সাভারে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ ২০ কারখানায় ছুটি ঘোষণা

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০১৯, ০২:৫১ এএম

নতুন মজুরি কাঠামো নিয়ে অসন্তোষের জের ধরে টানা চতুর্থ দিনের মতো ঢাকা মহানগরীসহ পাশের গাজীপুর ও সাভারের বিভিন্ন এলাকায় সড়কে নেমে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন শ্রমিকরা। এ সময় সাভারে পুলিশের সঙ্গে সঙ্গে প্রায় অর্ধশত শ্রমিক আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। শ্রমিকদের বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে আনতে কারখানায় ছুটি ঘোষণার পাশাপাশি সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। বিস্তারিত আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে:

সাভার : শিল্প পুলিশ-১ এর পরিচালক সানা শামিনুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সকালে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা রাস্তা অবরোধের চেষ্টা করলে আমরা তাদের সরিয়ে দিই। গতকাল বুধবার সকাল ৮টা থেকে শুরু করে দুপুর দুইটা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে থেমে থেমে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। তিনি বলেন, সকালে সাভারের উলাইল, কাঠগড়া, আশুলিয়ার জামগড়া, নরসিংহপুর, জিরাবো ও ধামরাইয়ের কচমচ এলাকায় বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা  ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়ক ও বিশমাইল-জিরাবো সড়কে অবস্থান নিলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ শ্রমিকদের সরাতে গেলে তাদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। প্রায় ২০টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

বুধবার সকাল ৮টায় সাভারের উলাইল এলাকার স্ট্যান্ডার্ড স্টিচেস লিমিটেড কারখানার শ্রমিকরা কারখানায় এসে মূল ফটকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণার নোটিস দেখে। কারখানাটির সুইং অপারেটর আল-আমিন বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগদান করতে গেলেও কর্র্তৃপক্ষ আমাদের ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। উল্টো কারখানার ভাড়াটে লোকজন দিয়ে ছাদ থেকে আমাদের ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে হামলা চালায়।’ পরে ওই কারখানার জেনারেল ম্যানেজার লুৎফর রহমান শ্রমিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা বাড়ি চলে যান, শনিবার পর্যন্ত কারখানাটি বন্ধ থাকবে। রবিবার কারখানা খোলার পর আপনাদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ করা হবে।’

গেন্ডা এলাকার আল মুসলিম গ্রুপের শ্রমিকরা সকাল ৯টার দিকে একযোগে বের হয়ে ঢাকা-আরিচা মহসড়কে অবস্থান নিলে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিজিবি মোতায়েন করা হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পুলিশ শ্রমিকদের সরাতে যাওয়ায় সংঘর্ষ বাধে। দুপুর ২টা পর্যন্ত দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশসহ অন্তত অর্ধশত শ্রমিক আহত হন। আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। গত মঙ্গলবার সাভারে বিক্ষোভের সময় শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে সুমন মিয়া (২২) নামে আনলিমা পোশাক কারখানার এক শ্রমিক নিহত হন।

গাজীপুর

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর জানান, পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে গাজীপুরের টঙ্গী, গাজীপুরা, হোতাপাড়া, কোনাবাড়ি ও মৌচাক এলাকায় চার প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বুধবার সকাল থেকে বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক (দক্ষিণ) বিভাগের সহকারী কমিশনার থোয়াই অং প্রু মারমা জানান, সকালে গাজীপুরার ম-ল গ্রুপ ও লোপা গার্মেন্টসের শ্রমিকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নেয়। এতে ওই মহাসড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ গিয়ে তাদের সরিয়ে দিলে সাড়ে ১১টায় যান চলাচল শুরু হয়।

প্রায় একই সময়ে সিটি কর্পোরেশনের নাওজোড় ও ভোগড়া বাইপাস এলাকায় বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা মহাসড়কে নেমে আসেন। পরে পুলিশ গিয়ে তাদের সরিয়ে দেয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ওই এলাকার অধিকাংশ কারখানা বুধবারের জন্য ছুটি ঘোষণা করে কর্র্তৃপক্ষ।

ঢাকা

সকাল ৮টার দিকে মিরপুরের কালশী, উত্তরার আব্দুল্লাহপুর, আজমপুর ও দক্ষিণখান এলাকার সড়কে অবস্থান নেন শ্রমিকরা। পরে পুলিশ ও কারখানার মালিকরা মজুরি কাঠামোর অসংগতি সংশোধনের আশ্বাস দিলে তারা ফিরে যান। তবে কালশী এলাকায় ২২ তলা গার্মেন্টস খ্যাত স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টসের সামনে থেমে থেমে বিক্ষোভ এবং সড়কে অবরোধ করে রাখেন শ্রমিকরা। দুপুর একটার দিকে তারা কাজে যোগ দেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

পল্লবী থানার পরিদর্শক (অপারেশন) ইমরানুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বুধবার সকালেও শ্রমিকরা আন্দোলনে নামেন। যে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির শ্রমিকরা সড়কে নেমেছিলেন ওই কারখানার মালিক ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের কাছে মজুরি কাঠামো সংশোধনের বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী ও শ্রম কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতিশ্রুতির বিষয়টি তুলে ধরেন। মালিক ও পুলিশের আশ্বাস পেয়ে শ্রমিকরা অবরোধ তুলে নেন।

শিল্প পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, বুধবার সকাল থেকে রাজধানীর মিরপুর, রামপুরা, বাড্ডা, উত্তরা, আব্দুল্লাপুর, উত্তরখান, দক্ষিণখান, আশুলিয়া, সাভারসহ বিভিন্ন এলাকার তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর সামনে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ছিল। শিল্প পুলিশের পাশাপাশি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ও থানা পুলিশও মোতায়েন থাকতে দেখা গেছে। সকালের দিকে শ্রমিকদের মধ্যে কিছু অস্থিরতা থাকলেও প্রায় সবকটি পোশাক কারখানাতেই শান্তিপূর্ণভাবে স্বাভাবিক কাজকর্ম হয়েছে। কোথাও বড় ধরনের কোনো বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া যায়নি।

বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহসিন রেজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্থানীয় প্রশাসনের চাহিদা অনুযায়ী সাভার, আশুলিয়া ও উত্তরায় ৮ প্লাটুন (প্রতি প্লাটুনে ৩০ জন) বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তারা এলাকায় টহল দিচ্ছেন। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বিজিবি মোতায়েন থাকবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত