনতার বড় অংশ। সেনাদের ক্ষমতা দখল উদযাপন করেছিল তারা।
অগণতান্ত্রিক পন্থায় ও জোর করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলেও আফ্রিকার মানুষ কেন এভাবে সমর্থন জানাচ্ছে, সেই প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আফ্রিকায় বেসামরিক নেতৃত্ব নিয়ে সাধারণ মানুষ হতাশ। সামরিক নেতৃত্ব নিয়ে তাদের এ আশাবাদ সে হতাশারই প্রতিফলন। কোফি হফম্যান বলেন, সামরিক বাহিনীর রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে জনগণের এ সমর্থন সরাসরি নয়। অর্থাৎ মানুষ সেনাবাহিনীকে সমর্থন নয়, বরং তারা ক্ষমতার পালাবদল চায়। হফম্যান বলেন, যে সরকারকে উৎখাত করা হয়েছে, সেটি এমন এক সরকার, যারা জনগণের স্বার্থকে পুরোপুরি তুলে ধরে না।
আলজাজিরার প্রতিবেদন বলছে, গত বছর আফ্রিকার দেশগুলোতে একটি জরিপ পরিচালনা করে আফ্রিকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আফ্রোব্যারোমিটার। তাতে দেখা যায়, মহাদেশটির মাত্র ৪৪ শতাংশ মানুষ মনে করে, ভোট দেওয়ার মাধ্যমে নিজেদের অপছন্দের প্রার্থীকে ক্ষমতা থেকে অপসারিত করা যায়। চলতি বছর একই প্রতিষ্ঠানের করা আরেকটি জরিপে দেখা যায়, দেশটির মানুষের গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা কমছে। গত দশকে যেখানে ৭৩ শতাংশের গণতন্ত্রে আস্থা ছিল, এ বছর তা কমে হয়েছে ৬৮।
সংবাদমাধ্যমটি বলছে, আফ্রিকার দেশগুলোতে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টরা সময় পেরোলে নির্বাচন দেন ঠিকই, যা নিতান্তই নিয়ম রক্ষার। গ্যাবনের প্রেসিডেন্ট আলি বাঙ্গো তার একটি উদাহরণমাত্র। উগান্ডা, রুয়ান্ডা, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি ও ক্যামেরুনের মতো দেশগুলোর প্রেসিডেন্টরাও অন্তত দুই দশক ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে আছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জীবনমানের দ্রুত অবনমন হওয়ায় গণতন্ত্রের সুফল সম্পর্কে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন তুলছে আফ্রিকার মানুষ।
ক্রমাগত নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকায় আফ্রিকার জনজীবনে চরম দুর্দশা দেখা দিয়েছে। এতে সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনাও বাড়ছে। বাড়ছে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ বছরের শেষ নাগাদ আফ্রিকার অর্থনীতির আকার তো বাড়বেই না, বরং ৩ দশমিক ১ শতাংশ কমবে। এর আগে গত বছর এ হার ছিল ৩ দশমিক ৬। অর্থনীতির সামগ্রিক এমন দুরবস্থার কারণে বেসামরিক নেতৃত্বের ওপর জনগণের সমর্থন প্রতিনিয়ত কমছে। যদিও এসব নেতা ‘গণতান্ত্রিক’ উপায়ে নির্বাচিত এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও তাদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।
হফম্যানের মতে, জনগণের মধ্যে সরকার পরিবর্তনের এমন আকাক্সক্ষার নেপথ্যে আরও একটি কারণ আছে। সেটি হলো বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকা।
গত পাঁচ বছরে আফ্রিকার যেসব দেশে সেনা অভ্যুত্থান হয়েছে, সুদান বাদে বাকি সব দেশই একসময় ফ্রান্সের উপনিবেশ ছিল। এসব দেশের সরকারের ওপর প্রভাব, কর্র্তৃত্ববাদী শাসকদের পক্ষ নেওয়া ও তাদের প্রতি সমর্থন জুগিয়ে যাওয়ায় ফ্রান্সকে দায়ী করে থাকে সাধারণ মানুষ। জনগণের ফ্রান্সবিরোধী এ মনোভাব কাজে লাগাচ্ছেন অভ্যুত্থানকারী জেনারেলরা। তারা ফ্রান্সবিরোধী বক্তব্য দিয়ে জনগণকে কাছে টানার চেষ্টা চালাচ্ছেন। ফ্রান্স নিজের স্বার্থেই যে এসব কর্র্তৃত্ববাদী শাসককে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিল, জনগণের মধ্যে সে বিষয়টি জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আফ্রিকার মানুষ যে সেনা অভ্যুত্থানকে স্বাগত জানাচ্ছেন, তার অন্যতম কারণ সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার না থাকা ও এর সুফল না পাওয়া। তবে তারা এ-ও বলছেন, সুন্দর ভবিষ্যতের যে আশায় সাধারণ মানুষ সামরিক সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে, সেই সরকারও তাদের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজে আসবে না। কারণ, জনগণের সুফল নয়, জেনারেলদেরও লক্ষ্য রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে নেওয়া। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যাটলাস নেটওয়ার্কের সেন্টার ফর আফ্রিকান প্রসপারিটির ফেলো ইব্রাহিম আনোবা এ প্রসঙ্গে বলেন, এটা অনেকটা ঘা হওয়ার মতো। ঘা চুলকালে ক্ষণিকের জন্য আরাম পাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু চুলকানোর কারণে এর অবস্থা হয় আরও খারাপ। ঠিক এই চুলকানির মতো সাময়িক স্বস্তি হয়ে আসছে সামরিক বাহিনী।
একই রকম ভাষ্য গার্ডিয়ানের কলামিস্ট নেসরিন মালিকেরও। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, আফ্রিকায় অভ্যুত্থান-বলয়ের পরিধি বাড়ছেই। অভ্যুত্থান ছড়িয়ে পড়েছে পুরো সাহেল অঞ্চলে। প্রাথমিক বিচারে অভ্যুত্থানের এ প্রবণতাকে আফ্রিকার দেশগুলোর পশ্চাৎযাত্রা বলে মনে হতে পারে। মনে হতে পারে দেশগুলো সামরিক শাসনে ফিরে যেতে আগ্রাসী পথ নিচ্ছে। কিন্তু আফ্রিকার বাস্তব পরিস্থিতি আরও বেশি জটিল। তিনি মনে করেন, অভ্যুত্থানের পেছনে বিচিত্র কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, দুর্বল রাষ্ট্রকাঠামো, শক্তিশালী সেনাবাহিনী ও আধা সামরিক বাহিনী, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জীবনযাত্রার সংকট, বিশালাকার তরুণ জনগোষ্ঠী ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। এ সবকিছু সম্মিলিতভাবে তরুণদের মধ্যে হতাশার বীজ বুনে দিচ্ছে ও প্রাতিষ্ঠানিকতার প্রতি তারা আস্থা হারাচ্ছেন। এর ফলে ক্যারিশমাটিক চরিত্রের শক্তিমানরা তাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
