রহস্যেঘেরা নীল তিমি

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০১৯, ১০:৫৫ পিএম

নীল তিমিকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্তন্যপায়ী প্রাণী। এর সম্পর্কে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। বিশাল এই প্রাণীর জীবনাচরণ আজও মানুষের মধ্যে বিস্ময়ের উদ্রেক করে। এরা মাছের মতো ফুলকা দিয়ে নিঃশ্বাস নেয় না, আবার ডিমও পাড়ে না। অক্সিজেন নেয় মানুষের মতো ফুসফুস দিয়ে। আবার বসবাস করে পানিতে। পানিতেই খাওয়ায় শিশু তিমিকে দুধ। সমুদ্রে রাজত্ব করে বেড়ানো এই তিমি লম্বায় ১০০ ফুট হয়, যা কিনা সবচেয়ে বড় ডাইনোসরের দ্বিগুণ। লিখেছেন লায়লা আরজুমান্দ নিপা

 

তিমিকে অনেকেই মাছ বলে থাকে। আসলে কিন্তু তিমি মাছ না। মাছের কোনো বৈশিষ্ট্যই নেই তিমির মধ্যে। বিভিন্ন প্রজাতির তিমি রয়েছে। যেমন : কিলার তিমি, নীল তিমি, পাইলট তিমি, হাম্পব্যাক তিমি, বেলুগা তিমি, ফিন তিমি, গ্রে তিমি ইত্যাদি। এদের মধ্যে সব থেকে বড় হচ্ছে নীল তিমি।

ওজন কত?

নীল তিমির জিভের ওজনই একটা হাতির ওজনের সমান। এটা এত বড় যে একটা ফুটবল টিমের সবাই দাঁড়াতে পারবে অনায়াসে। এর হৃৎপিণ্ড একটা প্রাইভেট কারের সমান। তাহলে ভাবুন তো এই তিমির ওজন কত হবে? এদের ওজন প্রায় ২০০ টনের মতো, যা কি না আফ্রিকার পূর্ণবয়স্ক ৪০ হাতির সমান। নবজাতক নীল তিমিও কম যায় না! সেও বিশ্বের সব থেকে বড় নবজাতকের স্থান দখল করে আছে। ওজন প্রায় তিন টন।

রং কি নীল?

স্তন্যপায়ী প্রাণী হলেও নীল তিমি থাকে পানিতে। তবে তাকে অক্সিজেন গ্রহণ করার জন্য একটু পরপর পানির ওপরে ভেসে উঠতে হয়। নীল তিমিকে পানির নিচে নীলই দেখায়। তবে পানির ওপরে ভেসে উঠলে দেখা যায় তার শরীর জুড়ে নীলচে ধূসর ছোপ।

বিশাল প্রাণী খায় ক্ষুদ্র মাছ

এত বিশাল যে প্রাণী সে কী খায়? কতটুকু খায়? এই প্রশ্ন মনে আসা স্বাভাবিক। এরা সাধারণত ‘ক্রিল’ নামের অতিক্ষুদ্র এক ধরনের মাছ খেয়ে থাকে, যা দেখতে অনেকটা চিংড়ির মতো। দিনে অন্তত চার টন খাবার খেয়ে থাকে। সংখ্যায় প্রায় ৪০ মিলিয়নের বেশি।

বিশালাকার এই মাছটি যখন সাগরের বুকে এঁকেবেঁকে চলতে থাকে, তখন সে এক গ্রাসেই খেয়ে নেয় হাজারো ‘ক্রিল’। বিশালাকার এই প্রাণীটির দাঁত নেই। আছে ব্যালিন, যা দেখতে অনেকটা ঝালরের মতো। এই ব্যালিন ফিল্টারের কাজ করে। ওপরের চোয়াল থেকে নিচের চোয়াল পর্যন্ত ঝুলে থাকে এই ব্যালিন। মোট ৩০০ ব্যালিন প্লেট রয়েছে, যার একেকটির দৈর্ঘ্য তিন ফিটেরও বেশি। নীল তিমি যখন হাঁ করে, তখন মাছের সঙ্গে একরাশ পানিও তার মুখে প্রবেশ করে। তারপর ফিল্টারের মাধ্যমে পানিগুলো বের করে দেয় আর মাছগুলো থেকে যায়।

একা থাকে

নীল তিমিকে খুব কমই দল ধরে ঘুরতে দেখা যায়। সে বেশির ভাগ সময় একা ঘুরতেই পছন্দ করে। ঘণ্টায় পাঁচ মাইলের থেকে বেশি সাঁতার কাটে তারা। তবে যদি কোনো কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে যায়, তবে সেটা ঘণ্টায় ২০ মাইল পর্যন্ত হতে পারে।

শব্দ শোনা যায় ১০০০ মাইল দূর থেকে

দেহের আকৃতির মতো তাদের শব্দও হয় অনেক জোরে। বলা হয়ে থাকে, প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে জোরে শব্দ করতে পারে নীল তিমি। তাদের তীব্র শব্দ একটা জেট ইঞ্জিনচালিত বিমানের শব্দের থেকে বেশি। শব্দের তীব্রতা প্রায় ১৮৮ ডেসিবল। মানুষের পক্ষে ১২০ থেকে ১৩০ ডেসিবলের বেশি শব্দ শোনা অত্যন্ত কষ্টের। এক তিমি অন্য তিমির শব্দ প্রায় ১০০০ মাইল দূর থেকে শুনতে পারে।

কত দিন বাঁচে?

দীর্ঘদিন বাঁচে নীল তিমি। গড়ে তাদের আয়ু ৮০ থেকে ৯০ বছর। সব থেকে বেশি বয়স্ক যে নীল তিমি খুঁজে পাওয়া গেছে, তার বয়স ১১০ বছর।

কোথায় থাকে তারা?

পৃথিবীর প্রায় সব মহাসাগরে এরা রাজার মতো ঘুরে বেড়ায়। যেমন : অ্যান্টার্কটিকা মহাসাগর, প্রশান্ত মহাসাগর, আটলান্টিক মহাসাগর ও ভারত মহাসাগর। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের নিউ ফান্ড ল্যান্ড, নোভা স্কশিয়া, গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডে দেখা যায় নীল তিমি। প্রশান্ত মহাসাগরে কোরিয়ান কিছু উপদ্বীপের কাছে দেখা যায়। আবার দক্ষিণ গোলার্ধে অ্যান্টার্কটিকা, ওশেনিয়া মহাদেশেও দেখা যায় তাদের।

অতিরিক্ত শিকারের কারণে বিশ্বব্যাপী নীল তিমির সংখ্যা কমে যাচ্ছে বলে কয়েক বছর ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন পরিবেশবাদীরা।

প্রজনন

নীল তিমির সাধারণত দুটি মৌসুম থাকে। এক, খাওয়ার মৌসুম, দুই, প্রজনন মৌসুম। খাওয়ার মৌসুম সাধারণত শুরু হয় গ্রীষ্মকালে। উত্তর মেরুতে যখন শীতকাল, দক্ষিণ মেরুতে তখন গ্রীষ্মকাল। মেরু অঞ্চলে যখন শীত থাকে, সেই পুরো সময়টা তখন বিষুবরেখার কাছাকাছি উষ্ণ সাগর অঞ্চলে কাটিয়ে দেয় নীল তিমি।

উত্তর ও দক্ষিণ মেরু অঞ্চলের সাগরে গ্রীষ্মকালে কোটি কোটি ক্রিল থাকে। এ সময় তারা প্রচুর পরিমাণে ‘ক্রিল’ খায় এবং প্রজনন মৌসুমের জন্য শক্তি জমা করে শরীরে। কারণ শীতকালে তারা খুব কম খাদ্য গ্রহণ করে। এ সময় তাদের শরীরে পুরু চর্বির আস্তরণ তৈরি হয়।

শরৎকালের শেষ দিক থেকে সাধারণত তারা তাদের সঙ্গী খুঁজতে থাকে এবং মিলিত হয়। মিলিত হওয়ার এই মৌসুম থাকে শীত পর্যন্ত। শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচতে তারা নতুন বাসস্থানের খোঁজে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়। এ সময়ই সঙ্গীর দেখা পায় তারা। এরপর তারা আবার গ্রীষ্মকালে উষ্ণ সাগরে ফিরে যায় সন্তান জন্ম দিতে।

শিশু নীল তিমি

পৃথিবীতে সব থেকে বড় প্রাণীর সন্তানও হবে বড়। প্রায় এক বছর মায়ের গর্ভে থেকে জন্মগ্রহণ করে শিশু নীল তিমি। জন্মের সময় তার ওজন হয় প্রায় তিন টন। লম্বায় হয় প্রায় ২৫ ফুট। জীবনের সব সময় কি বিশালতা এই প্রাণীর, ভাবা যায়? জন্মের পর ছয় মাস প্রতিদিন সে প্রায় ৫০০ লিটার দুধ পান করে। সন্তান জন্মানোর সময় হলে এরা উষ্ণ পানির দিকে চলে যায়। কারণ এত শীতল পানিতে ছোট্ট শিশুর বেঁচে থাকা সম্ভব না। প্রতি দুই থেকে তিন বছর পরপর এরা সন্তান জন্ম দেয়।

পানিতে থেকেও শ্বাস নিতে পারে না

নীল তিমি সমুদ্রে থাকে কিন্তু পানিতে শ্বাস নিতে পারে না। এরা মানুষের মতোই বাতাসে শ্বাস নেয়। তবে মানুষের মতো প্রতি মুহূর্তে নিঃশ্বাস নিতে হয় না তাদের। অন্তত ৩০ মিনিট পর্যন্ত দম না নিয়ে থাকতে পারে। তিমি যখন নিঃশ্বাস ছাড়ে, তখন সে তার মাথার ওপর দুই ছিদ্র দিয়ে পানি ফোয়ারার মতো করে ছুড়ে দেয়, যা ৩০ ফুট পর্যন্ত ওপরে ওঠে। তার মাথার ওপরের এই ছিদ্র এত বড় যে, একটি ডলফিন সেখানে প্রবেশ করতে পারবে অনায়াসে।

জেগে থেকেই সে ঘুমায়

নীল তিমি অনেকটা জেগে থেকেই ঘুমায়। মানে সে কখনো পুরোপুরি ঘুমায় না। তার মস্তিষ্কের অর্ধেক ঘুমায়, বাকি অর্ধেক জেগে থাকে। কারণ হিসেবে মনে করা হয়, তিমি যদি ঘুমিয়ে পড়ে এবং সময়মতো না জাগে, তাহলে দম আটকে মারাও যেতে পারে। তাই তাদের অর্ধেক মস্তিষ্ক সব সময় জেগে থাকে, যাতে শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য ঘুমের মধ্যেও ভেসে উঠতে পারে।

ঘুমের এ বিষয়টি বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন ইলেকট্রো এনসেফালোগ্রাফির (ইইজি) মাধ্যমে।

বিপন্ন প্রাণী

১৯ শতকের প্রথম দিকে প্রায় প্রত্যেক মহাসাগরে নীল তিমি দেখা যেত। এক শতকের ব্যবধানে শিকারিদের উৎপাতে এই প্রাণীটি এখন বিলুপ্তির পথে। ১৯০০ সালের দিকে নীল তিমির তেল সংগ্রহে মানুষের আগ্রহের কারণে বিপুলসংখ্যক নীল তিমি নিধন করা হয়। ১৯০০ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার তিমি শিকারিদের হাতে মারা যায়। এরপর আন্তর্জাতিক তিমি কমিশন বাণিজ্যিকভাবে নীল তিমি শিকারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। সম্প্রতি, আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থা আইইউসিএন নীল তিমিকে বিপন্ন প্রাণী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।

শিকার ছাড়াও জেলেদের হাতে তিমি নিধন হয়। তিমি জেলেদের জালে আটকা পড়ে ডুবে যায় অথবা অভুক্ত থেকে শেষে মারা যায়। সমুদ্রে জাহাজ যাতায়াত বৃদ্ধি পাওয়ায় দ্রুতগামী জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েও অনেক তিমি মারা যায়।

২০০২ সালের এক হিসাব মতে, সারা বিশ্বে অন্তত ১২ হাজার নীল তিমি রয়েছে। আইইউসিএন ধারণা করছে, বর্তমানে এর সংখ্যা হতে পারে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত