গত দশ বছরে দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় দেড়গুণ এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ার হার আরও অনেক বেশি, প্রায় ছয়গুণ। কিন্তু শিক্ষার্থীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়লেও সে অনুপাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকের সংখ্যা বাড়েনি। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের অনুপাত যৌক্তিক পর্যায়ে থাকা মানসম্মত শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা বিশেষায়িত ও গবেষণাধর্মী হওয়ার কারণে সেখানে শিক্ষকদের নিবিড় তত্ত্বাবধান প্রয়োজন হয়। তাই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষক সংকটকে অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০০৯ সালে দেশের ৩১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩ লাখ ৮২ হাজার ২১৬ জন শিক্ষার্থী ছিল। এখন ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৬ লাখ ৬ হাজার ১৩৭ জন; যা আগের তুলনায় আড়াই গুণেরও বেশি। ২০০৯ সালে ৫১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ৭০৯ জন। এখন ৯৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩৩ জন; যা আগের তুলনায় প্রায় সাড়ে তিনগুণ।
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের মধ্যে ব্যাপক তারতম্য রয়েছে। মঞ্জুরি কমিশনের প্রতিবেদন অনুসারে ৩৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর গড় অনুপাত ১:২১। অর্থাৎ গড়ে প্রতি ২১ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক রয়েছেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের তারতম্য কোথাও অনেক বেশি। যেমন কোথাও প্রতি পাঁচজন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক রয়েছেন, আবার কোথাও ৫৭ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক রয়েছেন। অপেক্ষাকৃত নতুন বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগগুলোতেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতের এই ব্যবধান অনেক বেশি। শিক্ষার কাক্সিক্ষত মান নিশ্চিত করতে বিজ্ঞান-প্রকৌশল-প্রযুক্তি শিক্ষায় ১২-১৪ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক, কৃষিশিক্ষায় ১২-১৫ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক এবং কলা-মানবিক-বাণিজ্য শিক্ষায় ১৮-২০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক থাকার কথা বলে থাকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন।
লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, বর্তমানে মোট পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৪৪টি হলেও মঞ্জুরি কমিশনের এই প্রতিবেদনে ৩৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাতের কথা বলা হয়েছে। এর বাইরে থাকা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় এবং এদের অধিভুক্ত ও অঙ্গীভূত কলেজ ও মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষার্থীর সংখ্যা যেমন বিপুল তেমনি সেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাতের ব্যবধানও অনেক বেশি। বাস্তবতা হলো দেশে উচ্চশিক্ষার মোট শিক্ষার্থীর বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে সরকারের বিশেষভাবে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, শিক্ষার পরিবেশ ও মান নিয়েও বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ করা খুবই জরুরি। বিশেষ করে জেলা পর্যায়ের বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজগুলোতে শিক্ষক সংকট খুবই তীব্র। সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের সংকটই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বেশি। দ্রুত এ সংকট কাটাতে আপাতত অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান। একই সঙ্গে নতুন শিক্ষক নিয়োগের জন্য জরুরি উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে। কিন্তু বিশেষভাবে নজর দিতে হবে শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনার প্রথাগত চক্র থেকে বেরিয়ে আসার জন্য। কেননা যোগ্য প্রার্থীরা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ না পেলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাই মানহীন হয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হবে।
