বেজার ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল

বিনিয়োগের ৭৫ ভাগ এক শিল্পনগরে

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০৫:৪২ এএম

টেক্সটাইল খাতের প্রতিষ্ঠান ম্যাকসন্স গ্রুপ গত ৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্র্তৃপক্ষ (বেজা) থেকে ৩০ একর জমি কেনে। বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরের (চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সীতাকুন্ড এবং ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার ৩০ হাজার একর জায়গায় এ নগরী) এ জমিতে ৩টি আলাদা স্পিনিং মিল বসবে। প্রায় এক হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পে ৩ হাজার ২০০ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে বিনিয়োগের বিষয়ে ম্যাকসন্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অন্যান্য শিল্পাঞ্চলের তুলনায় বঙ্গবন্ধু শিল্পাঞ্চলে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা বেশি। এখানে দুটি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো হচ্ছে। পণ্য আমদানি-রপ্তানির জন্য আমাকে জোনের বাইরে যেতে হবে না। বাকি জোনে বিনিয়োগ করলেও আমাকে চট্টগ্রামেই আসতে হবে। মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলের পাশেই সমুদ্রবন্দর। কিন্তু আমরা যারা ঢাকা ও চট্টগ্রামে ব্যবসা করি, তাদের জন্য এ বন্দর খুব একটা সুবিধাজনক না। তাছাড়া মোংলা সমুদ্রবন্দরের কনটেইনার লোড-আনলোড ব্যবস্থা ততটা উন্নত না। সবদিক বিবেচনায় বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর বেছে নিয়েছি।’

বেজার বিনিয়োগ চিত্রে দেখা যায়, সরকারি-বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল মিলে এখন পর্যন্ত ২৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। এর মধ্যে বেসরকারিতে ৩ দশমিক ১ বিলিয়ন; বাকি ২২ দশমিক ১৫৯ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরের দুটিসহ ৬টি সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে। সম্ভাব্য কর্মসংস্থান ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৮৮ হাজার ৫৮১। পর্যাপ্ত অবকাঠামো সুবিধা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরের বাইরে অন্য অঞ্চলে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা। এখন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে ১৮ বিলিয়ন ডলারের, যা সরকারি অঞ্চলের বিনিয়োগ প্রস্তাবের প্রায় ৮২ এবং মোট বিনিয়োগ প্রস্তাবের ৭৫ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ. বি. মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নে কেবল অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করলেই হবে না। পাশাপাশি সমন্বিত অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিশেষ করে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, জ্বালানি ও বিদ্যুতের সহজলভ্যতা, শিল্পাঞ্চলের কাছাকাছি দক্ষ জনশক্তি নিশ্চিত করতে হবে। এগুলো করতে না পারলে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহী করা যাবে না। এমনিতেই করোনার কারণে উন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ। ব্যাংকিং সমস্যাসহ নানা কারণে দেশের বিনিয়োগকারীরাও ভালো নেই। এমন পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে অবশ্যই অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে।’

দেশের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পের বিকাশ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১০ সালের ৯ নভেম্বর বেজা প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আওতাধীন সংস্থাটির অধীনে সারা দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক জোন স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এরপর ২০১২ সালে বেজা আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে। গত ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৯৭টি জোনের অনুমোদন পেয়েছে বেজা। এর মধ্যে সরকারি অঞ্চল ৬৮ ও বেসরকারি ২৯টি। এ ছাড়া বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ কর্র্তৃপক্ষ (বেপজা) আরও একটি অঞ্চল স্থাপন করছে বেজা আইনের অধীনে।

বেজার তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়েছে ৯ লাখ ৩০ হাজার ১৩১ জনের। এরপরই রয়েছে মহেশখালী অর্থনৈতিক অঞ্চল-৩। এখন পর্যন্ত এখানে বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে ২ দশমিক ৫৮১ বিলিয়ন ডলারের, যার মাধ্যমে ৩ হাজার ৪৬০ জনের কর্মসংস্থানের আশা করা হচ্ছে। শ্রীহট্ট অর্থনৈতিক জোনে এ পর্যন্ত ৪৪ হাজার ৯৩১ জনের কর্মসংস্থান হওয়ার মতো বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে, যার পরিমাণ ১ দশমিক ৩০৬ বিলিয়ন ডলার। কক্সবাজারের সাবরাং ট্যুরিজম পার্কে ৯ হাজার ১৮৫ জনের কর্মসংস্থান বা ২৪৫ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে ২৬ মিলিয়ন ডলারের। এই বিনিয়োগ বাস্তবায়ন হলে ১ হাজার ৮৭৪ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

এছাড়া এ পর্যন্ত ২০টি বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য প্রি-কোয়ালিফিকেশন লাইসেন্স প্রদান করেছে বেজা। এর মধ্যে ১১টি বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল চূড়ান্ত লাইসেন্স পেয়েছে। এসব অঞ্চলে প্রায় ৩ দশমিক ১০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিশ্চিত হয়েছে। এই বিনিয়োগ বাস্তবায়ন হলে ৩০ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। ইতিমধ্যে অধিকাংশ বিনিয়োগ বাস্তবায়নের কাজ চলছে।

