স্কুল ক্রিকেট থেকে গুগল ক্যাপটেইন সুন্দর পিচাই

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০১৯, ১২:১০ এএম

সকাল থেকে বিরামহীন বেজেই চলেছে চেন্নাইয়ের জওহর স্কুলের টেলিফোনটি। ভারতের বড় সব পত্রিকা আর টেলিভিশনের সাংবাদিকরা হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন এই টেলিফোনটির ওপর। সব ফোনকলের একই প্রসঙ্গ সুন্দর পিচাই। কে এই পিচাই? এই স্কুলেই নাকি পড়েছে? ২০১৫ সালের ১১ আগস্টের পূর্বে ভারতীয় গণমাধ্যমে সুন্দর পিচাই নামটির কোনো অস্তিত্বই ছিল না। হঠাৎ করেই টেক জায়ান্ট ‘গুগল’-এর নতুন সিইও হিসেবে ঘোষণা করা হয় তার নাম। দক্ষিণ ভারতের তামিলনাডুর চেন্নাইয়ে সাধারণ এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নিয়ে বেড়ে উঠেছিলেন পিচাই। এমন খবরে দেশটির গণমাধ্যমের মাথা নষ্ট হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। এই কীর্তিমানকে নিয়ে লিখেছেন পরাগ মাঝি

স্কুল ক্রিকেটের ক্যাপটেইন

স্কুলে পড়ার সময় চেন্নাইয়ের অশোক নগরে অন্য আট দশজন ছেলের মতোই পড়াশোনা, ক্রিকেট আর আড্ডাবাজি করে দিন কাটাতেন সুন্দর পিচাই। নিজের স্কুলে ক্রিকেট দলের ক্যাপটেইনও ছিলেন তিনি। বাবা রঘুনাথ ছিলেন একটি ব্রিটিশ কোম্পানির সিনিয়র ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। আর সন্তান জন্মদানের আগ পর্যন্ত মা লক্ষী পিচাই স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠানে শ্রুতিলেখকের কাজ করতেন। সাধারণ মধ্যবিত্ত এই পরিবারের সন্তান হিসেবে বিলাসী জীবন ছিল না সুন্দরের। দুই রুমের একটি ফ্ল্যাটে বাস করত তার পরিবার। ২০১৫ সালের আগস্টে গুগলের সিইও হওয়ার পর তার সম্পর্কে জানতে জওহর স্কুলে খোঁজ নিয়েছিল ভারতের ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকাও। রেকর্ড ঘেঁটে স্কুলের প্রিন্সিপাল এলিস জীবন জানান, ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত ওই স্কুলে পড়াশোনা করেছেন পিচাই। জীবন বলেন, ‘সে এমন কোনো দুষ্টু বালক ছিল না যে, তার কথা স্মরণে থাকবে। আর তাছাড়া পড়াশোনায় শীর্ষস্থানেও কখনো ছিল না সে।’

সুন্দরের সঙ্গে এক ক্লাসে পড়েছে এমন এক ছাত্রীর খোঁজ পায় দ্য হিন্দু। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ক্লাসমেট এখন কলকাতায় বসবাস করছেন। সুন্দরকে চিনতে পারলেও তার সঙ্গে বেশি খাতির ছিল না বলেও জানান তিনি। তবে, শংকর সুব্রামনিয়াম নামে একজনের নাম বলেন তিনি। যার সঙ্গে সাইন্সের বিষয়গুলোতে বেশি মার্ক পাওয়া নিয়ে প্রতিযোগিতা চলত পিচাইয়ের। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শংকরও বর্তমানে আমেরিকায় অবস্থান করছে। তবে, শেষ পর্যন্ত পিচাইয়ে ৯১ বছর বয়সী দাদির দেখা মেলে। তিনি চেন্নাইয়েই বসবাস করছেন। নাতির খবর শোনে দারুণ খুশি হলেন। বয়সে তিনি তখন এতই কাবু যে, এর বেশি আর কথা বলা যায়নি।

জানা যায়, খড়গপুরে অবস্থিত ভারতের প্রকৌশল শিক্ষালয় আইআইটি’তে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে টিকে গিয়েছিলেন সুন্দর। সেখানে ম্যাটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং (ধাতব কৌশল) নিয়ে পড়ার সুযোগ পান তিনি। পরে আইআইটিতে তার শিক্ষকরাই যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যাটারিয়েল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনার সুযোগ করে দেন তাকে।

বিরল মেধাবীর আকাশে উড়াল

স্কুলে পড়ার সময়ই এক অস্বাভাবিক মেধার পরিচয় দিলেছিলেন পিচাই। তার যখন ১২ বছর বয়স, তখন প্রথমবারের মতো বাসায় একটি টেলিফোন সেটের সংযোগ নেওয়া হয়। তার বাবা-মা অবাক বিস্ময়ে একদিন খেয়াল করেন, সেদিন পর্যন্ত যতগুলো ফোন নম্বর পিচাই ওই ফোনে ডায়াল করেছিলেন তার সবগুলোই সে মুখস্ত বলে দিতে পারে। এমনকি বছর দুই-এক আগে ডায়াল করা ফোন নম্বরও! তাই এমন অসাধারণ স্মৃতিশক্তির পরিচয় পেয়ে ছেলের পড়াশোনা নিয়ে খুবই ইতিবাচক ছিলেন তারা। পরে আইআইটি’তে পড়ার সময় স্ট্যানফোর্ড বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেলে জমানো সব টাকাসহ ধার-দেনা করে পিচাইকে আমেরিকায় পাঠিয়েছিলেন পিচাই দম্পতি।

image

আমেরিকায় পা রেখে ম্যাটেরিয়েল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পিএইচডি গবেষণায় ভালোই করছিলেন পিচাই। কিন্তু একদিন হুট করেই নাম করা স্ট্যানফোর্ড বিশ^বিদ্যালয়ের পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কারণ সিলিকন ভ্যালিতে এপ্লাইড ম্যাটেরিয়ালস নামে একটি সেমিকন্ডাক্টর ম্যান্যুফেকচারার কোম্পানিতে প্রকৌশলী ও প্রোডাক্ট ম্যানেজারের চাকরি পান তিনি। সিলিকন ভ্যালিতে কাজ করা ছিল তার কাছে স্বপ্নের মতো একটি ব্যাপার। এর জন্য নাম করা বিশ^বিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণাকেও তুচ্ছ জ্ঞান করেছিলেন তিনি। অবশ্য পিএইচডি করার আগেই স্ট্যানফোর্ড থেকে ধাতব বিজ্ঞান এবং সেমিকনডাক্টর ফিজিক্সের ওপর মাস্টার্স কোর্স সম্পন্ন করেছিলেন। সিলিকন ভ্যালির চাকরিতেও বেশি দিন মন টেকেনি পিচাইয়ের। চাকরি ছেড়ে ২০০২ সালে পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটির হেয়ারটন স্কুল থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন। পরে ম্যাককিনসে অ্যান্ড কোম্পানিতে ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন।

স্কিমিট বাধা পেরিয়ে গুগল বিজয়

গুগলে চাকরি করা শুধু একজন ভারতীয় নয়, বরং পৃথিবীর যেকোনো দেশের মানুষের কাছেই চরম আকাক্সক্ষার। ২০০৪ সালে সুন্দর পিচাইও গুগলকর্মী হিসেবে কাজ করার জন্য টেকজায়ন্ট প্রতিষ্ঠানটিতে আবেদন করেছিলেন। পরে গুগল তাকে ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকে। পিচাই যেদিন ইন্টারভিউ দিতে গেলেন সেদিনটি গুগলের ইতিহাসেও স্মরণীয়। কারণ এই দিনেই প্রথমবারের মতো জিমেইল চালু করেছিল গুগল। এমন শুভদিনে পিচাইকে ফিরিয়ে দেয়নি গুগল। চাকরিটা হয়ে যায় পিচাইয়ের। গুগলের সার্চ টুলবারকে উন্নত করার জন্য ছোট একটি দলে কাজ শুরু করেন তিনি। সেখান থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাননি। গুগলের সার্চ টুলবারে দারুণ কিছু আইডিয়া যোগ করে গুগল প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ ও স্যার্গেই ব্রিনের নজরে চলে আসেন তিনি। কিন্তু শুধু কাজ করা নয়, পিচাইয়ের চিন্তা ভাবনা ছিল আরও প্রসারিত। তিনি গুগলের নিজস্ব ব্রাউজার তৈরির পরিকল্পনা করেন এবং প্রতিষ্ঠাতা পেজ-এর সঙ্গে তা শেয়ার করেন। কিন্তু তার এই পরিকল্পনায় বাধা হয়ে দাঁড়ান গুগলের তৎকালীন হেড অব ডিরেক্টরস এরিখ স্কিমিট। তিনি যুক্তি দেখান, গুগলের নিজস্ব ব্রাউজার প্রতিষ্ঠানটির ব্যয় অনেক বাড়িয়ে দেবে। তাই এটি একটি আত্মঘাতী পরিকল্পনা। তবে, স্কিমিটের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও নিজের পরিকল্পনার সম্ভাব্য সফলতা নিয়ে অবিচল থাকেন পিচাই। শেষ পর্যন্ত তিনি ল্যারি পেজ ও স্যার্গেই ব্রিনকে রাজি করাতে সক্ষম হন। এর পরই রচিত হয় গুগলের যুগান্তকারী ইতিহাস। ২০০৮ সালে ইন্টারনেট দুনিয়ায় প্রথমবারের মতো আত্মপ্রকাশ করে গুগলের নিজস্ব ব্রাউজার ‘গুগল ক্রোম’। অল্প সময়ের ব্যবধানেই মাইক্রোসফটের ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার ও মজিলা ফায়ারফক্সকে পেছনে ফেলে ব্রাউজারের দুনিয়ায় একক আধিপত্য কায়েম করে ক্রোম। এরই ধারাবাহিকতায় ক্রোমের হোম সিরিজ হিসেবে বাজারে আসে ক্রোম ওএস, ক্রোমবুকস ও ক্রোমকাস্ট। ক্রোমের সফলতায় ল্যারি পেজের সবচেয়ে বিশ^স্ত সহকর্মীতে পরিণত হন সুন্দর। ক্রোমের সফলতায় তাকে পদোন্নতি দিয়ে গুগলের প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট করা হয়। মাত্র চার বছরের মধ্যেই ক্রোম ও অ্যাপ বিভাগের জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয় তাকে। আর এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে গুগলের সিইও হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন পিচাই। মাত্র ৯ বছরের মধ্যে গুগলের একজন সাধারণ কর্মী থেকে সিইও হিসেবে আত্মপ্রকাশ ছিল রাতারাতি তারকা বনে যাওয়ার মতো ব্যাপার।

সফল প্রেমিক

ভারতের খড়গপুরে আইআইটি’তে পড়ার সময়ই অঞ্জলির সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়েছিল সুন্দর পিচাইয়ের। খুব ভালো বন্ধু হিসেবেই তারা একে অপরের পাশে ছিলেন দীর্ঘদিন। কিন্তু এই বন্ধুত্বের মধ্যেই পাপড়ি মেলতে শুরু করে প্রেম। রোগা পাতলা শরীর আর সৎ, মিতভাষী পিচাই একদিন অঞ্জলিকে ভালোবাসার প্রস্তাব দিয়ে বসে। তার প্রস্তাবে ‘হ্যাঁ’ বলেছিল অঞ্জলি। একসময় পিচাই বৃত্তি নিয়ে আমেরিকায় চলে গেলে তারা একে অপরকে আরও বেশি করে অনুভব করতে থাকেন। আমেরিকায় পা রেখেই উচ্চ ব্যয় সামলাতে গিয়ে অন্তত ছয় মাস খুব কষ্ট করেছিল পিচাই। কষ্টের সেই সময়গুলোতেও অঞ্জলির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছিলেন তিনি। দুই জনের তীব্র বাসনা কিংবা ভালোবাসার জোরেই হোক একদিন বৃত্তি নিয়ে আমেরিকার মাটিতে পা রাখে অঞ্জলিও। পিচাই তখনো গুগলে চাকরি শুরু করেনি। সামান্য বেতন পেলেও অঞ্জলিকে বিয়ে করে দাম্পত্য জীবন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। অঞ্জলিকে বিয়ের পরই গুগলে চাকরি পান পিচাই। এই প্রতিষ্ঠানে সাফল্যের শীর্ষে যাওয়ার প্রতিটি ধাপেই পিচাইয়ের সঙ্গী ছিল স্ত্রী অঞ্জলির অনুপ্রেরণা আর বন্ধুত্ব। দুই সন্তান নিয়ে এখন সুখি দাম্পত্য জীবন তাদের।

বিলিয়নিয়ারের সরল জীবন

২০১৬ সালেই বিলিয়নিয়ার ক্লাবের সদস্য হয়ে যান সুন্দর পিচাই। ২০১৭ সালের হিসেব অনুযায়ী, তার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১.২ বিলিয়ন ডলার। ২০১৫ সালের দ্বিগুণ অর্থ পরের বছর আয় করেছিলেন তিনি। সে বছর তার মোট আয়ের পরিমাণ ছিল ১৯৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। মুল বেতনের বাইরে তহবিল, লভ্যাংশসহ নানা খাত থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আয় করেন পিচাই। গুগল সিইও-এর মতো বিশাল পদধারী এবং একজন বিলিয়নিয়ার হয়েও খুব সরল জীবন-যাপন করেন পিচাই। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সিইও’রা যেখানে কাজের চাপে নাওয়া-খাওয়া ভুলে যায়, পিচাই সেখানে ব্যতিক্রম। প্রতিদিনই ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা ঘুমান তিনি। ঘুম ভাঙতেও প্রায়ই ৭টা বেজে যায় তার। তিনি নিরামিষাশী, তাই প্রোটিনের চাহিদা পূরণের জন্য সকাল বেলার নাস্তায় প্রতিদিনই একটি ডিম খান। ছোটবেলায় ক্রিকেট খেললেও ফুটবলের পোকা তিনি। রাত জেগে প্রায়ই বার্সালোনার খেলা দেখেন। শচীন টেন্ডুলকরের খেলা তিনি মিস করেননি কখনো। এই সবকিছুকে ছাপিয়েও তিনি ভীষণ শান্ত আর ধীর-স্থির। পরোপকারী হিসেবেও তার সুখ্যাতি। ঠা-া মেজাজকেই তার সফলার মুল সূত্র মানেন অনেকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত