পারিবারিক সিন্ডিকেটে মাদকের অবাধ বিস্তার

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০১৯, ০২:২৭ এএম

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে প্রতিদিনই মাদক বিক্রেতা আটক হলেও থামছে না এর বিস্তার। কারণ মাদক বিক্রি সিন্ডিকেট পরিচালিত হয় পরিবারকেন্দ্রিক। একজন আটক হলে অন্য সদস্য এর হাল ধরে। এতে নানা অভিযানের মধ্যেও অবাধে চলছে মাদক বিক্রি। এছাড়া গ্রাহক থেকে একসময় মাদক বিক্রেতা বনে যায় অনেকে। বিক্রেতারা বিত্তশালীর

সন্তানদের টার্গেট করে। তাদের প্রথমে বিনামূল্যেও মাদক দেয়। যখন আসক্ত হয়ে পড়ে তখন টাকা জোগাড় করতে না পেরে বিক্রিতে নামে তারা। সম্প্রতি সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেন, অনেক ক্ষেত্রে পুরো পরিবার মাদক বিক্রিতে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। দেখা যায়, পরিবারের একজন আটক হলেও অন্য কেউ এটি চালিয়ে যায়। বিকল্প আয়ের উৎস না থাকায় এক পর্যায়ে পরিবারের অন্য সদস্যরাও এতে জড়িয়ে পড়ে।

জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (উত্তর) সহকারী পরিচালক খোরশেদ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাদকের বিস্তার এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। তবে এ ব্যবসা পরিবারকেন্দ্রিক হওয়ায় সমূলে উৎপাটন করতে সময় লাগছে।’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ, বর্ডার গার্ড, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), কোস্টগার্ড ২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ পর্যন্ত দশ বছরে অভিযানে ৫ লাখ ৫৯ হাজার ৩৯৮টি মামলা করেছে। আসামি করা হয়েছে ৭ লাখ ২ হাজার ৩৯৯ জনকে। আটক করা মাদকের মধ্যে সব চেয়ে বেশি ইয়াবা। এর পরিমাণ ১৬ কোটি ১২ লাখ ৩৭ হাজার পিস। সবচেয়ে বেশি আটক হয়েছে ২০১৮ সালে ৫ কোটি ৮০ লাখ ৩৮ হাজার ৭৫১ পিস। এ ছাড়া অভিযানে হেরোইন আটক হয়েছে ১৮০৫ কেজি। সবচেয়ে বেশি আটক হয় ২০১৭ সালে ৪০১ কেজি। কোকেন আটক হয়েছে ৪০ কেজি, আফিম ১৪৪ কেজি, গাঁজা ৪ লাখ ৫৫ হাজার ৪৭৭ কেজি, ৭৯ লাখ ৮ আজার ৯৭৮ বোতল ফেনসিডিল, ১৮ লাখ ৪৮ হাজার ১১০ বোতল বিদেশি মদ, ৯ লাখ ৯০ হাজার ২৬৩ ক্যান বিয়ার, ১১ লাখ ৯৮ হাজার ৯৭৯ অ্যাম্পুল ইনজেকটিং ড্রাগ আটক হয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক তৎপরতায় মাদকের বিস্তার কমতে শুরু করেছে। অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক আটকও হচ্ছে। তবে মাদকের সিন্ডিকেটের মূল হোতারা কমই ধরা পড়ছে। আর যারা ধরা পড়ছে তাদের বেশির ভাগই আইনের ফাঁক দিয়ে মুক্তি পেয়ে আবার জড়িয়ে পড়ছে ব্যবসায়।

সম্প্রতি মাদকবিরোধী এক কর্মশালায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, আমাদের দেশে কোনো মাদক উৎপাদিত হয় না। পার্শ্ববর্তী দেশ ও অন্যান্য উৎপাদনকারী দেশের উৎপাদিত মাদক সীমান্ত অতিক্রম করে আমাদের দেশে পাচার করা হয়। এ কাজে যারা নেপথ্যে ভূমিকা রাখে তারা অনেক সময়ই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে, আইনের ফাঁকফোকরে তারা সর্বদা নিজেদের আড়াল করে রাখে। ফলে প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। তিনি আরও বলেন, আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সারা বছর মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রেখে চলেছে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে মাদকের অপব্যবহার দিন দিন বেড়ে চলেছে।

একটি বেসরকারি সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে ৩৬ লাখের বেশি মাদকসেবী রয়েছে। আর মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের সংখ্যা ৫০ থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। তা ছাড়া মহিলাদের জন্য ২৪ শয্যাবিশিষ্ট মহিলা ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। মাদকের ব্যাপকতার তুলনায় হাসপাতালের শয্যার সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনে দেশের প্রতিটি থানায় মাদক নিরাময় কেন্দ্র থাকা দরকার বলে মত দেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা খোরশেদ আলম।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত