শোক, সমবেদনায় সামাজিকতার ছলনা

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৩, ১১:৩৬ পিএম

ছোটবেলায় পড়া ‘মাছের মায়ের পুত্র শোক’ নামক প্রবাদ প্রবচনটির অর্থ হলো মিথ্যা শোক। এর ভাবসম্প্রসারণও আসত পরীক্ষায়। পরীক্ষা পাসের জন্য অনেক কষ্টে ভাবসম্প্রসারণটি তখন পড়লেও এর মর্মার্থ বুঝে আসেনি।

ছোটবেলার সেই সময়গুলোতে মিথ্যার আশ্রয় বা বাস্তব অভিনয় পরিবেশে খুব কম প্রকাশ পেত। তখন মিথ্যা শোক বুঝতে পারতাম না, আজ বুঝি যে আমাদের চারপাশে ওত পেতে আছে মিথ্যা শোকে কাতর হাজারো ব্যক্তি। একটু লক্ষ করে দেখলাম, সেই হাজারো ব্যক্তির মধ্যে তো আমিও আছি।

আজকাল বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা, প্রতিবেশীর প্রতি সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কগুলোর মধ্যে কেমন জানি যান্ত্রিকতা ভর করেছে। সম্পর্কগুলোতে এখন আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সম্পর্কগুলোতে দেনা-পাওনার হিসাব যেন প্রতিনিয়তই টুকতে হয়। দেনা-পাওনা ছাড়া সম্পর্কগুলো কেন জানি আর সামনে এগোতে পারে না। আর যতটুকু এগোয়, যেখানেও যেন ভর করে দাম্ভিকতা, লোভ আর মিথ্যা শোক। অফলাইনের মধুর সম্পর্কগুলো কেমন জানি প্রতিনিয়ত অনলাইনে রূপান্তরিত হচ্ছে।

বন্ধুত্বের সাধারণ প্রয়োজনে সরাসরি দেখা করা তো দূরে যাক, মোবাইলে কথা বলাও এখন বিলাসিতার পর্যায়ে চলে গেছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বন্ধুত্বের খোঁজ নেওয়াটাই এখন স্বাভাবিক ঘটনা। হোক সেটা ফেসবুক, টুইটার বা অন্য কোনো অ্যাপ। প্রিয়জনের ভালো কিছু মুহূর্ত যখন মোবাইলের স্কিনে ভেসে ওঠে, তখন এর নিচে ফরমালি একটা মন্তব্যই যেন সব ল্যাঠা চুকে যায়। আলাদা করে তার মজার মুহূর্তগুলোতে ভাগ বসানো যেন অন্যায়ের পর্যায়ে চলে গেছে।

এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে বিভিন্ন শ্রেণির প্রিয়জনের জন্য থাকে বিভিন্ন গ্রুপ বা শ্রেণি। স্কুলের বন্ধুদের জন্য একটা, কলেজের বন্ধুদের জন্য একটা, বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের জন্য একটা, এলাকার প্রিয়জনদের কাছে রাখার জন্য আরেকটা; এমনি কত গ্রুপ যে তৈরি হয় তার ইয়ত্তা নেই। এই গ্রুপগুলোতে মাঝেমধ্যেই ভেসে ওঠে কোনো বন্ধু বা প্রিয়জনের কাছের কারও মৃত্যু বা দুঃখের সংবাদ। তখন সেই গ্রুপে উপস্থিত সবাই সেই পোস্টে স্যাড রিঅ্যাক্ট দিয়ে দায়িত্ব শেষ মনে করে। গ্রুপের সবাই যেন সেই আজ শোকে স্তব্ধ। কিন্তু সহজেই অনুমেয় স্তব্ধতা শুধুই মিথ্যা শোক। কেননা অন্য গ্রুপের মজার সংবাদগুলোতে সেই ব্যক্তিটিই অন্য এক উদ্যমে হাজির হয়েছে। সেখানে চলছে হাজারো জোকসের কথোপকথন।

আর প্রক্রিয়াটি যেন আজ সারা দেশের প্রায় সব মানুষের কাছেই ব্যাপ্তি লাভ করেছে। আজ সবাই যেন এ নিয়মেই আবদ্ধ। স্যাড পোস্টে স্যাড রিঅ্যাক্ট দিয়ে সমবেদনা প্রকাশ অবশ্যই পায়। কিন্তু সমবেদনাটুকু কি প্রকৃত সমবেদনা নাকি সামাজিকতা রক্ষার ছলনা?

এ ছলনা এখন সমাজের প্রতি ধাপে ধাপে ছড়িয়ে পড়েছে। অফলাইনে ভালোবাসা দূর হয়ে অনলাইন ছলনার খপ্পরে নষ্ট হচ্ছে সামাজিক সৌহার্দ্যপূর্ণ রঙিন সম্পর্কগুলো। যে সম্পর্কগুলো একসময় ছিল না কোনো ধরনের স্বার্থ। ছিল না কোনো লোভ, অহংকার বা মিথ্যা শোক।

সময়ের পরিক্রমায় আমরা হয়তোবা প্রতিনিয়ত সামনের দিকে এগোচ্ছি। কিন্তু এ যাত্রাপথের প্রতিটি পদক্ষেপে আমাদের মূল অস্তিত্বের কথা স্মরণ রাখা অত্যাবশকীয়। আমাদের প্রাণের স্পন্দনে মায়ের বাঁধনে গড়া স্বার্থহীন সম্পর্কগুলোর যথেষ্ট ব্যবহার আজ সময়ের দাবি। যখনই এ সম্পর্কগুলো আবারও নতুন করে দানা বাঁধবে, তখন দেখা যাবে আমাদের যাত্রাপথগুলো আরও সুগম হচ্ছে। মিথ্যা শোক ভেঙে যখন প্রকৃত প্রকাশ পাবে তখন দেখা যাবে আমাদের প্রিয়জনের থেকে প্রকৃত ভালোবাসা ফিরে পাচ্ছি। যার মধ্য দিয়ে আমাদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করা বিষণœতা, লোভ, অহংকারগুলো সহজেই বিনষ্ট হচ্ছে। যার মাধ্যমে আত্মহত্যা, মানসিক অবসাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ দেয়াল উঠে যাবে।

তবে হ্যাঁ, এখনও অফলাইনের মধুর সেই সম্পর্কগুলো চিরতরে বিনষ্ট হয়নি। চলতি পথে মাঝেমধ্যেই উঠে আছে সেই সম্পর্কগুলোর সৌন্দর্য। সেই সৌন্দর্যে অবগাহন করাও অনেক মধুর এক বিষয়। এখনো প্রকাশ পায় স্বার্থহীন বন্ধুত্ব। লোভ, অহংবোধ ছাড়া আত্মীয়তার সম্পর্ক। যে সম্পর্কগুলোর মুগ্ধতায় মুগ্ধ হয় স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা। নতুন সমাজ বিনির্মাণে সেই সম্পর্কগুলোই হতে পারে আমাদের অনুপ্রেরণা এবং পথপ্রদর্শক। মিথ্যা শোকের দিন শেষে পৃথিবী হোক নির্মল ভালোবাসার জগৎ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত