উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বর্তমান সরকার। গ্রামে শহরের সুবিধা দেওয়া হবে বলেও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এরই অংশ হিসেবে নতুন আট বড় প্রকল্পে বৈদেশিক সহায়তা খুঁজছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। এসব প্রকল্পের বেশির ভাগই অবকাঠামো উন্নয়ন সংক্রান্ত। এর বাইরে জেলা-উপজেলায় মানবসম্পদ উন্নয়ন, মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন ও টেকনোলজি সম্প্রসারণের প্রকল্প রয়েছে।
সম্প্রতি ইআরডিতে বৈদেশিক সহায়তা অনুসন্ধান কমিটির এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে আট প্রকল্পে অর্থায়ন খোঁজার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ময়মনসিংহের কেওয়াটখালী সেতু। এই অঞ্চলটি ঢাকা-ময়মনসিংহ-ভারত সীমান্ত করিডরের অংশ। ফলে এটি আঞ্চলিক ও স্থানীয় যোগাযোগের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ময়মনসিংহ-কেওয়াটখালী সেতু পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর দিয়ে বাংলাদেশের স্থলবেষ্টিত কেন্দ্রীয় উত্তর ও উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার সংযোগ ঘটাবে। এ সেতু ময়মনসিংহ শহরে যানজট কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪৩ কোটি ৫১ লাখ ইউএস ডলার। প্রকল্পের আওতায় ৯০০ মিটার দৈর্ঘ্য সেতু এবং প্রায় ছয় কিলোমিটার দৈর্ঘ্যে পথ নির্মাণ করা হবে।
এই প্রকল্পে চীন ভিত্তিক সংস্থা এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) ১৫ কোটি ২৬ লাখ ডলার ঋণ দেবে বলে আশা করছে ইআরডি। বাকি ব্যয় বাংলাদেশ সরকার বহন করবে।
যুব সমাজকে আইটি বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার। এ জন্য মাদারীপুর জেলার শিবচরে পদ্মানদী বেষ্টিত চরাঞ্চলে নির্মিত হবে শেখ হাসিনা ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড হাইটেক পার্ক। এ হাইটেক পার্কে তরুণ প্রজন্মের আইসিটিনির্ভর কর্মসংস্থান হবে। সারা বিশ্বের আইটি বিশেষজ্ঞরা এসে আইটি নিয়ে গবেষণা করবে।
এ প্রকল্পটিতেও চীনের সহায়তা করা হতে পারে। কেননা চীন এরই মধ্যে এই প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। ইআরডিও এই বিষয়ে উদ্যোগ নিচ্ছে।
রাজধানীর উপকণ্ঠে আমিনবাজারে বিদ্যমান ২৩০-১৩২ কেভি গ্রিড সাবস্টেশনকে ৪০০-২৩০ কেভি গ্রিড সাবস্টেশনে উন্নীতকরণে প্রকল্পে নেওয়া হচ্ছে। পটুয়াখালীর পায়রা ও বাগেরহাটের রামপালে নির্মিতব্য বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে পাওয়া বিদ্যুৎ গোপালগঞ্জ হয়ে আমিনবাজার পর্যন্ত সঞ্চালন এবং মেঘনাঘাট থেকে ৪০০ কেভি ভোল্টেজে বিদ্যুৎ সঞ্চালন করতে এই গ্রিড সাবস্টেশনের সক্ষমতা বাড়ানো হবে। এ কাজে ব্যয় হবে প্রায় ১৬৪ কোটি টাকা। উন্নয়ন সহযোগী এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইআরডির বৈদেশিক সহায়তা অনুসন্ধান কমিটির সভাপতি মাহমুদা বেগম বলেন, বিভিন্ন প্রকল্পে উন্নয়ন সহযোগীরা বরাবরই বাংলাদেশের সঙ্গী হয়েছে। এই অংশ হিসেবে এই আট প্রকল্পেরও সহায়তা চাওয়া হবে। বৈদেশিক সহায়তা অনুসন্ধানের বিষয়টি তরান্বিত করার জন্য আলোচনা হবে।
তিনি বলেন, বেশির ভাগ সময়ই একটি প্রকল্পের জন্য একাধিক উন্নয়ন সহযোগীকে প্রস্তাব পাঠানো হয়। আগ্রহীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করার পর যে সংস্থার প্রস্তাব সুইটেবল মনে হবে তাদেরটা নেওয়া হয়ে থাকে। এখানেও তাই হবে।
এর বাইরে অন্য প্রকল্পগুলো হচ্ছে, জনশক্তি ও কর্মসংস্থান ব্যুরোর (বিএমইটি) অধীনে প্রতিষ্ঠানটির দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি শক্তিশালী করার বিষয়ে প্রকল্প নেওয়া হবে। এই প্রকল্পে সহায়তার জন্য বিশ^ব্যাংকের কাছে অনুরোধ করবে ইআরডি।
ভোলা ও বরিশালের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনে তেঁতুলিয়া ও কালাবাদর নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণে প্রকল্প নেওয়ার কথা রয়েছে। এই প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য চীনের দ্বারস্থ হবে ইআরডি।
একই সঙ্গে জেলা-উপজেলায় কর্মদক্ষতা বাড়ানো সংক্রান্ত প্রকল্প চলমান রয়েছে। এই প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু করতে চায় সরকার। এ জন্য মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংস্থা আইএসবিডির কাছে সহযোগিতা চাইবে ইআরডি।
দেশের মাদ্রাসা শিক্ষার মানকে যুগোপযোগী করতে চায় সরকার। এ নিয়ে কাজও শুরু হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নির্বাচিত মাদ্রাসা শিক্ষার গ্রহণ ও প্রদান ব্যবস্থা উন্নয়নে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এই প্রকল্পে আইএসবিডি সহায়তা করবে বলে মনে করছে ইআরডি।
বৈদেশিক ঋণসহায়তা প্রাপ্তি আশা করা হচ্ছে ‘চার লেনে উন্নীত হচ্ছে ঢাকা (কাচপুর)-সিলেট মহাসড়ক ৪ লেন সার্ভিস ও কন্সট্রাকশন প্রকল্পে’। এটি বাস্তবায়ন করবে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও চীন সরকারের কাছে ঋণসহায়তা চাওয়া হবে ।
এদিকে গ্রামীণ জীবন-মান উন্নয়নের বিষয়ে প্রকল্পগুলোতে বেশি জোর দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।
অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর বুধবার ইআরডির সঙ্গে প্রথম বৈঠকে তিনি এ নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার কারণে ভবিষ্যতে দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক অর্থায়ন প্রাপ্তি কিছুটা সহজতর হবে। কিন্তু প্রকল্প বাছাইয়ের ক্ষেত্রে গ্রামীণ জীবনমান উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট ছোট আকারের প্রকল্পেও ঋণসহায়তা আদায়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সক্ষমতার কারণে উন্নয়নে প্রয়োজনীয় বৈদেশিক অর্থায়ন প্রাপ্তি সহজতর হবে।
