রোববার, ১৪ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আসামি সোহেলের ভাষ্য

ধানের শীষে ভোট দেওয়ার কারণেই গৃহবধূকে ধর্ষণ

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০৩:০৮ এএম

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন ধানের শীষে ভোট দেওয়ার কারণেই ক্ষিপ্ত হয়ে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে গৃহবধূকে দল বেঁধে ধর্ষণ করা হয় বলে স্বীকার করেছেন এ ঘটনায় গ্রেপ্তার স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমীনের অনুসারী সোহেল, যাকে এজাহারনামায় প্রধান আসামি করেছে পুলিশ। শুধু তা-ই নয়, উপর্যুপরি ধর্ষণে গৃহবধূ অজ্ঞান হয়ে পড়লে তার মেয়েকেও তারা ধর্ষণ করতে চেয়েছিল। গ্রেপ্তারের পর পুলিশের কাছে জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য দেন তিনি। এদিকে ধর্ষণের ঘটনায় হোতা হিসেবে আলোচিত সুবর্ণচর উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক রুহুল আমীনসহ আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ধর্ষণের শিকার ওই চল্লিশোর্ধ্ব নারীর অভিযোগ, ভোটের দিন তিনি ধানের শীষে ভোট দেওয়ায় নৌকার সমর্থকদের সঙ্গে তার কথা-কাটাকাটি হয়েছিল। তার জের ধরে রাতে রুহুল আমীনের সমর্থকরা গৃহবধূর বাড়িতে গিয়ে স্বামী-সন্তানকে বেঁধে তাকে ধর্ষণ করে।

তার পরও চরজব্বার থানাপুলিশ মামলার এজাহার থেকে রুহুল আমীনের নাম বাদ দিয়েছে বলে বুধবার রাতে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুকের কাছে অভিযোগ করেছিলেন ওই নারী। ডিআইজি রুহুল আমীনের সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর গভীর রাতে দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

জেলার পুলিশ সুপার মো. ইলিয়াছ শরীফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, রুহুল আমীনকে সুধারাম থানা এলাকার একটি মৎস্য খামার থেকে এবং এজাহারভুক্ত আসামি ইব্রাহিম খলিল ওরফে বেচু মিয়াকে সেনবাগের একটি ইটভাটা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সব মিলে ধর্ষণের ঘটনায় মামলায় এজাহারভুক্ত চারজনসহ মোট পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হলো। রুহুল আমীন চরজুবলী ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য। বেচু মিয়া (২৫) মধ্যবাগ্যা গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে। মামলার এজাহারে বেচুর নাম রয়েছে ৫ নম্বরে। এর আগে গত সোমবার মামলার ৬ নম্বর আসামি বাসুকে, মঙ্গলবার রাতে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলা থেকে ৩ নম্বর আসামি স্বপনকে (৩৫) এবং বুধবার কুমিল্লার বড়ুয়ার একটি ইটভাটা থেকে মামলার ১ নম্বর আসামি সোহেলকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারের পর রাতে তাকে নোয়াখালী জেলা গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে সাংবাদিকদের সামনে সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) এম তানভীর আহমেদ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

সোহেল বলেন, ভোটের দিন দুপুরে এলাকার অটোরিকশা চালকের স্ত্রী (৪০) ভোট দিতে এলে ‘ধানের শীষে ভোট দেওয়া’ নিয়ে তার সঙ্গে ঝামেলা হয়। রাতে তিনি নিজেসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ভুলু মিয়া, হানিফ, স্বপন, চৌধুরী মিয়া, বেচু, বাছু, প্রকাশ কুড়াল্যা বাসু, আবুল, মোশারফ ও সালাহ উদ্দিনসহ আরও দু-তিনজন ওই নারীর বাড়ি গিয়ে দরজা খুলতে বলেন। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে তারা একযোগে ঘরে ঢুকে পড়েন এবং ওড়না ও মাফলার দিয়ে স্বামী-পুত্র-কন্যাকে বেঁধে ফেলে ওই নারীকে ঘরের বাইরে নিয়ে গিয়ে প্রত্যেকে দুবার করে তাকে ধর্ষণ করেন।

সোহেল বলেন, তাদের পাশবিক নির্যাতনে ওই নারী অজ্ঞান হয়ে পড়লে তার মেয়েকেও ধর্ষণ করার জন্য ঘরে ঢোকেন তারা। কিন্তু ঘরে ঢুকে দেখেন মেয়েটি পালিয়ে গেছে। তখন তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওই নারীকে মারধর করেন এবং তার ঘরে ভাঙচুরও চালান। ধর্ষণের সময় তারা ওই নারীর শরীরে দুটি করে কামড় দেন। এ সময় এএসপি তানভীর জানতে চান, নয়জনে দুটি করে কামড় দিলে ১৮টি কামড় হয়। কিন্তু ধর্ষণের শিকার ওই নারীর শরীরে আছে ২২টি কামড়ের দাগ আছে। বাকি চারটি কামড়ের দাগ কীভাবে হলো। সোহেল এ সময় চুপ থাকেন।

পুলিশ সুপার ইলিয়াছ শরীফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা ডিবি অফিসে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে জানান।

ভোটের পর রবিবার রাতে নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার মধ্যবাগ্যা গ্রামের ওই নারীর নিজের বাড়িতে ধর্ষণের শিকার হন বলে অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা এ ঘটনার সঙ্গে দলীয় সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। চরজব্বার থানায় তার স্বামীর দায়ের করা মামলার এজাহারে বলা হয়, আসামিরা তার বসতঘর ভাঙচুর করে, ঘরে ঢুকে বাদীকে পিটিয়ে আহত করে এবং সন্তানসহ তাকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে দল বেঁধে ধর্ষণ করে।

আসামিদের তালিকায় থাকা বাকিরা হলেন মধ্যবাগ্যা গ্রামের হানিফ, চৌধুরী, আবুল, মোশারেফ ও সালাহ উদ্দিন। মামলার এজাহারে মোট নয়জনকে আসামি করা হলেও সেখানে রুহুল আমীনের নাম না থাকায় বুধবার রাতে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুকের কাছে হতাশা প্রকাশ করেন ওই নারী।

তিনি ও তার স্বামী এখন নোয়াখালী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের দেখতে গত বুধবার হাসপাতালে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গেও কথা বলেন ডিআইজি গোলাম ফারুক। ভুক্তভোগী ওই নারী তাকে বলেন, রুহুল আমীনের সাঙ্গোপাঙ্গরাই তার ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়েছে। রুহুল আমীন এলাকায় অনেক অপকর্ম করে আসছে। তার অত্যাচারে মানুষ অতিষ্ঠ। কিন্তু মামলার এজাহার থেকে পুলিশ রুহুল আমীনের নাম বাদ দিয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত