পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার কারসাজির দায়ে সাত ব্যক্তি ও ছয় প্রতিষ্ঠানকে মোট ৫ কোটি ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। লিগেসি ফুটওয়্যার ও বাংলাদেশ অটোকারস লিমিটেডের শেয়ার ধারাবাহিক লেনদেন ও কারসাজির মাধ্যমে অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে জরিমানার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসইসি।
কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ অটোকারস লিমিটেড ও লিগেসি ফুটওয়্যারের শেয়ার কারসাজিতে যুক্ত থাকার দায়ে কমার্স ব্যাংক সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারী আবদুল কাউয়ুম, মরিয়ম নেছা ও মেসার্স কাউয়ুম অ্যান্ড সন্সকে দুই কোটি টাকা জরিমানা আরোপ করা হয়েছে।
এই দুই কোম্পানির ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে অংশগ্রহণ করায় মো. আজিমুল ইসলাম, লুৎফুন নেছা ইসলাম, নাবিলা ইসলাম, আজিজুল ইসলাম, আলিফ টেক্সটাইল মিলস্ ও বায়তুল খামুর নামের প্রতিষ্ঠানকে দুই কোটি টাকা জরিমানা করেছে বিএসইসি।
এছাড়া ওই দুই কোম্পানির শেয়ার কারসাজিতে যুক্ত থাকায় ব্যক্তি বিনিয়োগকারী মাহফুজ আলমকে এক কোটি টাকা জরিমানার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
একই সঙ্গে পদ্মা গ্লাস, পদ্মা জোন্স অ্যান্ড কলার্ম ইউনিট-২ রহমত মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত দুই কোম্পানির শেয়ার কারসাজিতে যুক্ত থাকায় মইনুল হক খান অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেছে বিএসইসি।
কারসাজির সঙ্গে জড়িত এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শেয়ার অর্জন, অধিগ্রহণ ও কর্তৃত্ব গ্রহণ সংক্রান্ত বিধিমালা ও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯ এর ১৭ এর (ই)(ভি) ধারা ভঙ্গ করেছেন। তবে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পরোক্ষভাবে সিরিজ লেনদেনের মাধ্যমে শেয়ার কারসাজির সুযোগ করে দেওয়ায় কমার্স ব্যাংক সিকিউরিটিজ অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডকে শুধুমাত্র সতর্কপত্র ইসুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
জানা গেছে, প্রায় বন্ধ কোম্পানি লিগ্যাসি ফুটওয়্যারের শেয়ার কারসাজি শুরু হয় ২০১৭ সালের জুলাই থেকে। ওই সময় শেয়ারটির দর ছিল ২৬ টাকা।
পরের মাত্র দুই মাসে শেয়ারটির দর দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ৫৮ টাকা ছাড়ায়। দ্বিতীয় দফায় এর কারসাজি শুরু হয় ২০১৮ সালের এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে। এ সময় শেয়ারটির ৫৩ টাকায় কেনাবেচা হয়েছে। এর সাড়ে তিন মাস পর গত ১২ আগস্ট শেয়ারটির দর রেকর্ড ২৮০ টাকায় উন্নীত হয়। এ সময়ে রুগ্ণ কোম্পানিটির শেয়ারদর সোয়া ৫গুণ বেড়েছে।
অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১৯ আগস্ট বাংলাদেশ অটোকারস ও লিগেসি ফুটওয়্যারের শেয়ারের লেনদেন সাময়িক স্থগিতের পাশাপাশি তদন্তের সিদ্ধান্ত নেয় বিএসইসি।
বিএসইসির তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, কমিশনের তদন্ত দল ২০১৮ সালের ৮ মে থেকে ১০ জুলাই কাল পর্যন্ত এ কোম্পানির শেয়ার লেনদেনের তথ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে।
এ সময়কালে শেয়ারটির দর ৫৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৫০ টাকা হয়। তাছাড়া কেনাবেচা হয় ৪ কোটি ৬০ লাখেরও বেশি শেয়ার। এক্ষেত্রে বিক্রি হওয়া শেয়ারের প্রায় ১৯ শতাংশ একাই কেনা হয়েছে কমার্স ব্যাংক সিকিউরিটিজ থেকে।
বাংলাদেশ অটোকারসের শেয়ারদরে বড় উল্লম্ফন হয় ২০১৭ সালের মে থেকে আগস্টের মধ্যে। ওই সময় শেয়ারটির দর ৭৫ টাকা থেকে ১২১ টাকা হয়েছিল। স্বল্প মূলধনী এ কোম্পানির ব্যবসা ঢাকার তেজগাঁওয়ের একটি পেট্রল পাম্পে সীমাবদ্ধ।
কোম্পানিটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কারসাজি হয়েছে ২০১৮ সালের জুন মাসে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে শেয়ারটির দর ১১৯ টাকা থেকে চার গুণ বেড়ে ৪৯০ টাকায় উন্নীত হয়।
তবে তদন্ত কমিটি গত ২৮ মে থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত সময়কালের শেয়ার লেনদেন পরীক্ষা করেছে। এ সময় বিডি অটোকারের ৩৯ লাখ ১১ হাজার শেয়ার কেনাবেচা হয়।
উল্লিখিত সময়ে বিক্রি হওয়া শেয়ারের প্রায় ৪১ শতাংশই একা কমার্স ব্যাংক সিকিউরিটিজ থেকে কেনা হয়েছে।
এদিকে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে বাংলাদেশ অটোকারস ও লিগেসি ফুটওয়্যারের শেয়ার লেনদেনে আরোপিত বাধ্যতামূলক স্পট (নগদ টাকায় কেনাবেচার বাজার) লেনদেনের পরিবর্তে মূল বাজারে লেনদেনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। গত ১৯ আগস্ট এ দুই কোম্পানির শেয়ার প্রথমে লেনদেন স্থগিত ও পরবর্তী সময়ে বাধ্যতামূলক স্পট মার্কেটে পাঠায় কমিশন।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের মালিকানাধীন ব্রোকারেজ হাউস কমার্স ব্যাংক সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে তালিকাভুক্ত সাত কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কারসাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনেছে বিএসইসি। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ও অভিযোগকারীদের শুনানি শেষে গতকাল কমিশনের নিয়মিত সভায় বাংলাদেশ অটোকারস ও লিগেসি ফুটওয়্যার নিয়ে কারসাজিতে যুক্তদের জরিমানা করা হয়েছে।
কারসাজির অভিযোগ থাকা তালিকাভুক্ত মুন্নু স্ট্যাফেলার্স, মুন্নু সিরামিক, কুইন সাউথ টেক্সটাইল, আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ এবং ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টস কোম্পানির লেনদেন ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে বলে বিএসইসি সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে সমন্বিত গ্রাহক হিসাবে ঘাটতি থাকায় চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সদস্য ইস্টার্ন শেয়ার সিকিউরিজি লিমিটেডের লভ্যাংশ প্রদান সাময়িকভাবে স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসইসি।
এইসঙ্গে গ্রাহক হিসাবের ঘাটতি সাড়ে তিন কোটি টাকা সমন্বয়ের জন্য চার মাসের সময় দেওয়া হয়েছে ব্রোকারেজ হাউজটিকে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঘাটতি সমন্বয় না হলে সিএসইর রেগুলেশন অনুযায়ী ফ্রি লিমিট সুবিধা স্থগিত থাকবে।
