দণ্ডমুণ্ডের কর্তা এখনো বদি

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০১৯, ০৪:০৭ এএম

-আত্মসমর্পণের আলোচনা সাবেক সাংসদকে ঘিরেই

-প্রশাসন চলে তার ইশারায়

রিহান আব্দুল্লাহ, কক্সবাজার থেকে

বিভিন্ন সময়ে ইয়াবা কারবারিদের ‘পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবে তালিকায় নাম আসা আবদুুর রহমান বদিকে নিয়ে ফের আলোচনা শুরু হয়েছে। ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণ নিয়ে সাম্প্রতিক উদ্যোগের প্রেক্ষাপটে নতুন এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের এই সাবেক সাংসদ। চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে, অন্য ইয়াবা কারবারিদের সঙ্গে তিনিও কি আত্মসমর্পণ করছেন, নাকি গ্রেপ্তার হচ্ছেন?

অনুসন্ধানে জানা গেছে, টেকনাফ সদর থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ ওঠায় আলোচনায় আছেন তিনিও। তবে প্রকাশ্যে তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে চাইছেন না। সবার মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। কারণ, এলাকায় কে যাচ্ছেন বা কী করছেনÑ সে খোঁজ রাখতে বিভিন্ন স্থানে সোর্স নিয়োগ দিয়ে রেখেছেন ওসি প্রদীপ, যেসব সোর্স ইয়াবা কারবারে যুক্ত।

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, গত পাঁচ বছর ধরে কক্সবাজারের বিভিন্ন থানায় দায়িত্ব পালন করছেন বদির বিশ^স্ত হিসেবে পরিচিত পুলিশ কর্মকর্তা প্রদীপ। বছর পাঁচেক আগে প্রথম টেকনাফ থানায় সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) হিসেবে যোগ দেন তিনি। তিন বছর আগে ইন্সপেক্টর হয়ে ওসি হিসেবে যোগ দেন উখিয়ায়। এর বছরখানেক পর দায়িত্ব পান সদর থানায়। তারপর কিছুদিন কাজ করেন মহেশখালীর ওসি হিসেবে। সর্বশেষ গত অক্টোবর মাসে টেকনাফ থানায় যোগ দেন তিনি।

সরেজমিন দেখা গেছে, বিভিন্ন স্থানে ওসি প্রদীপ কুমার দাশের ওইসব সোর্স থাকায় শিশুদের মধ্যেও ভীতি তৈরি হয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, কক্সবাজার ও টেকনাফে বদির ইশারা ছাড়া কোনো কিছুই হচ্ছে না। বদির কথায়ই চলছে প্রশাসন। মাদক কারবারিরা তার ‘শেল্টারে’ আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তাই ‘দুর্ধর্ষ মাদক কারবারিরা’ আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি নিলেও তাদের ‘সাঙ্গোপাঙ্গরা’ বহাল তবিয়তে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি বদিকে ভালো মানুষ জাহির করতে পুরো নির্বাচনী এলাকায় পোস্টারিং করা হয়েছে। পোস্টারে লেখা আছে ‘উখিয়া-টেকনাফের চারদিকে শুধু সাফল্যের হাসি। তাই বদি ভাই তোমার জন্য গর্বিত আজ উখিয়া-টেকনাফবাসী’। সম্প্রতি এক দোয়া মাহফিলে মাদকবিরোধী বক্তব্যও রাখেন বদি।

এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, কথিত বন্দুকযুদ্ধে যারা মারা গেছেন তাদের অধিকাংশই ‘চুনোপুঁটি’। বড় ইয়াবা কারবারিদের সব ধরনের সহায়তা করছে পুলিশ। টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ নিজের খুশিমতো যাকে পাচ্ছেন তাকেই গ্রেপ্তার বা আটক করছেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় ‘পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবে সাবেক সাংসদ আবদুর রহমান বদির নাম থাকলেও সম্প্রতি বিভিন্ন সভা-সমাবেশে ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণে উদ্বুদ্ধ করেছেন তিনি। তবে তার আত্মসমর্পণের বিষয়টি স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বেশ কয়েকবার বদিকে ফোন করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তার স্ত্রী বর্তমান সংসদ সদস্য শাহীন আকতার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার স্বামীকে নিয়ে অহেতুক বদনাম করা হচ্ছে। তালিকায় তার নাম থাকলেও কোথাও প্রমাণ নেই। এটি সরকারের উচ্চমহল থেকে শুরু করে সবাই জানেন।’

কক্সবাজারের ইয়াবা কারবারিদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের বিষয়টি সপ্তাহ দুয়েক আগে জোর আলোচনায় আসে। ইতিমধ্যে ২৩ জনপ্রতিনিধিসহ অন্তত ৭৩ ইয়াবা কারবারি ‘বন্দুকযুদ্ধ’ থেকে বাঁচতে পুলিশের নিরাপত্তায় চলে গেছেন। বদির ভাইসহ সাতজন আত্মসমর্পণের জন্য পুলিশের এই নিরাপত্তায় আছেন।

বদি ২০০৮-২০১৮ সাল পর্যন্ত সাংসদ ছিলেন। এ সময় তার হাতে একের পর এক নিগৃহীত ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন ম্যাজিস্ট্রেট, প্রিসাইডিং অফিসার, আইনজীবী, প্রকৌশলী, ঠিকাদার, শিক্ষক ও মুক্তিযোদ্ধা। বাদ পড়েননি তার দলের নেতাকর্মীরাও। একের পর এক বিতর্কিত ঘটনার জন্ম দিয়ে জেলায় মূর্তিমান আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠেন বদি। জেলা ছাড়িয়ে আলোচিত হয়ে ওঠেন দেশজুড়ে। এ ছাড়া সীমান্তে ইয়াবা পাচার, সাগরপথে মানবপাচার, দেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়, দলীয় নেতাকর্মী ও সরকারি আমলাদের মারধর এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলা জেলসহ নানা অভিযোগে একাধিকবার আলোচনায় আসেন তিনি। তবে টানা ১০ বছর সাংসদ থাকায় বদনামের পাশাপাশি সুনামও রয়েছে তার। তিনি উখিয়া-টেকনাফের সাধারণ মানুষের কাছে ‘গরিবের বন্ধু’ নামে পরিচিত। অবশ্য, এবার সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক মহল তাকে মনোনয়ন না দিয়ে তার স্ত্রী শাহিন আকতারকে মনোনয়ন দেয়।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশে না করার শর্তে বলেন, কক্সবাজার ও টেকনাফে মাদক ব্যবসা কে করছে তা সবাই জানেন। সব কারবারির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে বদির নামই সবার আগে চলে আসে। তবে তিনি আত্মসমর্পণ করবেন না বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। এখন তিনি মাদকের বিরুদ্ধে জোরালো ভূমিকা রাখছেন। এই ভূমিকা আগে রাখলে মাদকের এমন বিস্তার হতো না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, টেকনাফ থানার ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে তা সত্য। কিন্তু মাদকবিরোধী অভিযানেও ওসি ভালো কাজ করছেন। তার পরও অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে।

টেকনাফের নাজিরপাড়া এলাকার এক যুবলীগ নেতা ক্ষুব্ধ কণ্ঠে দেশ রূপান্তরকে বলেন, থানার ওসি সব সময় এলাকায় আতঙ্ক বাড়াতে নানা চেষ্টা চালাচ্ছেন। বিভিন্ন স্থানে নিজস্ব সোর্স নিয়োগ দিয়ে নিরাপরাধ লোকজনকে ফাঁসিয়ে দিচ্ছেন। ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। আপনাদের সঙ্গে কথা বলায় আমিও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকব। ইতিমধ্যে সোর্সরা ওসির কাছে খবর পৌঁছে দিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। নাজিরপাড়ায় বন্দুকযুদ্ধে নিহত জিয়াউর রহমানের মা নুর বেগম বলেন, জিয়াউর এক সময় ইয়াবা কারবারি করত ঠিক। কিন্তু বছর চারেক আগে ভালো পথে চলে আসে। তার ওমরা হজ করার কথা ছিল। মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে তাবলিগ জামাতে গোপালগঞ্জ গিয়েছিল। কিন্তু ওসি প্রদীপের নির্দেশে নামাজ পড়া অবস্থায় তাকে ধরে নিয়ে মেরে ফেলা হয়। মারার পরও পুলিশ ক্ষ্যান্ত হয়নি। প্রতিদিনই বাড়ি এসে হানা দেয় এবং অপরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করে।

অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ওসি প্রদীপ কুমার দাশ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যারা মাদক কারবারি তারাই আমার বিরুদ্ধে এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমি আমার সততা নিয়ে কাজ করি। মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে যা যা করা দরকার, তা-ই করে যাব। এলাকায় আমার নিজস্ব সোর্স নেই। অভিযোগটি বানোয়াট।’ নিরাপরাধ কাউকে পুলিশ হয়রানি করে না বলেও দাবি করেন তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত