ফিলিপাইনের ভোগ ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যায় প্রচ্ছদের মডেল হিসেবে স্থান পেয়েছেন অপো ওয়াং-ওড। ১০৬ বছর বয়সী আদিবাসী এই ট্যাটুশিল্পীই এখন বিখ্যাত এই ম্যাগাজিনের সবচেয়ে বেশি বয়সী প্রচ্ছদকন্যা। ফিলিপাইনের হাজার বছরের ‘বাটক’কে শিল্পে রূপ দিয়েছেন তিনি। লিখেছেন নাসরিন শওকত
বুসকালানের ট্যাটুশিল্পী
ফিলিপাইনের উত্তরাঞ্চলের প্রদেশ কলিঙ্গ। দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রথম থেকেই কলিঙ্গ অঞ্চলটি স্বাধীন ছিল। যদিও এই দ্বীপ দেশটি চারশ’ বছর ধরে বিদেশিদের দখলে ছিল। দীর্ঘ এই সময়ে স্পেন, যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপান ফিলিপাইন শাসন করত। তখন যেকোনো বহিঃশত্রুর হাত থেকে ফিলিপাইনকে রক্ষা করতে সফলভাবে লড়াই করত কলিঙ্গ উপজাতির শিকারি প্রধান (হেডহান্টারস) গোত্র। তারা সমভূতিতে যেমন পশুপাখি শিকারের ওস্তাদ ছিল , তেমনি যোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রেও ছিল সমান পারদর্শী।
১৯১৭ সালে ১৭ ফেব্রুয়ারি । কলিঙ্গা প্রদেশের টিংলায়ানের বুসকালান গ্রামে জন্ম নেন অপো ওয়াং-ওড। তিনি আদিবাসী কলিঙ্গ সম্প্রদায়ের বুটবুট উপজাতির সদস্য। কলিঙ্গদের হাজার বছরের পুরনো বাটক ঐতিহ্য অনুশীলনের মধ্য দিয়ে বুসকালান ও বিশে^ টিকে থাকবে। তবে প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রাম বুসকালানে যাওয়া মোটেও সহজ নয়। রাজধানী ম্যানিলা থেকে গ্রিডলক বাসে করে পাহাড়ি রাস্তার শরীর অসাড় করা ১২ ঘণ্টার ভ্রমণ সহ্য করতে হবে। ভূমিধসের ধ্বংসাবশেষ, বিপজ্জনক পাহাড়ি কুয়াশা পথ ও মেঠো ফসলের পথ পাড়ি দিয়ে এরও ৪০ মিনিট পর পৌঁছতে হবে বুসকালানে। গ্রামটিতে এখনো আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। মোবাইলের সংযোগ পেতে এখানে রীতিমতো সংগ্রাম করতে হয়। তবে বাড়িগুলোর ঐতিহ্যবাহী কোগান ছাদে এখন শোভাপায় ইস্পাতের পাত। আর কাঠের কুঁড়েঘরগুলোর রাস্তা কংক্রিটে মোড়া। বুসকালানের এই সব পরবর্তনের সাক্ষী শতবর্ষী অপো ওয়াং। ট্যাটু নিয়ে নৃবিজ্ঞানী লার্স ক্রুরটাকের মতবাদ রয়েছে। অপো ওয়াং সম্পর্কে এক সাক্ষাৎকারে লার্স বলেছেন, ‘অপো ওয়াং ১৬ বছর বয়সে তার বাবার নির্দেশে একজন ট্যাটুশিল্পী হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি তার সময়ের প্রথম ও একমাত্র নারী মাম্বাবটোক। ট্যাটুশিল্পী ওয়াং দূরদূরান্ত ও প্রতিবেশী গ্রামগুলোতে যেতেন। জীবনের শেষ প্রান্তে আসা এই গ্রামবাসীরাই তাকে ডেকে পাঠাতেন, যাতে অপো ওয়াং তাদের পূর্বপুরুষদের পবিত্র চিহ্নগুলোকে (ট্যাটুর) তার শিল্পকলার মাধ্যমে ধরে রাখেন। ’
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ১০৬ বছরে পা দেন অপো ওয়াং। প্রবীণ এই ট্যাটুশিল্পী স্থানীয়ভাবে মারিয়া ওগে নামে পরিচিত। তিনি বাঁশের কঞ্চির লাঠি, পোমেলো গাছের কাঁটা, পানি ও কয়লা ব্যবহার করে ট্যাটু আঁকেন। অপোর যখন বয়স ১৬, তখন বাবার হাতে তার বাটোকের হাতেখড়ি। তার বাবা ছিলেন একজন মাস্টার ট্যাটুশিল্পী। সেই তখন থেকেই ‘বাটকের’ চর্চা করে আসছেন বিখ্যাত এই ট্যাটুশিল্পী।
অপো ওয়াং ‘হ্যান্ড ট্যাপিং ট্যাটু’ (হাত দিয়ে ঠুকে ঠুকে যে ট্যাটু আঁকা হয়) আঁকার ওপর দক্ষতা অর্জন করেছেন। এই বিশেষ ধরনের ট্যাটু আঁকার ক্ষেত্রে তার প্রধান হাতিয়ার হলো, ছোট লাঠি আকারের বাঁশের কঞ্চি, যার গায়ে আটকানো থাকে পোমেলো গাছের তীক্ষ কাঁটা। এর সঙ্গে পানি ও কয়লা দিয়ে তৈরি একধরনের কালি ব্যবহার করেন অপো ওয়াং। এই কালিতেই পোমেলোর তীক্ষ কাঁটা ডুবিয়ে ট্যাটু আঁকাতে আসা দর্শনার্থীর শরীরে ঠুকে ঠুকে এঁকে চলেন নানা জ্যামিতিক নকশা। এসময় এক হাতে থাকে কাঁটাওয়ালা ছোট লাঠি আর অন্য হাতে থাকে ছোট হাতুড়ি। এই হাতুড়ি ঠুকে ঠুকে চামড়ার গভীরে ফুটিয়ে তোলা হয় ট্যাটুর নানা নকশা। যিনি নকশা আঁকান তার জন্য চমড়ার গভীরে ঢোকা কাঁটার সূক্ষ্ম আঘাত সহ্য করা যেমন যন্ত্রণার, তেমনি অপো ওয়াংয়ের জন্য প্রতি মিনিটে একশবার হাত ঠোকাও কষ্টসাধ্য। গত ১৫ বছরের মধ্যে অপো ওয়াংয়ের খ্যাতি এই কর্ডিলেরা অঞ্চলের বাইরে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন সারা বিশ^ থেকে হাজার হাজার দর্শক এসে ভিড় করছে তার দুয়ারে।
বাটকের ঐতিহ্য
ফিলিপাইনের হাজার বছরের প্রাচীন শিল্পকলা হলো ‘বাটোক’। এটি ট্যাটুর একটি ঐতিহ্যবাহী ধরন। একসময় ফিলিপাইনের আদিবাসী কলিঙ্গ উপজাতির সংস্কৃতির অংশ ছিল এই বাটোক।
বাটক চর্চার একেবারে প্রথম দিকের কথা। তখন কলিঙ্গ উপজাতিদের মধ্যে যারা প্রধান শিকারি ছিলেন, শুধুমাত্র তারাই নিজেদের পদমর্যাদার চিহ্ন হিসেবে ঐতিহ্যবাহী বাটক ব্যবহার করত। সে-সময় পুরুষরা নিজেদের সাহসিকতার প্রকাশ ঘটাতে শরীরে এই বিশেষ ধরনের ট্যাটু আঁকাতেন। অন্যদিকে নারীরা প্রধানত নিজেদের উর্বরতা ও সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলতে ট্যাটু আঁকাতেন। ফিলিপাইনের ঐতিহ্যবাহী এই সংস্কৃতিতে একসময় পশ্চিমাকেন্দ্রিক সৌন্দর্য ঢুকতে শুরু করে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, তখন সেই সৌন্দর্যের মোহে পড়ে যায় ফিলিপাইনি নারীরা। তবে তাদের মধ্য থেকে অল্পসংখ্যক মেয়ে ও নারী বাটোকের ঐতিহ্যকে গভীরভাবে অনুসন্ধান করার কাজে নেমে পড়েন এবং এক পর্যায়ে এসে তারা তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে এই ঐতিহ্যবাহী ট্যাটু আঁকানো শেখাতে শুরু করেন। এ কারণেই বাটকের চর্চায় দিন দিন ফিলিপাইনিদের সংখ্যা কমে আসছে। তবে সুখের কথা, গত প্রায় ১৫ বছর ধরে বিশে^র বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা বুসকালান গ্রামে ছুটে আসতে শুরু করেছে। তাদের একমাত্র লোভ, নিজেদের শরীরে ঐতিহ্যবাহী কালি দিয়ে অপো ওয়াংয়ের নিপুণ হাতের ট্যাটুর নকশা আঁকা। এরইমধ্যে পাহাড়ি গ্রাম বুসকালান ঐতিহ্যবাহী কলিঙ্গা ট্যাটুর জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠেছে।
মাম্বাবটোক প্রজন্ম
কলিঙ্গা প্রদেশে অপো ওয়াংকে তার প্রজন্মের শেষ মাম্বাবটোক বা ঐতিহ্যবাহী কলিঙ্গ ট্যাটুর জীবিত শেষ শিল্পী হিসেবে বলে ধারণা করা হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফিলিপাইনের ভোগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওয়াং-ওড নিজ প্রজন্মের শেষ মাম্বাবটোক। বুসকালানে এসেছেন এমন হাজার হাজার মানুষের শরীরে তিনি কলিঙ্গ উপজাতির শক্তি, সাহসিকতা ও সৌন্দর্যের প্রতীক এঁকেছেন। এদিকে ম্যাগাজিন ভোগের মত হলো, ঐতিহ্যবাহী কুলিঙ্গ ট্যাটুশিল্পীদের প্রজন্মের শেষ শিল্পী অপো ওয়াং-ওড। তিনি শিকারি যোদ্ধাদের চেয়ে নারীর শরীরের ট্যাটু এঁকেছেন বেশি।
হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী বাটোক শিল্পের শুরু থেকেই প্রতিটি কলিঙ্গ গ্রামে একজন করে মাম্বাবটোক থাকতেন। মাম্বাবাটোক হলেন একজন মাস্টার ট্যাটুশিল্পী, যিনি বংশপরম্পরায় বিশেষ ধরনের ট্যাটুর ঐতিহ্যকে সবার সামনে তুলে ধরবেন ও তার সম্মান অক্ষুন্ন রাখায় কাজ করে যাবেন। মাম্বাবাটোকের ঐতিহ্য অনুসারে, নারীরা যখন বিয়ের জন্য যোগ্য হয়ে উঠবেন, তখন তারা তাদের সঙ্গীকে আকৃষ্ট করতে শরীরে ট্যাটু আঁকাবেন। এদিকে শিকারি প্রধানরা যখন যুদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হন, তখন তাদের হাতে কালি দিয়ে আঁকা শতপদের একটি তাবিজ বেঁধে দেওয়া হবে। আবার যখন তারা শিকার থেকে কোনো কিছু হত্যা করে ফিরবেন, তখন একটি ঈগলের ট্যাটু এঁকে তাদের বিজয়কে স্মরণ করা হবে।
১৯ শতকের শুরুর দিকে আমেরিকানরা কলিঙ্গতে শিকারি প্রধানদের নিষিদ্ধ করে। এজন্য তখন যোদ্ধাদের চেয়ে বেশি নারীর শরীরে ট্যাটু এঁকেছেন অপো ওয়াং। সাংস্কৃতিক ট্যাটু সংরক্ষণে কাজ করেন লেন উইলকেন । এনিয়ে তার একটি বইও আছে। ফিলিপিনো ট্যাটুস : অ্যানসিয়েন্ট টু মর্ডান (২০১০ সাল) নামের ওই বইতে লেন বলেছেন, কুলিঙ্গ উপজাতিদের মধ্যে দ্বন্দ্বে থাকা সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে ভারসাম্য ও ন্যায়বিচার পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল শিকারি প্রধানরা।
তবে আমেরিকান মিশনারিরা যখন কলিঙ্গতে এসে স্কুল স্থাপন করে, তখন থেকে গ্রামের মেয়েরা হাতা খোলা রাখার পরিবর্তে তা ঢেকে রাখা শুরু করে। এ সময়ই নারীদের শহরে ঘোরাফেরা শুরু হয়। আর তখন থেকেই হাতে ট্যাটু আঁকা একটি লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। পরবর্তী প্রজন্মের অল্পসংখ্যক মেয়েরা তখন এই ট্যাটুর ঐতিহ্য ধরে রাখেন। কারণ এরই মধ্যে পশ্চিমা ধারণাগুলো ফিলিপাইনের সংস্কৃতিতে প্রবেশ করতে শুরু করে। এদিকে নিজের ঐতিহ্য সম্পর্কে গর্ব করে অপো ওয়াং বলেন, ‘এই ট্যাটুই আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদের মধ্যে একটি। আমরা যখন মারা যাই, তখন বস্তুগত অন্য জিনিসের মতো, আমাদের কাছ থেকে এই ট্যাটু কেউই ছিনিয়ে নিতে পারে না।’ তবে দুঃখের বিষয় হলো দিন দিন ঐতিহ্যবাহী মাম্বাবটোক সংস্কৃতির বিলুপ্তি ঘটছে। এই বিলুপ্তির পেছনে একটি বড় কারণও রয়েছে। বংশপরম্পরা ছাড়া ঐতিহ্যবাহী এই ট্যাটুর চর্চা করা যায় না। কারণ এর দক্ষতা শুধুমাত্র এক প্রজন্মের থেকে অন্য প্রজন্মই অর্জন করতে পারে।
