বিতর্কিত এবং সংক্ষিপ্ত এক সফর শেষে তাইওয়ান ছেড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট কংগ্রেসের নিম্নকক্ষের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি। বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় দক্ষিণ কোরিয়ার উদ্দেশে তাইওয়ানের রাজধানী তাইপের বিমানবন্দর ত্যাগ করেন তিনি। তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বরাতে এই খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
দক্ষিণ কোরিয়ার দৈনিক কোরিয়া হেরাল্ড বুধবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, আজ সন্ধ্যায় রাজধানী সিউলের বিমানবন্দরে অবতরণ করবে পেলোসিকে বহনকারী মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিশেষ বিমান। পরের দিন বৃহস্পতিবার ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, জলবায়ু সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার কিম জিন-পিও’র সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি।
দক্ষিণ কোরিয়ার পার্লামেন্টের স্পিকারের সঙ্গে বৈঠক শেষে জাপান সফরে যাবেন পেলোসি। পূর্ব ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ সফর করতে গত সোমবার ওয়াশিংটন ত্যাগ করেন ন্যান্সি পেলোসি। এই সফরে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান সফরের কথা ছিল।
তবে তিনি ওয়াশিংটন ছাড়ার আগেই আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে চাউর হয়ে যায়- চলতি এ সফরে তাইওয়ানেও যাবেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ান সরকারের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোকে এ বিষয়ে নিশ্চিত করেন।
ন্যান্সি পেলোসি তাইওয়ানে আসতে পারেন—এ খবর প্রচারিত হওয়ার পর সোমবারই যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্কবার্তা দেয় চীনের সরকার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান সোমবার বেইজিংয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, যদি পেলোসি সত্যিই তাইওয়ান সফরে আসেন, তাহলে তার পরিণতি খুবই গুরুতর হবে।
চীনের সেনাবাহিনী এক্ষেত্রে ‘চুপচাপ অলসভাবে বসে থাকবে না’ বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন লিজিয়ান।
তারপর মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রণালয়ের অপর মুখপাত্র হুয়া চুনইয়িং বলেন, ন্যান্সির এই সফর কোনোভাবেই ব্যক্তিগত নয় এবং যদি যুক্তরাষ্ট্র একে আরও এগিয়ে নিয়ে যায়, সেক্ষেত্রে চীন ‘বৈধভাবেই প্রয়োজনীয় পাল্টা পদক্ষেপ নেবে।’
কিন্তু চীনের দফায় দফায় হুঁশিয়ারির মধ্যেই তাইওয়ানে পৌঁছান ন্যান্সি পেলোসি। মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত পৌনে ১১টার দিকে (বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ৮টা) তাইওয়ানের রাজধানী তাইপে বিমানবন্দরে তাকে বহনকারী উড়োজাহাজটি অবতরণ করে।
এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট সাই ইং-ওয়েনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন পেলোসি। বৈঠকে চীনের কবল থেকে তাইওয়ানের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকে সার্বিক সহায়তা দানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
১৯৫০ এর দশকের গৃহযুদ্ধে চীন থেকে বিচ্ছিন্ন হয় তাইওয়ান। তারপর থেকে তাইওয়ানের স্বাধীনতাপন্থী রাজনীতিকরা নিজেদের স্বাধীন ও সার্বভৌম বলে দাবি করলেও চীন এই দ্বীপ ভূখণ্ডকে এখনও নিজেদের অংশ বলে দাবি করে।
ন্যান্সির সফরের প্রতিক্রিয়ায় তাইওয়ান ঘিরে সামরিক মহড়ার ঘোষণা দিয়েছে চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। চীন এই মহড়াকে সামরিক অভিযানও বলছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, চীন ‘টার্গেটেড সামিরক অভিযান’ চালানোর ঘোষণা দিয়েছে।
মঙ্গলবার রাতে চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র উইউ কিয়ান সাংবাদিকদের বলেন, ‘চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি অত্যন্ত সতর্ক অবস্থায় রয়েছে এবং তারা সামরিক অভিযানের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আমরা তাইওয়ান ঘিরে সামরিক অভিযান চালাব। চীনের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগলিক অখণ্ডতা রক্ষা, তাইওয়ানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমন এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতার নামে আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে বহিরাগত শক্তির অযাচিত নাক গলানোর জবাব হিসেবে পরিচালিত হবে এ অভিযান’।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে রবিবারের মধ্যে তাইওয়ানের চারপাশে এই সামরিক মহড়া শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে চীন। তবে এর আগেই অবশ্য তাইওয়ান ছাড়লেন ন্যান্সি পেলোসি।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ন্যান্সি পেলোসির সফরের প্রধান প্রতিক্রিয়া হিসেবে তাইওয়ানের চারপাশের অবস্থানগুলোতে সামরিক মহড়া চালানোর পরিকল্পনা নিয়েছে বেইজিং। বড় মাপের এই মহড়ায় সরাসরি গোলাবর্ষণের ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
আর চীনের এই পরিকল্পনার তীব্র নিন্দা করেছে ভূখণ্ডটির সরকার। তাইওয়ানের সামরিক বাহিনী বলেছে, এই ধরনের মহড়া ‘তাইওয়ানের আঞ্চলিক স্থান আক্রমণ’ এবং ‘তাইওয়ানের আকাশ ও সমুদ্র অবরোধের সমান’।
তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘তাইওয়ানের আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে এমন যেকোনো পদক্ষেপ প্রতিহত করবে’ তাদের সামরিক বাহিনী।
৩৬ হাজার ১৯৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপ ভূখণ্ডের রয়েছে নিজস্ব সংবিধান, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতৃত্ব এবং প্রায় ৩ লাখ সক্রিয় সদস্যের একটি সেনাবাহিনী।
এখন পর্যন্ত অবশ্য খুবই অল্প কয়েকটি দেশ তাইওয়ানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও তাইওয়ানে এখন পর্যন্ত নিজেদের কোনো দূতাবাস খোলেনি দেশটি।
তবে তাইওয়ান বিষয়ক একটি আইনের আওতায় এই স্বাধীনতাকামী দ্বীপভূখণ্ডকে গত শতকের পঞ্চাশের দশক থেকেই সামরিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক সহায়তা দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র।
যেসব ইস্যুতে গত কয়েক বছর ধরে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে কূটনৈতিক তিক্ততা চলছে, সেসবের মধ্যে প্রধানতম ইস্যু তাইওয়ান।
