রাশিয়ার পরিকল্পনা ‘নস্যাত’ করে দিয়েছে ইউক্রেন: জেলেনস্কি

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৫:২৬ পিএম

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়া যেভাবে রাজধানী কিয়েভ দখল এবং তার সরকারকে উৎখাত করার পরিকল্পনা নিয়ে ইউক্রেনে হামলা চালিয়েছিল তা নস্যাত করে দিয়েছে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী। শনিবার বিকালে এক নতুন ভিডিও বার্তায় তিনি এই দাবি করেছেন। এসময় তিনি রাশিয়ার নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন যুদ্ধ বন্ধে তাদের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে চাপ প্রয়োগ করেন।

নতুন ভিডিও বার্তায় জেলেনস্কি বলেন, ‘আমরা তাদের পরিকল্পনাকে নস্যাৎ করে দিয়েছি’। ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী রাজধানী কিয়েভ এবং এর আশেপাশের প্রধান শহরগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে বলেও জোর দাবি করেছেন তিনি।

এসময় তিনি যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলা রাশিয়ান নাগরিকদেরও ধন্যবাদ জানিয়েছেন এবং যুদ্ধ বন্ধে তাদেরকে পুতিনের ওপর চাপ বজায় রাখতে বলেছেন এই বলে যে, ‘তারা আপনাদের সঙ্গে মিথ্যা বলছে, আমাদের সঙ্গে মিথ্যা বলছে, সমগ্র বিশ্বের কাছে মিথ্যা বলছে’।

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের রাস্তায় এখন পুরোদস্তুর যুদ্ধ চলছে রাশিয়া এবং ইউক্রেনের সেনাদের মধ্যে। এমন পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে সেখান থেকে ‘উদ্ধার’ করার প্রস্তাব দিয়েছে আমেরিকা। কিন্তু তাকে উদ্ধারে মার্কিন এই ‘সাহায্য’ প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন জেলেনস্কি।

পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদের সাথে কথোপকথনের সময় ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘লড়াই এখানে; আমার গোলাবারুদ দরকার, আমাকে সরিয়ে নেওয়ার দরকার নেই’।

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ ঘিরে ফেলেছে রাশিয়ার সেনাবাহিনী। এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে পারেন বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব রটেছিল। এরপর শনিবার সকালে এক ভিডিও বার্তায় জেলেনস্কি সবাইকে আস্বস্ত করে বলেন, তিনি দেশে আছেন। শুধু তাই নয়, তিনি দেশবাসীকে রাশিয়ার সেনার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন।

জেলেনস্কিকে ওই ভিডিওতে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা সবাই এখানে আছি। আমাদের সেনাবাহিনী এখানে আছে। সমাজের নাগরিকরা এখানে। আমরা এখানে সবাই আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের দেশকে রক্ষা করছি এবং এই কাজ আমরা এভাবেই করতে থাকব’।

ভিডিওতে দেখা যায়, প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি সবুজ রঙের সামরিক ধাঁচের পোশাক পরেছেন। তার পাশে দাঁড়িয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী, চিফ অব স্টাফ এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা। রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে দেশের মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

এর আগেও এক বক্তৃতায় লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছিলেন জেলেনস্কি। তখন বলেছিলেন, যখন আমাদের আক্রমণ করবেন, আপনি আমাদের মুখ দেখতে পাবেন, পিঠ নয়।

আজ শনিবার রুশ বাহিনীর হামলার তৃতীয় দিনের শুরুতেই ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের রাস্তায় রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছে লড়াই।

১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের লড়াইয়ে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে ইউক্রেনের বিভিন্ন বাহিনীর পক্ষ থেকে। বহু বেসামরিক নাগরিককে অস্ত্র হাতে রাস্তায় ঘোরাফেরা করতে দেখা যাচ্ছে।

এর আগে শুক্রবার সাধারণ নাগরিকদের হাতে হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছে ইউক্রেন সরকার। পালিয়ে না গিয়ে দেশ রক্ষায় রুখে দাঁড়াবার আহ্বান জানানো হয়েছে পুরুষদের।

ইউক্রেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্বেচ্ছাসেবকদের ১৮ হাজার আগ্নেয়াস্ত্র দেওয়া হয়।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাশিয়ান সেনারা এখন পর্যন্ত ইউক্রেনের ৮০০টিরও বেশি সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করে দিয়েছে।

রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইগর কোনাশেনকভ বলেছেন, ইউক্রেনের ১৪টি সামরিক বিমানঘাঁটি, ১৯টি কমান্ড পোস্ট, ২৪টি এস-৩০০ বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং ৪৮টি রাডার স্টেশন ধ্বংস করা হয়েছে। এছাড়া ইউক্রেনের আটটি নৌবাহিনীর বোটেও আঘাত হানা হয়েছে বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে, ইউক্রেন কর্তৃপক্ষ শনিবার এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, রাশিয়ার প্রায় ১৪টি যুদ্ধবিমান, ৮টি হেলিকপ্টার, ১০২টি ট্যাঙ্ক, ৫৩৬টি সাঁজোয়া যান ধ্বংস করেছে ইউক্রেনীয় সেনারা। এছাড়া এখন পর্যন্ত ৩,৫০০ জনেরও বেশি রুশ সেনাকে হত্যা করেছে তারা।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘রুশ সেনাদের আনুমানিক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে রয়েছে ১৪টি যুদ্ধবিমান, ৮টি হেলিকপ্টার, ১০২টি ট্যাঙ্ক, ৫৩৬টি সাঁজোয়া যান, ১৫টি আর্টিলারি এবং ‘বাক’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা’।

ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা মিখাইল পোডোলিয়াক তার দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে এক বিবৃতিতে বলেছেন যে, রাজধানী কিয়েভসহ খেরসন, মাইকোলাইভ, ওডেসা এবং মারিউপোল শহরেও সংঘর্ষ চলছে।

ইউক্রেনীয় সশস্ত্র বাহিনী এবং পুলিশ যুদ্ধের মধ্যেও সারা দেশে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে উল্লেখ করে পোডোলিয়াক জোর দিয়ে বলেন যে, ‘কিয়েভ এবং কিয়েভের আশে-পাশের অঞ্চলের পরিস্থিতিও তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে’।

পোডোলিয়াক বলেন, ‘শনিবার সকাল পর্যন্ত ৩৫০০-রও বেশি রাশিয়ান সেনা নিহত হয়েছে এবং ২০০ জনকে বন্দী করা হয়েছে’।

ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক হস্তক্ষেপ শনিবার তৃতীয় দিনে প্রবেশ করেছে। তৃতীয় দিনে রাশিয়ান সৈন্যরা রাজধানী কিয়েভে ইউক্রেনীয় বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করছে।

ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে রাশিয়ান বাহিনী চেষ্টা করছে রাজধানী কিয়েভ পুরোপুরি দখলে নেয়ার। এরপর তারা দেশটির নেতৃত্বকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করবে।

ওদিকে, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স সহ ২৬ টি দেশ ইউক্রেনে মানবিক ও সামরিক সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনী মন্ত্রী জেমস হেপেই।

যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, ইউক্রেনে কঠিন প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়েছে রাশিয়া। একাধিক ফ্রন্ট থেকে রাশিয়ান বাহিনী রাজধানী কিয়েভকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করছে। কিন্তু ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর ‘শক্তিশালী প্রতিরোধের’ সম্মুখীন হয়েছে ভ্লাদিমির পুতিনের সেনারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত