ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কমান্ডার হোসেইন সালামি দেশটিতে গত প্রায় দেড় মাস ধরে নারীর পোশাকের স্বাধীনতার দাবিতে বিক্ষোভকারীদের কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, শনিবারই তাদের রাস্তায় নামার শেষ দিন। আর তাদের রাস্তায় নামতে দেওয়া হবে না।
বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর এই প্রধান বলেন, ‘আর রাস্তায় আসবেন না! আজই দাঙ্গার শেষ দিন।’
সঠিক নিয়মে হিজাব না পরায় গত ১৩ সেপ্টেম্বর ইরানের নৈতিকতা পুলিশ ২২ বছর বয়সী মাহসা আমিনি নামের এক তরুণীকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুলিশি হেফাজত থেকে কোমায় নেওয়া হয় এই তরুণীকে। এর তিনদিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মাহসা আমিনি।
পুলিশি হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর থেকেই নারীর পোশাকের স্বাধীনতার ও কঠোর হিজাব আইন বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করছেন ইরানের নারীরা। তাদের প্রতি সংহতি জানিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও বিক্ষোভ-সমাবেশ হয়েছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য আবির আল-সাহলানি ছাড়াও ইরানি নারীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে ফরাসি অভিনেত্রী জুলিয়েট বিনোচি এবং ইসাবেলা হাপার্টও চুল কেটেছেন।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানে নারীদের জন্য হিজাব পরা বাধ্যতামূলক করা হয়। এই বিপ্লবের পর এবারই প্রথম ইরানের হিজাববিরোধী আন্দোলনকারী নারীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সমাবেশ হয়েছে।
ইরানের সংখ্যালঘু কুর্দিদের আবাসস্থল দেশটির পশ্চিমাঞ্চল। মাহসা আমিনিও কুর্দি অধ্যুষিত দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের বাসিন্দা। তার মৃত্যুর পর ওই অঞ্চলেই প্রথম ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়, যা পরে কয়েকদিনের মধ্যেই দেশটির অন্যান্য সব শহরে ছড়িয়ে পড়ে। গত ৪২ দিন ধরে দেশটিতে হিজাববিরোধী আন্দোলন চলছে।
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলেছে, ইরানজুড়ে চলমান হিজাববিরোধী বিক্ষোভে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সহিংসতায় কমপক্ষে ২৫০ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। এছাড়া বিক্ষোভে অংশ নেওয়ায় আরও হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুদণ্ড চেয়ে স্লোগান দিচ্ছেন। এ সময় দেশটির বাসিজ মিলিশিয়া গোষ্ঠীর সদস্যদের বিরুদ্ধেও স্লোগান দিতে দেখা যায় বিক্ষোভকারীদের। মিলিশিয়া এই গোষ্ঠী চলমান হিজাববিরোধী বিক্ষোভে নির্মম দমন-পীড়ন অভিযান চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত বুধবার মাহসার মৃত্যুর ৪০তম দিনে দেশটিতে নতুন করে ব্যাপক বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। বুধবার সাক্কেজ শহরে আমিনির কবর জিয়ারত শেষে সংঘর্ষ শুরু হয়। নারীদের নেতৃত্বাধীন এই বিক্ষোভ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। বিক্ষোভ দমনে তারা নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে।
বুধবার ও বৃহস্পতিবার ইরানের ১২২টি শহর ও ১০৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বরাতে রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। খবরে আরও বলা হয়, মাসা আমিনির মৃত্যুর পর উত্তাল হয়ে ওঠা ইরানে রক্তের স্রোত থামছে না। একদিকে চলছে তুমুল বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ, অন্যদিকে বিক্ষোভ দমনের নামে একের পর এক প্রাণহানি। বুধবার সন্ধ্যা থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এক দিনে কমপক্ষে আটজনকে হত্যা করে পুলিশ।
বিক্ষোভে তরুণ-তরুণী নিহত হওয়ায় দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিক্ষোভ আরও বড় আকার ধারণ করেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, পুলিশের গুলিতে নিহতের সংখ্যা আড়াইশ ছাড়িয়ে গেছে।
আরও পড়ুন...
ইরানে ইসলামি শাসনের মৃত্যুঘন্টা কি বেজে গেছে?
‘হিজাব না পরায় পোশাক খুলতে বাধ্য করে ইরানি পুলিশ’
মাহসার মৃত্যুর ৪০তম দিনে ইরানজুড়ে তুমুল বিক্ষোভ
৪০তম দিনে ইরানের বিক্ষোভ, নিহত প্রায় আড়াইশ
ইরানে এবার স্কুলছাত্রীকে পিটিয়ে হত্যা, নিহত বেড়ে ২৪০