ভোগের মডেল হলেন যেভাবে
অপো ওয়াং-ওড গত নয় দশক ধরে কলিঙ্গদের বাটক চর্চার মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী এই সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। প্রবীণ এই ট্যাটুশিল্পী তার অনন্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ভোগ ফিলিপাইনের প্রচ্ছদে স্থান পেয়েছেন। এ প্রসঙ্গে ভোগ ফিলিপাইনের এডিটর-ইন-চিফ বিয়া ভালদেস বলেছেন, ‘আমরা ভেবেছি যে তিনিই আমাদের ফিলিপিনো সংস্কৃতি ও আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করছেন। সবার সম্মতিতে অপো ওয়াং-ওডকে প্রচ্ছদের মডেল নির্বাচিত করা হয়েছে।’
এর আগে ভোগের সবচেয়ে বয়স্ক মডেলের রেকর্ড ছিল অভিনেত্রী জুডি ডেঞ্চের। বিশ^খ্যাত চলচ্চিত্র জেমস বন্ড সিরিজে অভিনয় করেছেন তিনি। ২০২০ সালে ৮৫ বছর বয়সে ব্রিটিশ ভোগের প্রচ্ছদকন্যা হন অভিনেত্রী ডেঞ্চ। এর আগে ২০১৭ সালে সংবাদ মাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অপো ওয়াং বলেছিলেন, আমার বন্ধুরা যারা ট্যাটু করতেন, তারা সবাই মারা গেছেন। আমিই একমাত্র বেঁচে আছি, যে এখনো ট্যাটু করছে। কিন্তু এই ঐতিহ্যটি একদিন শেষ হয়ে যাবে ভেবে আমি মোটেও ভীত নই। কারণ পরবর্তী ট্যাটু মাস্টারদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছি। যতদিন মানুষ ট্যাটু করতে আসবেন ততদিন এই ঐতিহ্য টিকে থাকবে। যতক্ষণ আমি ভালোভাবে দেখতে পাব, ট্যাটু করতে থাকব। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেলেই তবে থামব।’
প্রাচীন এই ঐতিহ্য যাতে কালের গর্ভে একেবারে হারিয়ে না যায়, এজন্য অপো ওয়াং গত এক দশক থেকে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেছেন। পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে সৃজনশীল এই ঐতিহ্য ছড়িয়ে দিতে তিনি তার ভাইয়ের মেয়ে গ্রেস পালিকাস ও নাতনি এলিয়াং উইগানকে ট্যাটু আঁকার প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, যাতে তারা তার উত্তরাধিকার ধরে রাখতে পারে। এখন তারা তাদের শিক্ষানবিশকাল পার করছে। পালিকাসের যখন বয়স ১০, তখন থেকেই তাকে প্রাচীন যত নকশা আছে তা শেখাতে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন অপো। সে যাতে সূক্ষ্মভাবে প্রতি এক মিনিটে একশটি ট্যাপ করার দক্ষতা অর্জন করতে পারে, সে চেষ্টাই করে যাচ্ছেন অপো ওয়াং। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির ব্যাখা দিয়ে এই ট্যাটুশিল্পী বলেন, ‘গ্রেসকে একজন ভালো মাম্বাবটোক হওয়ার জন্য গভীর আবেগ ও ধৈর্যের প্রয়োজন তার।’