অনুমোদন পাওয়া ৯৭ অঞ্চলের মধ্যে ৯টির উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি ৩টি ও বেসরকারি ৬টি। এসব জোনে ইতিমধ্যে ২৬টি শিল্প স্থাপন করা হয়েছে, যার সবই বেসরকারি অঞ্চলে। আর ৩৫টি শিল্প কারখানা নির্মাণাধীন রয়েছে। এসব কারখানায় ৩৯ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে বা কাজ করছে। এছাড়া বাস্তবায়নাধীন মোট ২৮টি জোন রয়েছে, যার মধ্যে সরকারি ১৩টি এবং বেসরকারি ১৫টি। এগুলো বিনিয়োগের উপযুক্ত বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। অর্থনৈতিক অঞ্চলের সৌন্দর্যবর্ধন ও পরিবেশ রক্ষায় ইতিমধ্যে ৪ লাখ বৃক্ষ রোপণ করেছে বেজা কর্র্তৃপক্ষ।

বেজার কর্মকর্তারা জানান, নতুন যেসব বিনিয়োগ প্রস্তাব আসছে সেগুলোও বঙ্গবন্ধু অর্থনৈতিক অঞ্চলকেন্দ্রিক। প্রস্তুত অন্যান্য অঞ্চলে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা। একেকটি অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় ব্যাপক বিনিয়োগের প্রয়োজন। বিনিয়োগকারীরা সেগুলোতে আগ্রহ না দেখানোয় নতুন করে অঞ্চল উন্নয়নের আগ্রহ দেখাচ্ছে না বেজা। তবে ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি। এটি বাস্তবায়ন হলে ভালো সাড়া মিলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেজার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অন্যান্য অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ না আসায় নতুন করে জমির উন্নয়ন করা যাচ্ছে না। জমি বিক্রি না হলে উন্নয়ন করে লাভ নেই। এজন্য আমরা বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর ঘিরে কাজ করছি। তবে সাবরাং অন্যতম আকর্ষণীয় অঞ্চল হবে বলে মনে করছি।’

দেশের সবচেয়ে বড় শিল্প ও রপ্তানি খাত পোশাক শিল্পের মালিকরা এখন রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকা ছাড়তে চাচ্ছেন। তাদেরও পছন্দ বেজার অর্থনৈতিক অঞ্চল। তবে তারাও বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরের বাইরে তেমন আগ্রহী নন। বেজার তথ্য বলছে, বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরের বাইরে সরকারি কোনো অর্থনৈতিক অঞ্চলে এখন পর্যন্ত কোনো পোশাক কারখানা মালিক জমি কেনেননি। পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে ৫০০ একর জমি কিনেছে। আর বিকেএমইএ ২৫০ একর জমি কেনার পরিকল্পনা করছে। তারাও বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে জমি কেনার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং বেজার সঙ্গে দ্রুত চুক্তি করবে বলে সংগঠন সূত্রে জানা গেছে।

বিকেএমইএর পরিচালক ও ফতুল্লা অ্যাপারেলসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘বিকল্প হিসেবে আমাদের জন্য বরিশাল বা খুলনা অঞ্চল ছিল। অবকাঠামো সমস্যার কারণে মোংলা বন্দর দিয়ে আমাদের ক্রেতারা পণ্য নিতে চান না। আর পায়রা বন্দর দিয়ে কবে মালামাল পাঠাতে পারব বলা মুশকিল। বিপরীতে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে বলতে গেলে সবকিছুই প্রস্তুত।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকার অন্য শিল্পনগরে বিনিয়োগ আনতে চাইলে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট অঞ্চল ও আশপাশের অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। একটি অঞ্চল বানিয়ে বিনিয়োগ কর বললে তো হবে না। এর সঙ্গে দক্ষ শ্রমিক, অবকাঠামো উন্নয়ন, উন্নত সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।’

সমন্বিত অবকাঠামো গড়ে না ওঠার বিষয়ে মির্জ্জা আজিজ বলেন, ‘সরকার অনেক প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এগুলো থেকে সুফল পাওয়া সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ ছাড়া যেসব প্রকল্প নেওয়া হয়, এডিপি দেখলে বোঝা যায়, বারবার এগুলোর ব্যয় বাড়ানো হয়। এসব কারণে সমন্বিত অবকাঠামো গড়ে উঠছে না।’

বেজার মহাব্যবস্থাপক (বিনিয়োগ সম্প্রসারণ) মো. মনিরুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের অন্যান্য প্রকল্পে বিনিয়োগকারীদের বেশি আগ্রহ নেই, বিষয়টি এমন না। আসলে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে জমির পরিমাণ বেশি। অন্যগুলো এখনো সেভাবে প্রস্তুত করা হয়নি। এটি একটি কারণ হতে পারে। একটি অঞ্চল ঘিরে মাস্টারপ্ল্যান, এরপর জমির উন্নয়ন করতে হয়। অন্যান্য অঞ্চলে এখনো এসব হয়নি বলে বিনিয়োগকারীরা যাচ্ছেন না। আর সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়নে কোনো সমস্যা আছে বলে আমরা মনে করছি না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত